১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, সোমবার

দিয়াজের ‌’মৃত্যু’ নিয়ে একগাদা নতুন প্রশ্ন

প্রকাশিতঃ বুধবার, জানুয়ারি ৪, ২০১৭, ৯:১৮ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে দিয়াজের শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকার কথা প্রকাশের পর কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর ‌’মৃত্যু’ নিয়ে সামনে চলে এসেছে একগাদা নতুন প্রশ্ন। সেই সঙ্গে দিয়াজের মৃত্যু-পরবর্তী পুলিশের আলামত নষ্টের চেষ্টা, হত্যা না আত্মহত্যা সেই প্রশ্নের উত্তর মেলাতে সামনে চলে এসেছে মৃতদেহ ঘিরে তৈরি হওয়া আশপাশের নানা চিহ্ন, লক্ষণ। আর এসবের সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম বিশ্লেষণে বেরিয়ে আসতে পারে দিয়াজের মৃত্যুরহস্য- এমনটাই মনে করছেন দিয়াজের পরিবারসহ সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট এলাকায় চারতলা একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন দিয়াজ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। ছাত্রলীগের কোন্দলের জের ধরে গত ২৯ অক্টোবর রাতে দিয়াজের বাসায় ভাঙচুর ও হামলার পর দিয়াজ বাসায় একাই থাকতেন। ২০ নভেম্বর বাসার যে কক্ষে দিয়াজ থাকতেন সেই কক্ষের জানালা দিয়ে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে তার লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান স্থানীয় লোকজন; সময় তখন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা।

এরপর পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের খবর দেয় প্রতিবেশীরা। ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে দিয়াজের কক্ষের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। এসময় হাটহাজারী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মুজিবুর রহমান ঘটনাস্থলের আলামত নষ্ট করেন বলে শুরু থেকে অভিযোগ উঠে।

অভিযোগ রয়েছে, ‘মূল দরজাটি বন্ধ থাকলেও ব্যালকনির দিকে থাকা অন্য দরজাটি খোলা ছিল। মূল দরজাটি ভাঙার পর পুলিশ পরিদর্শক মুজিবুর সবার আগে ওই কক্ষে প্রবেশ করেন। তখন রাত ৯টা থেকে সাড়ে ৯টা হবে। এরপর খোলা থাকা দরজাটি বন্ধ করে দেন মুজিব।

জানা যায়, সেসময় উপস্থিত থাকা দিয়াজের মামা সাজেদ বিন আমিন ও প্রতিবেশী ফারজানাসহ আরো অনেকে দেখেছে বিষয়টা। ভেতরের দরজাটা বন্ধ করার সময় পরিদর্শক মুজিবুরকে প্রশ্ন করে সাজেদ বিন আমিন জানতে চান, আপনি দরজাটা বন্ধ করছেন কেন? তখন তিনি উত্তর দিয়েছেন, দরজা খোলা থাকলে কেউ ওদিক থেকে এসে আলামত নষ্ট করে দিতে পারে। তাই দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছি।

দিয়াজের বড়বোন অ্যাডভোকেট জুবাঈদা ছরওয়ার চৌধুরী নিপা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘দরজা ভেঙে ঢোকার পরপরই লাশ নামিয়ে আনতে চেয়েছিল পরিদর্শক মুজিবুর রহমান। তখন উপস্থিত রাকিবুল মাওলা স্যার বলেছেন, আমার কাছে এটা স্বাভাবিক আত্মহত্যা মনে হচ্ছে না। তাদের পরিবারের সবাই, এসপি ও ম্যাজিস্ট্রেটকে আসতে হবে। তখন সবার উপস্থিতিতে আপনি লাশ নামাতে পারবেন। তখন কেউই মুজিবুরকে লাশ নামাতে দিচ্ছিল না। তখন মুজিবুর বলেছিলেন, এরকম কোনো নিয়ম নেই। এগুলো পুলিশই করে। লাশটা দ্রুত নামিয়ে ফেলার জন্য অনেক কারসাঁজি করেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, লাশ নামানোসহ সবকিছু তিনি করেছেন খালি হাতে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত ১ জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ময়নাতদন্তকারী তিন চিকিৎসক বাসায় প্রবেশ করে আলামত দেখার সময় হাতে মাস্ক পড়েন। কিন্তু ঘটনার পরপরই কক্ষের প্রতিটি জায়গায় নিজের হাত রেখে আলামত নষ্ট করেছেন পুলিশ পরিদর্শক মুজিবুর রহমান ও অন্য পুলিশ সদস্যরা। বাসার দরজাসহ বিভিন্ন জায়গায় সম্ভাব্য খুনিদের হাতের ছাপ থাকতো। কিন্তু এসব জায়গায় এখন শুধু মুজিবুরের হাতের ছাপ পাওয়া যাবে।’

অভিযোগ প্রসঙ্গে হাটহাজারী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আলামত নষ্টের অভিযোগ সত্য নয়। যে নিয়ম অনুযায়ী আত্মহত্যার লাশ পুলিশ উদ্ধার করে, সেভাবেই দিয়াজের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।’

দিয়াজের পরিবারের অভিযোগ, খুনিরা সামনের দরজা বন্ধ রেখে ভেতরের দরজা ব্যবহার করে ব্যালকনি দিয়ে পালিয়ে যায়। সে হিসেবে দরজা, ব্যালকনির পাশে রাখা বাঁশের মই- এর ডিএনএ টেস্ট করা গেলে সম্ভাব্য ‘খুনি’ শনাক্ত হতে পারে। কিন্তু এসব আলামত জব্দ করে পরীক্ষার ব্যবস্থা নেয়নি হাটহাজারী থানা পুলিশ।

ঝুলন্ত দিয়াজের পা ছিল বিছানার উপর রাখা বালিশের উপর। সুঁতি কাপড়ের মোটা ডাবল খাটের চাদর দিয়ে ১টি মাত্র গিঁট দিয়ে ফ্যানের সাথে কেউ ঝুলে আত্মহত্যা করতে পারে না; লাশ নামানোর সময় একটি মাত্র প্যাচ খুলেছিল তারা। ফাঁস লাগলে গিঁট টাইট হওয়ার কথা, কিন্তু গিঁট ছিল একেবারে ঢিলা। গিঁট কানের যে পাশে ছিল এর বিপরীত পাশে শরীরের ওজনের চাপটা পড়েছিল; স্বাভাবিকভাবেই ভারের কারণে আঘাতের চিহ্ন হলে সেটা গিঁটের বিপরীত পাশে পড়ার কথা। কিন্তু আঘাতের চিহ্ন (রক্তসহ) পাওয়া গেছে, যে পাশে চাপটা পড়েনি সেদিকে। আর যে পাশে শরীরের ভার পড়েছিল, সেখানে ছিল নখের আচঁড়।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘যখন নিজের চেষ্টায় ফাঁস লাগানোর চেষ্টা করবে তখন চাপ পড়বে, জিহ্বার বড় অংশ বের হয়ে যাবে। কিন্তু দিয়াজের ক্ষেত্রে দাঁতের মাঝে সামান্য করে বের হয়েছিল জিহ্বা; কেউ চেপে ধরলে সাধারণত এরকম হয়। দিয়াজের হাত ছিল মুষ্ঠিবদ্ধ; আত্মহত্যা করলে হাত এভাবে থাকে না। দিয়াজের চোখ ছিল বন্ধ; আত্মহত্যা করলে চোখ খোলা থাকে, চোখ পুরো উল্টে যাওয়ার কথা। সুইসাইড করলে তো মানুষ নোটও লিখে যায়।

প্রশ্ন উঠে, আত্মহত্যা করলে বীর্য, প্রস্রাব ও পায়খানা বের হয়। কিন্তু দিয়াজের ক্ষেত্রে এসবের কিছুই বের হয়নি। কাপড় ছিল একেবারে পরিস্কার। খুনের অনেকগুলো আলামত আছে। দিয়াজের টেবিলের উপর নাশতা পাওয়া গেল; নাশতাগুলো কাকে খাওয়ানোর জন্য? একটা মানুষ নাশতা কিনে এসে আত্মহত্যা করবে? কেক, ৬টা কলা, বিস্কিট ছিল।

এছাড়া বাসায় থাকা খাটটা ছিল সোজা। ফ্যানের সাথে তাকে ঝুলতে হলে খাটটা টানার দরকার নেই। ঝোলার জন্য সে তো খাট থেকে সরে আসবে; নয়তো সে নিজের ইচ্ছায় ঝুলতে পারবে না। এখন খাটটা কোনাকুনি করে রাখা হয়েছে। আসলে, সেখানে পাঁচ-ছয়জন ছিল, ওরা দাঁড়ানোর সুবিধার জন্য খাটটাকে মাঝখানে এনে.. এত বড় দেহটাকে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দিয়েছে। দিয়াজ একা থাকলে খাট টানার দরকার ছিল না। ফাঁস লাগলে সে নিজে বাঁচতে চাইবে, তখন নিচে তো পায়ের সাথে বালিশ-খাট লাগানো। তাহলে কীভাবে আত্মহত্যা করবে? চাদরটাও ছিল অন্য রুমের। নিজের রুমের চাদরটা নিল না কেন? তার গলায় যে রক্ত ছিল, তা চাদরে লাগেনি। চাদরটা একেবারে পরিস্কার। সুঁতির কাপড়ের মোটা ডাবল খাটের ছাদর দিয়ে গলা কাটবে কেন? এখন এই প্রশ্নগুলো সংশ্লিষ্টদের মুখে মুখে।

দিয়াজের মৃত্যুর পর তার লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন দেন হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফছানা বিলকিস। তাতে বলা হয়েছিল, লাশের গলায় নিচে বাম দিকে থুতনির নিচে ছিলা দাগ দেখা যায়। গলার ডান দিকে নখের আচড়ের দাগ দেখা যায়। বাম হাতের কনুইয়ের নিচে সামান্য ফুলা দাগ ছাড়াও দুই হাতের কব্জির নিচে কালচে জখমের দাগ দেখা গেছে। এছাড়া বাম পায়ের হাঁটুর নিচে কালচে জখমের দাগ রয়েছে।

এদিকে ঘটনার পর থেকে দিয়াজের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটি পাওয়া যাচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে দিয়াজের বড় বোন অ্যাডভোকেট জুবাঈদা ছরওয়ার নিপা বলেন, ‘তার মোবাইলটা কোথায় গেল? কেউ আত্মহত্যা করলে মোবাইলটা কি গিলে ফেলবে! মোবাইল কোথায় গেল? মোবাইলটা পুলিশ উদ্ধার করতে পারেনি। মোবাইলটি পাওয়া গেলে অনেক কিছুই জানা যাবে।’

‘আলমগীর টিপুর নেতৃত্বে যেদিন বাসায় হামলা হয়, সেদিন ল্যাপটপও নিয়ে গিয়েছিল সাথে। নাছির ভাই বলেছিলেন (মেয়র), ল্যাপটপ ফিরিয়ে দিতে। দিয়াজের মোবাইলের কল রেকর্ডার চালু থাকে সবসময়। সে প্রতিদিন রাতে বাসায় ফিরে কল রেকর্ডগুলো ল্যাপটপে রাখতো। এই যে ল্যাপটপটা নিয়ে যাওয়ার পর দিয়ে গেল, এর মাধ্যমে তারা জেনে গেছে যে মোবাইলে দিয়াজ কথা রেকর্ড করে রাখে। সেজন্য ওরা (খুনী) মোবাইল নিয়ে গেছে। মোবাইলে তো অনেক প্রমাণ, ডকুমেন্ট আছে। মোবাইলটা ঘটনার কয়েকদিন আগে কিনেছিল। তার পরনের ব্লেজারটা বাসায় ছিল, ঘটনার পর সেটাও পাওয়া যাচ্ছে না।’ যোগ করেন নিপা।

তিনি বলেন, ‘যে ঘরে দিয়াজের লাশ পাওয়া গেছে, সেখানে তার চশমাটি ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়। খাটের নিচে রক্তের দাগ আছে। দরজার পাশে ফ্লোরে ছিল লম্বা রক্তের দাগ; রক্তসহ কাউকে টেনে নিয়ে গেছে এমন ইঙ্গিত তাতে। ঘরে দুটি কাপড়ের টুকরোও পাওয়া গেছে; সেখানে কস্ট টেপ লাগানো ছিল। কাপড়ের টুকরোর মধ্যে কস্ট টেপ কেন লাগানো থাকবে? বাসার পেছনেই মই পাওয়া গেছে। ব্যালকনির রেলিংও ভাঙা। ব্যালকনির পাশে ছিল রক্তমাখা পায়ের ছাপ।’

কেউ আত্মহত্যা করলে, তার চশমা সে ভেঙে ফেলবে কিনা? ৫ ফুট ৬ ইঞ্চির একটা ছেলে ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতায় কীভাবে আত্মহত্যা করে- সে প্রশ্নও রাখেন দিয়াজের বোন জুবাঈদা ছরওয়ার নিপা।

গত ১২ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর লাশের দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের পরদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আমানত হলের ডাইনিংয়ের পাশে পাওয়া যায়, তার স্নাতক আর তার বাবার মুক্তিযোদ্ধা সনদ। বর্তমানে ওই হলে কর্মরত আছেন দিয়াজ ইরফানের বাবা সরওয়ার কামাল। এ প্রসঙ্গে নিপা বলেন, ‘সনদপত্রগুলো বাসায় থাকার কথা। সেগুলে হলে কীভাবে গেল বুঝতে পারছি না।’
দিয়াজের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিল চবি ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক রাশেদুল আলম জিসান; পরে তাকে দিয়াজ হত্যা মামলায় আসামি করা হয়। এ বিষয়ে নিপা বলেন, ‘অনুসারী নেতাকর্মীদের সাথে দিয়াজের কোনো ঝামেলা হয়নি। জিসান বেঈমানি করতো। দিয়াজের কথাগুলো টিপুকে (চবি ছাত্রলীগ সভাপতি) জানিয়ে দিত। জিসানের মত আর কেউ এখন পর্যন্ত নেই।’

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৫ কোটি টাকার দরপত্রের টেন্ডার নিয়ে সৃষ্ট বিরোধসহ আরো কয়েকটি কারণে দিয়াজকে ষড়যন্ত্র করে খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছে তার পরিবার। দিয়াজের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে আত্মহত্যার কথা এলে তা প্রত্যাখ্যান করে দিয়াজ ইরফান চৌধুরীকে হত্যার অভিযোগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ও ছাত্রলীগ সভাপতিসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে পরিবার। আদালতে দায়েরকৃত এই মামলার আর্জিতে ফৌজদারি দন্ডবিধির ৩০২, ২০১, ও ২৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য সিআইডিকে আদেশ দেয় চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শিবলু কুমার দের আদালত।

এ প্রসঙ্গে সিআইডির চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘রুটিন বদলির অংশ হিসেবে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা এএসপি অহিদুর রহমান গাইবান্ধা জেলায় বদলি হয়েছেন। এখন নতুন করে মামলা তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন এএসপি হুমায়ুন কবির সরকার। দিয়াজের অস্বাভাবিক মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে আমাদের তদন্ত অব্যাহত আছে। আশা করছি, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে পারবো।’