১৯ আগস্ট ২০১৮, ৩ ভাদ্র ১৪২৫, শনিবার
পরীক্ষামূলক সম্প্রচার

দেশের যুদ্ধ, জীবনের যুদ্ধ : সবখানেই দেদীপ্যমান তিনি

একুশে প্রতিবেদক
প্রকাশিতঃ শুক্রবার, মে ২৫, ২০১৮

রত্নদীপ দাস (রাজু) : মানুষ মরণশীল। প্রকৃতির চিরাচরিত নিয়মে এই মায়াময় পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে একদিন চলে যেতে হয়। কালের আবর্তে ঢাকা পড়ে তাঁদের নাম। কিন্তু অমরত্বের বর না নিয়ে আসা মানবজাতির মধ্যে কেউ কেউ তাঁদের মহৎ কর্মে কালের বিবর্তনেও স্মরণীয় হয়ে থাকেন প্রজন্মান্তরে। তাঁদের দেখানো পথ জীবদ্দশায়ই শুধু মানবজাতির কল্যাণে আসে না, মৃত্যুর বহুকাল পরও মানবকল্যাণে ও মানবসভ্যতা বিকাশে কাজ করে। তেমনি একজন আলোকিত মানুষের পথিকৃত রবীন্দ্র চন্দ্র দাস (১৯৪৫-২০১৭)।

রবীন্দ্র চন্দ্র দাস অবিভক্ত ভারতবর্ষের আসাম প্রদেশের সিলেট জেলাধীন নবীগঞ্জ থানার ৩৯ নং সার্কেলের (জন্তরী পরগনা) ঐতিহ্যবাহী মুক্তাহার গ্রামের এক সংস্কৃতমনা ও সম্পন্ন পরিবারে ১৯৪৫ সালের (বাংলা ১৩৫২) এক কীর্তিলগ্নে জন্মগ্রহণ করেন (যদিও তাঁর সার্টিফিকেট অনুযায়ী জন্ম তারিখ ৩১/০১/১৯৫৪ খ্রি.)। তাঁর পিতা দীগেন্দ্র চন্দ্র দাস (১৯০৫-১৯৭৬) ও মাতা মণিবালা দাস। তাঁর জন্মটা হয়েছিল রবিবারে। তাই বাবা-মা তাঁর নাম রাখেন রবীন্দ্র। আদর করে ডাকতেন “রবি’’ বলে। রবি (অর্থ্যাৎ সূর্য) যেমন চারদিক আলোকিত করে, তেমনি তিনিও তাঁর মা-বাবার কোল আলোকিত করেছিলেন এবং একটা সময় তাঁর পরিপার্শ্বকে। মাত্র দুই বছর বয়সেই তিনি মাতৃহারা হন। পিতা দীগেন্দ্র চন্দ্র দাস সাংসারিক প্রয়োজনে দ্বিতীয় বার দার গ্রহণ করেন তাঁর প্রথম স্ত্রীর ক্ষুরতোত বোন সুক্রতি রানী দাসের সাথে। রবীন্দ্র চন্দ্র দাস পাঁচ ভাই ও তিন বোনদের মধ্যে দ্বিতীয়।

বাল্যকাল থেকেই তিনি ছিলেন- জেদি, উদ্যমী, স্বাধীনচেতা ও নির্ভীক। যত কঠিন কাজই হোক না কেন, কোন কিছুই দুরূহ মনে করতেন না। বাল্যকালে তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা এলাকায় কিংবদন্তির জন্ম দেয়। পাখি শিকার ও খেলাধুলা নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন সারাক্ষণ। মাতৃহারা হলেও পিতা, বিমাতা, পিতামহী ও আত্মীয়-প্রতিবেশীদের পরিমণ্ডলে অনাবিল স্নেহ ছায়ায় তাঁর বেড়ে ওঠা।

১৯৫৬ সালে মুক্তাহার গ্রামের পার্শ্ববর্তী বৈলাকীপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ম শ্রেণীতে ভর্তি হন দুই সহোদর। সেখানে ৪র্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। পুনরায় ১৯৬০ সালে তিনি নবীগঞ্জ যোগল-কিশোর উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪র্থ শ্রেণীতে ভর্তি হন (তৎকালে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকেই ইংরেজীতে ভিত্তি মজবুত করার জন্য পুনরায় ৪র্থ শ্রেণিতে ভর্তি হতে হতো)। পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ হিসাবে বাল্যকাল থেকেই তিনি ছিলেন সংস্কৃতমনা। যাত্রাদলে অভিনয় ও গানের ভীষণ অনুরাগী ছিলেন। কোন ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কোর্স ছাড়াই বাউলসংগীত ও লোকসংগীতে পারদর্শিতার পাশাপাশি অভিনয়েও সমান পারঙ্গমনতা অর্জন করেন। তাছাড়া ফুটবল, হাডুডু, দৌড়, সাঁতার, বক্তৃতাসহ সকল প্রতিযোগিতায় কৃতিত্ব অর্জন করেন। ৮ম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময়ে সাঁতার প্রতিযোগিতায় হবিগঞ্জ মহকুমার মধ্যে ১ম ও সিলেট জেলার মধ্যে ৩য় স্থান অর্জন করেন। ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে গভীরভাবে সক্রিয়তার কারণে এক পর্যায়ে পড়াশোনা থেকেই বিদায় নেন। প্রায় তিন বছর শিক্ষা বিরতি ঘটে তাঁর। এই সময়টায় ফুটবল খেলে ঘাটু ও যাত্রাদলে অভিনয় এবং গান গেয়েই তাঁর সময় অতিবাহিত হতো।

তিন বছর (১৯৬২ – ১৯৬৪) শিক্ষা বিরতির পর তিনি ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে আবারও পড়াশোনায় মনোযোগী হলেন। কিন্তু খেলাধুলা, গান ও অভিনয় চালালেন সমানভাবে। হাইস্কুলে এবং নবীগঞ্জ বাজারে এমন কোন টুর্নামেন্ট, গানের অনুষ্ঠান কিংবা যাত্রা-থিয়েটার এর আয়োজন হতো না যেখানে তিনি নেই। সর্বত্রই সর্বাগ্রে ছিল তাঁর ভূমিকা। এই সময়টায় তিনি সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে এসব কাজের জন্য যাতায়াত করতেন। পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তাঁর শিক্ষক রামদয়াল ভট্টাচার্য, আব্দুল আজিজ চৌধুরী, বাবু কৃষ্ণ চন্দ্র নাথ, বাবু চারু চন্দ্র দাস প্রমুখ শিক্ষক মণ্ডলীর এক প্রিয়পাত্রে পরিণত হন। পাশাপাশি নবীগঞ্জের খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব জমিদার শ্যামাপ্রসন্ন দাশগুপ্ত (বিধুবাবু), জনাব মিম্বারুর রহমান চৌধুরী প্রমুখ নবীগঞ্জের নেতৃবৃন্দের প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেন।

নবম-দশম শ্রেণী বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষার তিন মাস পূর্বে বিভাগ পরিবর্তন করে মানবিক বিভাগে চলে যান (ঐ সময়ে পরীক্ষার পূর্বে বিভাগ পরিবর্তন করা যেত)। তিন মাস মানবিক বিভাগের বই পড়েই উচ্চতর ২য় বিভাগে ১৯৭০ সালে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হন। উমেদনগর লজিং বাড়িতে ছাত্র পড়ানোর বিনিময়ে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হয়। এখানে থেকেই একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণী পড়া হয়। কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি চালিয়ে যান তাঁর অন্তরের গভীরতম প্রদেশে লালন করা গান ও অভিনয় চর্চা। তিনি ছাত্র হিসেবে যেমন ছিলেন মেধাবী, তেমনি হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজের ছাত্র সংসদ রাজনীতিতেও ছিলেন সক্রিয়। এই সময়টা অর্থ্যাৎ ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সালটা ছিল উত্তাল। এই সময়ে মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক প্রয়োজনে হবিগঞ্জ আসলে, তাঁদের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগও হয় তাঁর। মাওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধুর (হবিগঞ্জের) রক্তে আগুনলাগা জ্বালাময়ী ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশমাতৃকা মুক্ত করার সংগ্রামে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন তিনি। সারা দেশের ন্যায় হবিগঞ্জেও গগনবিদারী স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সকল স্কুল-কলেজে, হাটে-বাজারে, গ্রামে-গঞ্জে সারাবাংলায় স্লোগানগুলো ছিল-

‘জিন্না মিয়ার পাকিস্তান, আজিমপুরের গোরস্থান’;
‘তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ।’
‘জ্বালিয়ে দাও পুড়িয়ে দাও, পাকিস্তানের পতাকা’;
‘ঘরে ঘরে উড়িয়ে দাও, স্বাধীন বাংলার পতাকা।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর সারাদেশ জুড়ে যখন স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি শুরু হয়, তখন যুবক রবীন্দ্রও স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে যুদ্ধে যোগদানের প্রত্যয় নিয়ে বাড়ি ফিরেন। নবীগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি পুরুষ জননেতা শ্যামাপ্রসন্ন দাশগুপ্ত (বিধুবাবু) এর নেতৃত্বে কাজ শুরু করেন। এলাকায় তখন মুক্তিবাহিনী গঠনের পাশাপাশি চলছে শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী গঠনের কাজ।

একাত্তরের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর দেশ একটি অনিবার্য যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যায়। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো নবীগঞ্জেও লাগাতার মিছিল মিটিং শুরু হয়। নবীগঞ্জ জে,কে হাইস্কুলের প্রাক্তন ছাত্ররাই ছিলেন এসব মিছিল মিটিং এর উদ্যোক্তা। প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে রবীন্দ্র চন্দ্র দাসও এসব ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় হানাদার বাহিনীর আক্রমণও তীব্র হতে শুরু করে।

এ সময় পূজার হাটে পাকিস্তানি দোসরদের অন্যতম নবীগঞ্জ থানার শান্তি কমিটির আহ্বায়ক মাওলানা মোহাম্মদ ইসমাইল ও সদস্য সচিব আব্দুর রহমান এর সহায়তায় ও প্ররোচনায় হানাদারদের একটি ইউনিট নবীগঞ্জ আক্রমণ করে বর্বরতম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে। ডিনামাইট দিয়ে ধ্বংস করে শ্রী শ্রী কালীবাড়ী ও শ্রী শ্রী কানাই লাল জিউড় আখড়া (প্রতিষ্ঠান দুটি বর্তমানে নবীগঞ্জ থানার দখলে), হামলা করে শ্রী শ্রী মদনমোহন জিউড় আখড়া ও শ্রী শ্রী গোবিন্দ জিউড় আখড়ায়। আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় পূর্ববঙ্গের তিনটি রথে একটি নবীগঞ্জ শ্রী শ্রী গোবিন্দ জিউড় আখড়ার ঐতিহ্যবাহী রথ।

এই গণহত্যার পর নবীগঞ্জের সর্বত্র ত্রাস সঞ্চারিত হয়। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায় দেশে অবস্থান করা অনিরাপদ মনে করে জন্মভিটে ত্যাগ করে ভারতে শরণার্থী হিসেবে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এসময় সমগ্র মুক্তাহার গ্রামটি সম্পূর্ণ জনশূন্য হয়ে যায়। রবীন্দ্র চন্দ্র দাস পরিবার পরিজনসহ ভারত গমন করে, মৈলাম শরণার্থী ক্যাম্পে পরিবার-পরিজনদের রেখে বাবা-মাসহ পরিবারের অন্যান্যদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটিং ক্যাম্পে উপস্থিত হন। কর্নেল মীর শওকত আলী তাঁকে রিক্রুট করেন। রিক্রুট হওয়া সদস্যদের থেকে শিক্ষিত এবং কলেজ ছাত্রদের বাছাই করে আলাদা একটি ব্যাচ তৈরি করে প্রথম ১৫/২০ দিন বিভিন্ন শারীরিক কসরত শিক্ষা দেয়া হয়। ট্রেনিং এর এ পর্যায়েই পাক হানাদারবাহিনী ছাতক আক্রমণ করে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরী দখল করে নেয়। পাক হানাদারদের সীমান্তের কাছাকাছি এই অঞ্চল থেকে হটানোর জন্য ভারতীয় একটি বাহিনীও পাল্টা আক্রমণ করে। ভারতীয় বাহিনীর সহযোগী হিসেবে অন্যদের সাথে রবীন্দ্র চন্দ্র দাসও এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

১২/১৪ দিন পর তাদেরকে এক অজানা গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া হয়। কোথায় নেয়া হচ্ছে তা জিজ্ঞেস করা কঠিনভাবে নিষিদ্ধ ছিল। এই গন্তব্যের যাত্রাপথেই সর্বাধিক বৃষ্টিবহুল এলাকা চেরাপুঞ্জিতে কিছু সময় বিশ্রাম নেয়া হয়। তারপর তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় এক পাহাড়ের সুউচ্চ টিলায়। এটিই তাদের ট্রেনিং ক্যাম্প। জানানো হয় এই ট্রেনিং ক্যাম্পের নাম ‘ইকো ওয়ান’। এখানেই তাদের ট্রেনিং চলল। ভৌগোলিক এবং অবস্থানগত কারণেই এখানে গুলাগুলির প্রশিক্ষণ চালালেও টিলার অপর পাশ থেকে কোনো শব্দ শোনা যেত না। নীরব নিঝুম এলাকা। জনমানবের চিহ্নমাত্র নেই এমনকি পাখ-পাখালির শব্দও নেই। সরল নামক এক প্রকারের গাছের ঘন বুনট। পত্র-পল্লবের ফাঁক দিয়ে আকাশও দৃষ্ট হয় না। এই নিবিড় অরণ্যের ফাঁকে ফাঁকেই অনেকগুলি তাবু খাটানো। প্রতি তাবুতে ১০/১২ জন করে সদস্য। বাছাইকৃত শিক্ষিত যুবকদের ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের কার্যক্রমের উপর ২১ দিনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। গ্রেনেড, রাইফেল, এস এল আর চালানো ইত্যাদির ট্রেনিং দেয়া হয়। তাদের প্রশিক্ষক ছিলেন লাল সিং রাহুতসহ আরও কয়েকজন। ৩০ জনকে নিয়ে ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ করা হয়।

ইকোওয়ান এ ট্রেনিং শেষে এই ৩০ জনকে ৫নম্বর সেক্টরের ৬টি সাব-সেক্টরে ৫জন করে ভাগ করে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে প্রেরণ করা হয়। তিনি সংগীয় সহযোদ্ধাদের সাথে ৫ নম্বর সেক্টরের টেকারঘাট সাব-সেক্টরে আসেন এবং সাব-সেক্টরের কমান্ডিং অফিসার ক্যাপ্টেন মোসলেম উদ্দিন ওরফে দীন মোহাম্মদ এর অধীনে মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র পর্বে অংশগ্রহণ করেন। একটা সময় ক্যাপ্টেন দীন মোহাম্মদের সাথে অনেক মুক্তিযোদ্ধার মনোমালিন্য দেখা দিলে রবীন্দ্র চন্দ্র দাস বালাট সাব-সেক্টরে চলে আসেন। বালাট সাব-সেক্টরের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন ক্যাপ্টেন মোত্তাল্লিব। এসময় একদিন ৪ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর সি আর দত্ত ক্যাম্প পরিদর্শনে আসলে মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে অনুপ্রেরণার সৃষ্টি হয়। বাকি দিনগুলিতে ক্যাপ্টেন মোত্তাল্লিব সাহেবের কমান্ডেই তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যান।

১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের পর বাড়ি ফিরে আসেন। বাড়ি বলতে শূন্য ভিটায় আগাছার জঙ্গল। ঘর-দুয়ারের চিহ্নমাত্র কোথাও নেই। শরণার্থী হিসেবে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর প্রতিবেশী গ্রামের কিছু অসাধু লুটেরা বাড়ির ভিটে টুকু ছাড়া সব কিছু লুটে নিয়ে গেছে। একদিকে যুদ্ধে বিজয়ীর বেশে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আনন্দ অন্যদিকে বিরান গ্রামের সকরুণ চিত্র তাঁকে মর্মাহত করে। কিন্তু জীবনতো থেমে থাকে না, থাকতে পারে না। তাই তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নতুন করে জীবন সংগ্রাম শুরু করেন।

১৯৭২ সালের প্রথম দিকে হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজ কর্তৃক এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তিনিও এতে অংশগ্রহণ করেন। এই অনুষ্ঠানে শর্ত ছিল একজন শিল্পী শুধুমাত্র একটি গানেই পরিবেশন করতে পারবেন। কিন্তু তাঁর গানটি শেষ হতে না হতে মুহূর্মুহূ স্লোগান উঠতে থাকলে আয়োজক কমিটি তাঁকে পুনরায় গান গাওয়ার সুযোগ দেন এবং এই অনুষ্ঠানে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। এই অনুষ্ঠানে অনেক গুণীশিল্পীও অংশগ্রহণ করেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম সুবীর নন্দী (বর্তমানে দেশের বিখ্যাত শিল্পী)।

তারপর জীবন জীবিকার তাগিদে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে তাঁকে নামতে হয় কঠিন এক জীবন সংগ্রামের পথে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চাকরি প্রতিযোগিতায় নেমেই আশাতীত সুযোগ পান একই সাথে তিনটি পদে উত্তীর্ণ হয়ে। পদ তিনটি হলো পুলিশ বিভাগে সাব-ইন্সপেক্টর, চা বাগানের টিলা বাবু এবং প্রাইমারী স্কুলের সহকারী শিক্ষক। তাঁর পিতার নির্দেশে ও শিক্ষা বিস্তারের প্রতি গভীর আগ্রহের কারণে শিক্ষকতাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালের ১ জুন যোগদান করেন বোরহানপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে।

১৯৭৪-১৯৭৫ শিক্ষাবর্ষে তিনি হবিগঞ্জ প্রাইমারী টিচার্স ট্রেনিং ইন্সট্রিটিউশন থেকে কৃতিত্বের সাথে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হন। সেখানেও তাঁর গান তথা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শিক্ষকমণ্ডলী ও সহপাঠীদের অভিভূত করে। প্রশিক্ষণ শেষে আবার শিক্ষকতা পেশায়। এবার তাঁকে প্রধান শিক্ষক পদে প্রমোশন দিলে তিনি সহকারী শিক্ষকপদে থাকতে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। উল্লেখ্য যে, এভাবে তাঁকে তিনবার ডিপার্টমেন্টাল প্রমোশন দিলে তিনি নাকচ করেন এবং শেষ পর্যায়ে তিনি লিখিত দেন যে, তিনি চাকরি জীবনে কখনো প্রধান শিক্ষক পদে দায়িত্ব নেবেন না। অত্যন্ত আন্তরিকভাবে ছাত্রদের পাঠদান করতেন। তাঁর কড়া শাসন, দৃঢ় মনোবল, ঐকান্তিকতা ও জ্ঞানগর্ভ পাঠদান পরীক্ষায় সফলতা বিশেষ করে সেন্টার পরীক্ষা ও বৃত্তি পরীক্ষায় তাঁর ছাত্রদের বিশেষ কৃতিত্ব অর্জনে শিক্ষক হিসেবে তাঁর নামডাক বাড়তে থাকে। ছাত্ররা তাঁকে যেমন প্রচণ্ড রকমের ভয় পেত, তেমনি তিনি ছাত্রদের ও অভিভাবকদের ভালবাসা ও শ্রদ্ধায় হতেন সিক্ত। তিনি যেই স্কুলেই যোগদান করতেন সেই স্কুলের রেজাল্ট দ্রুুুত গতিতে বেড়ে যেত এবং প্রাথমিক বৃত্তি আসত সেই স্কুলে। এক পর্যায়ে তাঁর গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতাকালীন সময় বড় শাখোয়া গ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তাঁকে অনুরোধ করে তাঁদের স্কুলে নিয়ে যায় এবং বড় শাখোয় স্কুলে কয়েক বছর থাকার পর অনুরূপভাবে পাশ্ববর্তী বৈলাকীপুর স্কুলে যোগদান করেন। বৈলাকীপুর স্কুলেই তিনি তাঁর ৪২ বছরের সুদীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের ৩৬ বছর অত্যন্ত সুনাম ও সম্মানের সাথে শিক্ষতা করেছেন।

জীবনাচারে তিনি ছিলেন ভদ্র, সজ্জন, সংস্কৃতমনা, পরোপকারী, সৌখিন, নির্লোভ, নির্ভীক ও উন্নত রুচির অধীকারী। পড়তেন কালো পেন্টের সাথে সাদা টাইপওয়ালা কিংবা মানান সই শার্ট, কখনো কখনো সাদা পাঞ্জাবির সাথে সাদা পায়জামা বা ধুতি। একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন হিসেবে সবাই তাঁকে মান্য করত। শিক্ষকতা পেশার পাশাপাশি তিনি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যেমন ছিলেন সক্রিয়, তেমনি তিনি এলাকার বিচার-বৈঠক ও বিভিন্ন সামাজিক অসন্তোষজনক কর্মকাণ্ড সমাধানে ছিলেন অগ্রগণ্য। শিক্ষকতা, সামাজিকতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আসতে আসতে তিনি এক অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়ে উঠেন। “রবীন্দ্রবাবু’’ বা “রবীন্দ্র মাস্টারবাবু” এই নামেই তিনি বিভিন্ন এলাকার সামাজিক ও পেশাজীবী শ্রেণী, নবীগঞ্জের আপামর জনসাধারণ এবং আশপাশের এলাকার মানুষের কাছে ছিলেন অত্যন্ত সুপরিচিত ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব।

আশির দশকে সরকার উপজেলা পরিষদ গঠন করলে উপজেলা শিক্ষা কমিটি শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচন করেন। উল্লেখ্য যে, তখন শুধুমাত্র প্রধান শিক্ষকদের মধ্য থেকেই “শ্রেষ্ঠ শিক্ষক” নির্বাচন করা হতো। কিন্তু ১৯৮৬ সালে শিক্ষা কমিটির মিটিংয়ে আলোচনা হয় যে- “যদি কোনো শিক্ষক তাঁর মেধা, মননশীলতা ও যোগ্যতায় শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা রাখেন, তাহলে তিনি প্রধান শিক্ষকই হোন অথবা সহকারী শিক্ষকই হোন তাঁকে “শ্রেষ্ঠ শিক্ষক”-এর মর্যদা দেওয়া কর্তব্য।” এ বছরই অর্থ্যাৎ ১৯৮৬ সালেই তিনি “শ্রেষ্ঠ শিক্ষক” নির্বাচিত হন। তাছাড়া শিক্ষা অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন সংগঠন আয়োজিত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় তিনি বিচারক হিসেবে নন্দিত হন।

২০০৫ সালে বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি নবীগঞ্জ উপজেলা কমিটি গঠনের লক্ষ্যে সরাসরি প্রথম বারের মতো প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তিনি সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে নির্বাচিত হন। সমিতির কার্যক্রমে মেধা ও প্রজ্ঞা দ্বারা সংগঠনকে শক্তিশালী করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এছাড়া সমিতির কয়েকটি নির্বাচনে তিনি নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব নিরপেক্ষতার সাথে পালন করেন। বিভিন্ন কার্যক্রমে তিনি শিক্ষক সমাজের অভিভাবকের ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দায়িত্বশীল পদে না থেকেও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সম্মুখসারিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

৩১ জানুয়ারী ২০১৫ তিনি শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেন। সুন্দর-সুঠাম দেহের অধিকারী, সদালাপী, সদা হাস্যোজ্জ্বল রবীন্দ্রবাবুকে সত্তরোর্ধ্ব বয়সেও তারুণ্যদৃপ্ত দেখা যেত। কোনোপ্রকার ব্যধি তাঁর শরীরে বাসা বাঁধতে পারেনি। সুস্থ স্বাভাবিক চলাফেরা, জীবনযাপন অত্যন্ত গোছানো। কিন্তু ২০১৭ সালের ১লা অক্টোবর (দূর্গাপূজার দশমীর পরদিন) হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। একমাস এক সপ্তাহ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোটামুটি স্বাভাবিক ছিলেন। এরপর ভর্তি হন সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল হাসপাতলে। সেখানে ১২ দিন থাকার পর ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালে ১৫ দিন, পরে ভারতের মাদ্রাজ শহরের গ্লোবাল হসপিটাল সিটিতে ১২ দিন চিকিৎসা করে ফিরে এসে ৩ দিন সিলেট নর্থ-ইস্ট মেডিক্যাল হাসপাতালের আইসিইউতে ৩ দিন থেকে ১৪ ডিসেম্বর বাড়ি ফিরেন। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের দিন রাত ৮.২১ মিনিটে শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণকালীন সময়ে ৭২ বছর বয়সে অনন্তের পথে যাত্রা করেন ৭১’র অকুতোভয় বীর সেনানী, কিংবদন্তি শিক্ষক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্র চন্দ্র দাস। রাত ১১.৪৫ ঘটিকায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদাদানের পর পারিবারিক শ্মশানে চিরনিদ্রায় শায়িত হন তিনি।

মৃত্যুকালে স্ত্রী, পুত্র, কন্যা সহ অসংখ্য গুণাগ্রাহী রেখে যান। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী মানবতাবোধ সম্পন্ন একজন দেশপ্রমিক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, এলাকার শিক্ষাবিস্তার ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের এক গৌরবদৃপ্ত ব্যক্তিত্ব হয়ে তিনি বেঁচে রইবেন। তাঁর অমর আত্মার পরমগতি লাভ হোক পরম করুনাময়ের কাছে এই হোক আমাদের সবার ঐকান্তিক প্রার্থনা।

লেখক : গবেষক; শিক্ষানবীশ আইনজীবী; সদস্য সচিব, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড, নবীগঞ্জ উপজেলা, হবিগঞ্জ; প্রতিষ্ঠাতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রী রবীন্দ্র চন্দ্র দাস গ্রন্থাগার, মুক্তাহার, নবীগঞ্জ।