২০ অক্টোবর ২০১৮, ৫ কার্তিক ১৪২৫, শনিবার

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মত : মাদকের প্রবেশপথ বন্ধ না হলে সফলতা অসম্ভব

প্রকাশিতঃ শনিবার, জুন ২, ২০১৮, ৮:৫৮ অপরাহ্ণ

.আলম দিদার : প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে চলমান দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযানে এ পর্যন্ত ১২০ জনের অধিক মাদক ব্যবসায়ী কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলেও মাদকের বিস্তাররোধে এ অভিযান পুরোপুরি সফলতা বয়ে আনতে পারবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। অভিযানের মধ্যে প্রতিদিনই ইয়াবাসহ খুচরা মাদক ব্যবসায়ী আটক হচ্ছে আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে। এর মাধ্যমে দৃশ্যমান শুধু ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মাদক ব্যবসায়ী নিহত হলেই এ সমস্যার সমাধান হবে না। মাদকের বিশেষ করে ইয়াবার উৎস পথটাই বন্ধ করতে হবে। তাহলেই দেশ থেকে মাদক নির্মূল অনেকটাই সম্ভব হবে- অভিমত বিশেষজ্ঞদের।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, মাদক বিশেষ করে ইয়াবা পাচারের জন্য বৃহত্তর চট্টগ্রামকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মূলত ২০০৭ সালের দিকে কক্সবাজার টেকনাফ-উখিয়া এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের দশটি পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমার থেকে প্রবেশ ঘটে ইয়াবার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পরও নানাভাবে নানা কৌশলে এসব রুট দিয়ে মিয়ানমার থেকে প্রবেশ হচ্ছে ইয়াবার। আর সেটি সমুদ্র ও সড়ক পথে ভাগ হয়ে চট্টগ্রাম হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। মাদকের ভয়াবহতা থেকে সরকারের শীর্ষপর্যায়ের নির্দেশে দেশব্যাপী শুরু হয়েছে মাদকবিরোধী অভিযান। এ অভিযানে জনগণের কাছে প্রসংশিত হলেও কয়েকটি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তবে অবৈধ মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে র‍্যাব-পুলিশের অভিযানে কথিত বন্দুকযুদ্ধে শতাধিক নিহত ও সহাস্রাধিক গ্রেফতারের পরও অপরাধ দমনে স্থায়ীভাবে সেভাবে প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করছেন অপরাধ বিজ্ঞানীরা। মাদকের প্রবেশপথ বন্ধ না করে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘এনকাউন্টার’- ব্যবস্থায় সাময়িকভাবে লাভ হচ্ছে বলে মনে হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান আসবে না বলে মনে করছেন তারা।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বিবিসিকে বলেছেন, ‘নির্বাচনে আগে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একটা ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করার লক্ষ্য নিয়ে এই অভিযান চালাচ্ছে বলে আমার ধারণা। মাদকের সাথে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতির মতো অনেক অপরাধ জড়িত। অবাধে মাদকের ব্যবহার দেশব্যাপী এতটাই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যে এর প্রভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে সরকারকে সমালোচনায় পড়তে হচ্ছে। সেকারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকার নির্বাচনের আগে একটা ক্লিন ভাবমূর্তি তৈরির টার্গেট থেকে মাদকের বিরুদ্ধে এধরনের অভিযান চালাচ্ছে।’

তবে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকজন অপরাধ বিজ্ঞানী সুব্রত ব্যানার্জি বলেছেন, ‘এ ধরনের অভিযান সমাজের ক্ষুদ্র পর্যায়ে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে এবং সমাজের সেই অংশ সাময়িকভাবে সমর্থন করতে পারে। সমাজে যখন অপরাধ ব্যাপকহারে বেড়ে যায় এবং এর কোনো প্রতিকার হয় না। তখন সাধারণ মানুষ তাৎক্ষণিকভাবেই অপরাধীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত কোনো পদক্ষেপে খুশি হয়।’

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেছেন, ‘সরকার জঙ্গিবাদকে যেভাবে মোকাবেলা করেছিল, জাতিকে এবার মাদকমুক্ত করতেই সেরকম অভিযানে নেমেছে। গোপন তালিকা ধরে ধরেই তারা মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাচ্ছে। যারা ইতোমধ্যে মারা গেছে, তারা নিশ্চয় মাদক ব্যবসায়ী। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ও মাদকও পাওয়া গেছে অভিযানের সময় । তবে হ্যাঁ, দেশে থেকে মাদক নির্মূল করতে হলে মাদকের শেকড়ে যেতে হবে। আশা করি সরকার মাদক ব্যবসায়ীদের শেকড় উৎপাটনের পাশাপাশি সীমান্তে মাদকের প্রবেশও বন্ধ করবে। এদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।’

এদিকে সোমবার দুপুরে সিএমপিতে জব্দকৃত মাদকদ্রব্য ধ্বংস করতে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহার বলেছেন, ‘চরণ ঢাকব, না ধরণী ঢাকব। এখন যেখান থেকে উৎস, সেই উৎস মুখ যদি বন্ধ না হয়, তাহলে মাদককে নির্মূল করা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। কারণ ১০টি জায়গা দিয়ে হয়ত এই মাদকটি আসে। এটি ১০ হাজার বা ৫০ হাজার জায়গায় ছড়িয়ে যাচ্ছে। ৫০ হাজার জায়গায় ৫০ হাজার মানুষকে আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত দুরূহ। এ কারণে আমরা উৎস মুখটাকে যদি বন্ধ করতে পারি, তাহলে কিন্তু মাদককে নির্মূল করা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। ’

সিএমপি কমিশনার মাদক নির্মূলে সমাজের সব স্তরের মানুষের একযোগে কাজ করার উপর জোর দিয়ে বলেছেন, ‘সবাই যদি একাট্টা হয়ে চেষ্টা করি, তাহলে জাতিকে মাদকমুক্ত করা সম্ভব। আমরা কয়েকটি ধাপে কাজ করছি। মানুষকে সচেতন করে পাড়া-মহল্লায় মাদকবিরোধী কমিটি করা। স্থানীয়দের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে মাদক সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম নগরীতে ১৪৫ বা ১৪০ টি মাদকের স্পটের অধিকাংশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এগুলো যেন পুনরায় কেউ ব্যবহার করতে না পারে এবং আড্ডা হিসেবে ব্যবহৃত হতে না পারে সেজন্য পুলিশ সর্বোতভাবে চেষ্টা করবে। ’

বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পূর্বাঞ্চলের সাবেক জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন (অব.) শহীদুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযানে শুধু আটক আর বন্দুক যুদ্ধে নিহতের মধ্য দিয়েই সব সমস্যার সমাধান হবে না। আর সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দোষ দিয়েও লাভ নেই। দেশের ৭০২ নটিক্যাল মাইল সমুদ্রসীমা সীমিত জনবল দিয়ে পাহারা দিয়ে মাদক পাচাররোধ করা সম্ভব না। তাই মাদকের বিস্তাররোধে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ আর মাদকসেবীর সংখ্যা কমানো ও তাদের মাদকবিমুখ করা। তাহলেই মাদক ব্যবসা কমে যাবে, মাদক নির্মূল হবে।’

পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অব.) নুরুল আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মাদকমুক্ত দেশ গঠনে সরকারের পদক্ষেপটি ইতিবাচক। তবে ব্যবসায়ীদের যেভাবে আটক করা হচ্ছে, বা তাদের ধরতে গেলে বন্ধুকযুদ্ধের মুখোমুখী হয়ে শতাধিক মারা যাওয়ার পর নিশ্চয় তাদের সেই আস্তানা গুটিয়ে গেছে। কিন্তু মাদক একেবারেই নির্মূল করতে হলে প্রয়োজন মাদকের প্রবেশ বা উৎসমুখটা বন্ধ করা। সেখানেই মূল ফোকাসটা দিতে হবে। যাতে করে সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ করতে না পারে। তাহলে আশা করি শতভাগ না হলেও নব্বই ভাগ মাদকমুক্ত দেশ গঠন সম্ভব হবে।’

পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ড. এস এম মনিরুজ্জামান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মাদকবিরোধী চলমান অভিযানে পুলিশের জিরো টলারেন্স। বিশেষ করে মাদকের উৎস পথ বন্ধে আমাদের বিশেষ নজরদারি রয়েছে। আমরা গোয়েন্দা কার্যক্রমের মাধ্যমে মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্তদের শেকড়ে যাবার চেষ্টায় আছি। ইতোমধ্যে অনেককে আমাদের নাগালে এনেছি, অনেকে বন্ধুকযুদ্ধে মারাও গেছে। তবে মাদকের উৎসমুখ বন্ধে সীমান্তু এলাকার থানাগুলোতে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া আছে। কোনোওভাবেই সীমান্ত এলাকা দিয়ে মাদক প্রবেশ করে যাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার হতে না পারে সেদিকে আমরা জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছি।’

একুশে/এডি

প্রিন্ট করুন