১৮ অক্টোবর ২০১৮, ২ কার্তিক ১৪২৫, বুধবার

‘দলকানা না হয়েও আমি আইসিটি প্রসিকিউটর !’

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, মে ২৯, ২০১৮, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ

আজাদ তালুকদার : ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ের ঘটনা। কক্সবাজারে একটি মামলার শুনানি শেষে ফিরছিলাম। চট্টগ্রামের এক শুভানুধ্যায়ী সংবাদকর্মী ফোন করে বললেন, ‘অভিনন্দন’। কেন অভিনন্দন জানতে চাইলাম। বললেন, ‘এটর্নি জেনারেল পদমর্যাদায় সরকার আপনাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর করেছে। টেলিভিশন-স্ক্রলে আপনার নাম দেখাচ্ছে।’

এরপর আরও অনেক ফোন, শুভেচ্ছা-অভিনন্দন। যতবার ফোন আসে, ততবার আমি বিস্মিত হই। আমাকেই বা কেন এতবড় দায়িত্বে আনা হবে! ভাবতে ভাবতে চট্টগ্রাম শহরে দেওয়ানজী পুকুর পাড়ের বাসায় সন্ধ্যার দিকে ফিরলাম। তখনও সবগুলো টেলিভিশনে স্ক্রল যাচ্ছে। আমার বোধে আসছে না, এটা কেন, কীভাবে ঘটল! কারণ আমি তো দলকানা নই। কখনো দল করিনি। মুক্তিযুদ্ধ করি। দলকানারাই এসব পদে আসবে কিংবা তারাই এসব পদে আসার চেষ্টা চালাবে তাই স্বাভাবিক। চিরাচরিত এ সংস্কৃতি, নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে আমাকে যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর করার বিষয়টি আমার ধারণাই পাল্টে দিলো। তাই মানুষের মুহূর্মুহূ অভিবাদনের জবাবে বলেছি, চাঁদ উঠলে দেখা যাবে।

এরপর কেটে গেলো ৬ মাস। কিন্তু কোনো খবর নেই। এরমধ্যেই জানলাম, চট্টগ্রামের শীর্ষ এক আওয়ামী লীগ নেতা আইন মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে ৬টি ডিও লেটার পাঠিয়েছেন আমাকে এ পদে না রাখার জন্য। একটি ডিও লেটার পরে আমার হস্তগত হয়। সেখানে তিনি আমাকে চরম আওয়ামীবিদ্বেষী এবং হিযবুত তাহরিরের মামলা পরিচালনাকারী হিসেবে উল্লেখ করেন।

এরপর আমি ভেবেছি বিষয়টি বোধহয় বাদ পড়েছে। বাদ পড়লেও আমার আক্ষেপ ছিল না। কারণ আমার নিজ থেকে এ নিয়ে কোনো চাওয়া ছিল না। পরবর্তীতে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে আমি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থান করছিলাম। আমার স্ত্রীর কাছ থেকে নাম্বার নিয়ে জেনেভায় আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর জিয়াদ আল মামুন। বললেন, জেনেভা থেকে ফিরে জরুরি ভিত্তিতে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। জেনেভা থেকে ফিরে তাঁর সঙ্গে দেখা করি। জিয়াদ আল মামুন স্যার আমাকে নিয়ে যান তৎকালীন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের দপ্তরে। জীবনে এই প্রথম সচিবালয়ে আমার প্রবেশ। আইনমন্ত্রীর কক্ষে প্রবেশ করে দেখি সেখানে আগে থেকে বসে আছেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন। তাঁরা বললেন, এটা প্রধানন্ত্রীর চাওয়া। কালকের মধ্যেই আপনাকে যোগদান করতে হবে। এসময় আমার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের ওই নেতার পাঠানো ডিও লেটারের প্রসঙ্গ টানলেন আইনমন্ত্রী।

আমি বললাম, আমাকে কটা দিন সময় দিন। আমি একটু চট্টগ্রাম যাই, আমার পরিবার-পরিজনের সঙ্গে কথা বলি। তারপরই জয়েনিংয়ের বিষয়টা আসুক। এরপর সচিবালয় থেকে বেরিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাব ধরে হাঁটছিলাম। তখনই আমার ফোন বেজে উঠলো। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সাইফুজ্জামান শেখর বলছেন জানিয়ে বললেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান। আপনি কোথায় আছেন? বললাম জাতীয় প্রেসক্লাব। বঙ্গবন্ধুকন্যা ডেকেছেন, আমি ‘না’ করতে পারি না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কোথায় তা আমি জানি না। সঙ্কোচ করছে, তাই ফোনদাতাকে জিজ্ঞেসও করতে পারছিলাম না প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কোথায়। একপর্যায়ে তিনি নিজ থেকেই বললেন, একটি অটো রিক্সা নিয়ে তেজগাঁও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চলে আসুন। টেক্সিওয়ালাকে বললাম- ভাই, আমাকে তেজগাঁও প্রধানমন্ত্রীর অফিসে নিয়ে যান। তিনি আমাকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছে দিলেন। অটোরিক্সা থেকে নেমে গেইটে পরিচয় দিলাম, ফোনদাতার নাম বললাম। বুঝলাম আগে থেকে গেইটে বলা ছিল। তাই সাইফুজ্জামান শেখরের কক্ষে পৌঁছতে আমাকে বেগ পেতে হয়নি। তিনি সম্মানের সঙ্গে আমাকে রিসিভ করলেন। আমাকে বসিয়ে ভেতরে যান। মিনিট পাঁচেক পর এসে জানালেন প্রধানমন্ত্রী রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে মিটিং করছেন। আপনি একটু অপেক্ষা করুন।

অপেক্ষা করতে লাগলাম। ৩০ মিনিট পর প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে আমার ডাক পড়লো। প্রধানমন্ত্রী বললেন, আমিই আপনাকে চয়েস করেছি। আপনার উপর ভরসা রাখতে চাই। এরপর ১ জানুয়ারি যোগদান করার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের ওই নেতার ডিও লেটারের প্রসঙ্গে বলেন, ও কিছু না। আমি তা ছিড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছি। আপনি মন দিয়ে কাজ করুন। আমি আপনার পাশে আছি।

বললাম, আপা (প্রধানমন্ত্রী) আমি কি পারবো আপনার প্রত্যাশা পূরণ করতে? আমি তো দলকানা নই। তাছাড়া আমি একটি সংগঠন করি। আমার আচরণে, কথায় আপনি যদি বিব্রত হোন, তখন কী হবে! আপা বললেন, আমি জানি আপনার আচরণে আমাকে কখনো বিব্রত হতে হবে না।

এরপর প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে বিদায় নিয়ে ভাবছি ১ জানুয়ারির বাকি আরো দুইদিন। এ ফাঁকে চট্টগ্রাম গিয়ে আমার মা, স্ত্রী লক্ষীর সঙ্গে পরামর্শ করে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশিত সময়ে যোগদানে মনস্থির করি। কিন্তু তার আগেই টেলিভিশনগুলো আমি যোগদান করেছি মর্মে ব্রেকিং চালাতে লাগলো।

চট্টগ্রাম এসে দেখি লক্ষীর মেজাজ সপ্তমে। আমার সঙ্গে কথা বলছে না। তার অভিযোগ, আমি জয়েন করলাম, অথচ তাদের একটুও জানানোর প্রয়োজন মনে করলাম না। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, এটা মিডিয়ার বাড়াবাড়ি, আমি এখনো জয়েন করিনি। তোমাদের সঙ্গে পরামর্শ করে ১ জানুয়ারি জয়েন করার কথা ভেবেছি। কিন্তু না, কিছুতেই বোঝানো গেল না লক্ষীকে। একপর্যায়ে অভিমান করে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো সে। মাকে বললাম, মা, আমি এখন কী করি। লক্ষীতো ক্ষেপে আছে। তুমি কী বলো, আমি কি জয়েন করবো। মা সায় দিলেন, বললেন, হ্যাঁ, তুমি জয়েন করো। প্রধানমন্ত্রীর ডাকে দেশের দ্বিতীয় এই মুক্তিযুদ্ধে তুমি অংশ নেবে। মা অনেক সচেতন মহিলা। তাঁর আশীর্বাদ নিয়ে লক্ষী বাসায় ফেরার আগেই এক কাপড়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলাম। রাতের বাসে করে পরদিন সকালে ঢাকায় পৌঁছে আইনমন্ত্রণালয়ে যোগদান করলাম জাতির প্রত্যাশিত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কঠিন শপথ নিয়ে।

২০১১ সালের ১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর হিসেবে যোগ দেয়ার গল্পটি একুশে পত্রিকার কাছে এভাবেই বর্ণনা করলেন দেশবরেণ্য আইনজীবী রানাদাশ গুপ্ত। রোববার (২৭ মে) সুপ্রীম কোর্ট সংলগ্ন প্রসিকিউটর কার্যালয়ে একুশে পত্রিকার অনুরোধে এই গল্প শোনানোর সময় প্রবীণ এ আইনজীবী মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজ পরিচালনা করতে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন।

এসময় অ্যাডভোকেট রানাদাশ গুপ্ত বলেন, সঠিকভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজ পরিচালনা এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা আমাকে অভিভূত করেছে। আমি আওয়ামী লীগ করি না। আমার পেশা নিয়েই থাকি। অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করি, আওয়াজ তুলি। সঙ্গত কারণে ২০১০ সালে সিটি নির্বাচনে তার মনোনীত প্রার্থীর বিরোধিতা করেছি। এসব জেনেও প্রধানমন্ত্রী নিরপেক্ষ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে চট্টগ্রাম থেকে তুলে নিয়ে আমাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর বানিয়েছেন। দলমত ও দলীয় দৃষ্টিকোণের উর্দ্ধে উঠে জাতির প্রয়োজনে নিরপেক্ষ এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয় সেটা প্রধানমন্ত্রী আমার মতো একজনকে নিয়োগ দিয়ে আরেকবার বুঝিয়ে দিয়েছেন।

আমরা যখন দায়িত্ব নিই তখন আমাদের সামনে নুরেমবার্গ ট্রায়াল, টোকিও ট্রায়াল ছাড়া আর কিছু নেই। অপরদিকে, যুদ্ধাপরাধীরা আন্তর্জাতিক লবিস্ট নিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের রক্ষার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে। তাদের অর্থ, আন্তর্জাতিক শক্তির বিপরীতে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে আইনী লড়াইয়ের মাধ্যমে সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কাজটি অতটা সহজ ছিল না। এ জন্য রাতদিন একাকার কাজ করেছি। কাজ ডুবতে গিয়ে নাওয়া-খাওয়া ভুলে যেতাম। কতরাত না খেয়ে কাটিয়েছি তার হিসাব নেই। না ঘুমিয়ে সারারাত কাটিয়ে দিয়েছি এই চেম্বারে। রাত জেগে গবেষণা করেছি, তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে বের করে এনেছি মামলা পরিচালনার রসদ, উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ। যা পরবর্তীতে আমাদের মামলা পরিচালনা এবং জয়লাভে সহযোগিতা করেছে।

সহকর্মী তুরিন আফরোজের সাম্প্রতিক ঘটনায় কষ্ট পেয়েছেন এ আইনজীবী। তিনি বলেন, ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে তুরিন এমন কাজ করতে পারেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তিনি ফেঁসে যাবেন এবং এটা দেশদ্রোহিতার অপরাধ বলেও মন্তব্য করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এ প্রসিকিউটর।

একুশে/এটি

প্রিন্ট করুন