১৮ অক্টোবর ২০১৮, ২ কার্তিক ১৪২৫, বুধবার

হতে চেয়েছিলেন সাংবাদিক, হয়েছেন রাষ্ট্রদূত

প্রকাশিতঃ বুধবার, মে ৯, ২০১৮, ১১:৪৫ অপরাহ্ণ

.ওমর ফারুক হিমেল, দক্ষিণ কোরিয়া : শৈশব থেকে দেশ-বিদেশের সংবাদ, রাজনীতি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তাঁর। নিজেকেও তৈরি করেছেন সে আদলে। অর্থাৎ সাংবাদিক হবেন, বিশ্বজনীন সাংবাদিক। সেজন্য ঢাকার আইডিয়াল স্কুল, হলিক্রস কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি-পরীক্ষা দিলেন।

সাবজেক্ট পেলেন সাংবাদিকতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগসহ আরও কয়েক। খুশিতে আটখানা তিনি। শেষপর্যন্ত ‌‌’স্বপ্নের সাবজেক্ট’টি ধরা দিলো। তাহলে সাংবাদিকই হচ্ছেন, মস্তবড় সাংবাদিক! খবরের সন্ধানে ছুটে বেড়াবেন দেশ-দেশান্তরে। কিন্তু না, সাংবাদিক হতে পারেননি তিনি। পড়া আর হয়ে উঠেনি সাংবাদিকতায়। এ পড়া না হয়ে উঠার পেছনের গল্পটা এরকম।

বাবা তাঁর ‘আদর্শ’, ‘ফিলোসপার’, ‘বন্ধু’, ‘গাইডার’। সেই ‘বন্ধু’র আগ্রহে শেষপর্যন্ত তাকে পড়তে হলো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। অবশ্য এ নিয়ে বাবার তাগাদাটা অনেক পুরোনো। ছাত্রজীবন থেকে বাবা তাকে ফরেন সার্ভিসে যোগ দেয়ার তাগাদা দিতেন, প্রাণিত করতেন। বলা চলে, যখন সপ্তম কিংবা অষ্টম শ্রেণীতে; তখন থেকেই এ অনুপ্রেরণা। ছোটবেলায় বৈশ্বিক ধারণাটা বাবার কাছেই পাওয়া। বাবা বোঝাতেন, শেখাতেন দেশ-বিদেশে চ্যালেঞ্জিং কাজ করার গুরুত্ব।

তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েই মনে পড়ে বাবার ইচ্ছা ও স্বপ্নের কথা। তিনি ভাবলেন, সাংবাদিকতা করে নিজের ইচ্ছাপূরণের চেয়ে বাবার স্বপ্নপূরণের আনন্দ ঢের বেশি। বাবার স্বপ্নপূরণ করে বেশি ‘আনন্দ’ লাভের জন্যই সেদিন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়তে মনস্থির করেছিলেন। এরপর কৃতিত্বের সঙ্গে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে ১৫তম বিসিএসে (১৯৯৫ সাল) অংশ নিয়ে পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দেন তিনি।

এর পরের গল্পটা কেবলই এগিয়ে যাওয়ার, চ্যালেঞ্জ নেয়ার। স্বাপ্নিক, চ্যালেঞ্জিং, গদ্যময় পথে চলতে চলতে তিনি এখন ভিয়েতনামে বাংলাদেশের নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত।

বলছিলাম বাংলাদেশের মেধাবী কূটনীতিক সামিনা নাজ-এর কথা। সাংবাদিকতা করে বিশ্বজনিন হতে চেয়েছিলেন যে সামিনা; সেই তিনি বিশ্বজনিন হয়েছেন বটে। তবে সাংবাদিকতা নয়, আরো বৃহত্তম পরিসরে কূটনীতির মতো চ্যালেঞ্জিং, অ্যাডভেঞ্চারাস ভুবনে যুক্ত হওয়ার মধ্যদিয়ে।

রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজ একারণেই বলেন, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা এস এম আফজালুর রহমান তাঁর অনুপ্রেরণার বাতিঘর। তাঁর মস্তিষ্কের, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, তাঁর শিক্ষার, তাঁর পেশার সহায়ক শক্তি। কেননা ছোটবেলা থেকে বাবাই তাঁর মাথায় জগতের মহত্তম বিষয়গুলোর বীজ বপন করেছিলেন। তাই বাবার কাছে অনিঃশেষ ঋণ রাষ্ট্রদূত সামিয়া নাজের।

দেশের বাইরে সামিনা নাজ-এর প্রথম কর্মজীবনের শুরু নেদারল্যান্ডসে বাংলাদেশ দূতাবাসের সেকেন্ড সেক্রেটারি হিসেবে। সেখান থেকে বাংলাদেশে ফিরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কিছুদিন। এরপর তাঁকে ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় নিউইয়র্কে জাতিসংঘের স্থায়ী মিশনের থার্ড কমিটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে। সাড়ে তিন বছর সামাজিক ও মানবাধিকার ইস্যু দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে কাউন্সিলর পদে পদোন্নতি পান। এরপর তাকে একই পদে দিল্লিতে প্রেরণ।

দিল্লিতে পৌনে তিন বছরের মতো কাজ করে সামিনা বাংলাদেশে ফিরলেন। সে সময় মা হতে চলেছেন তিনি। এ কারণে প্রথমে পরিচালক এবং পরে মহাপরিচালক হিসেবে প্রায় সাত বছর ঢাকায় ছিলেন। স্বদেশ কিংবা বিদেশে; যেখানেই গেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন সামিনা। এমনকি জমজ সন্তান জন্ম দেয়ার দশ দিন আগেও তিনি দেশের কর্মস্থলে অফিস করেছেন।
সামিনা নাজ বলেন, এমন অবস্থায় কাজ করাটা খুবই কষ্টের। তবে স্বামী ও সহকর্মীদের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছি বলে তা সহজ ঠেকেছে। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং তাঁর সহধর্মিণীও ছিলেন যথেষ্ট কেয়ারিং। এক্ষেত্রে আমি ভাগ্যবতীও বটে। এছাড়া নিজের প্রবল ইচ্ছাশক্তি তো ছিলই।’

টুইন সন্তানের বয়স পাঁচ হওয়ার পর আবার দেশের বাইরে পোস্টিং নেন সামিনা নাজ। এসময় সামিনাকে বলা হয় ভারতের মুম্বাইয়ে বাংলাদেশের একটি নতুন মিশন খুলতে। ২০১৩ সালে সামিনা মুম্বাইয়ে প্রথম বাংলাদেশ মিশন অফিস খোলেন। তিনিই প্রথম নারী রাষ্ট্রদূত যার অধীনে কোনো নতুন মিশন অফিস খোলা হয় মুম্বাইয়ে।

এভাবেই সামিনার পেশাজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে এসেছে প্রথম নারী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ। পররাষ্ট্র ক্যাডারে নারীর সর্বোচ্চ অংশগ্রহণে প্রথম ব্যাচ, নিজ ব্যাচ থেকে প্রথম নারী রাষ্ট্রদূত, প্রথম নারী হিসেবে কোনো দেশে মিশন অফিস চালু করা। এছাড়াও মন্ত্রণালয়ে কাজ করার সময় ২০০৮ সালে প্রথম নারী ‘ডেপুটি চিফ অব প্রটোকল ভিজিট’ হন সামিনা। আবার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তরের প্রথম নারী পরিচালকও তিনি।

বলাবাহুল্য, দেশ-বিদেশে ছুটোছুটি বেশি বলে নারীদের এই পদে নেয়া হয় কম। কিন্তু নিজ যোগ্যতা ও কাজের প্রতি আগ্রহের ফলে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন, অজেয়কে জয় করেছ সর্বোপরি সামিনা হতে পেরেছেন ‘প্রথম’।

রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ফরেন সার্ভিসে চাকরি করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। অন্য পেশার চেয়ে কূটনীতিক পেশার ভিন্নতা আছে। আমি অনুভব করি এখানে কাজ করলে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা যায়। একজন কূটনীতিককে গ্লোবাল এরিনা নিয়ে খেলতে হয়, ধারণা রাখতে হয় আন্তর্জাতিক রাজনীতির পুঙ্খানুপুঙ্খ।

তিনি বলেন, এই পেশায় কোনো কাটসাট পদ্ধতি নেই। কূটনীতির পেশাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে প্রচুর পড়তে হয়। বিশ্বের সব মানুষের সঙ্গে মিশতে হয়। জানতে হয় তাদের সংস্কৃতি। সর্বোপরি নিজের প্রিয় মাতৃভূমিকে বিদেশের মাটিতে সুন্দর, সুমজ্জ্বল উপস্থাপনের জন্য থাকতে হয় বিশেষ যোগ্যতা।

কর্মনিষ্ঠা, অধ্যাবসায়, উৎকর্ষতা সর্বোপরি আত্মোৎসর্গী ও দায়িত্বশীল হলে কূটনীতির পেশায় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। এসব যার আছে, সাফল্য তাকে ধরা দেবেই। বলেন ভিয়েতনামের রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজ।

একুশে/ওএফএইচ/এটি

প্রিন্ট করুন