১৮ অক্টোবর ২০১৮, ২ কার্তিক ১৪২৫, বুধবার

শিক্ষক মাইদুলকে নিয়ে অস্বস্তিতে চবি’র হলুদ দল!

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৬, ২০১৮, ১০:২৮ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক মাইদুল ইসলামের ফেসবুকে দেওয়া পোস্ট নিয়ে তোলপাড় চলছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনে উস্কানি ও পৃথক দুটি পোস্টে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। মাইদুল আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন হলুদ দলের সদস্য হওয়ায় সবচেয়ে বেশী অস্বস্তিতে পড়েছে তারা!

এ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে চলছে স্মারকলিপি প্রদান, বিক্ষোভ মিছিল ও মানবন্ধন কর্মসূচি। পাশাপাশি এক ছাত্রলীগ নেতা শিক্ষক মাইদুলের বিরুদ্ধে দায়ের করেছে আইসিটি আইনে মামলা। আবার ফেসবুকে ওই শিক্ষককে সমর্থন জানিয়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয় লন্ডভন্ড করার উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ ওঠায় সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক আলী আর রাজীর বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন অনেকেই।

শিক্ষক মাইদুল ইসলাম ও আলী আর রাজী বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য গঠন করেছেন তদন্ত কমিটি। এদিকে আওয়ামীলীগ সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক কিভাবে প্রধানমন্ত্রীকে কটুক্তি করতে পারেন- সে প্রশ্নই রেখেছেন অনেকে। আবার এ প্রশ্নও উঠেছে, মাইদুল ইসলামকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার নেপথ্যে ছিল কে?

জানা গেছে, ২০১২ সালে যোগ্যতা শিথিল করে শিক্ষক নিয়োগ দিতে একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ বিজ্ঞপ্তির আওতায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যায়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগ পান মাইদুল ইসলাম। অভিযোগ আছে, তৎকালীন সময়ে ওই বিভাগের একজন সাবেক সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী সিনিয়র শিক্ষকের ‘তদবিরে’ নিয়োগ হয় এ শিক্ষকের।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ওই সিনিয়র শিক্ষক জানিয়েছিলেন, মাইদুল ইসলাম আওয়ামীলীগের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক এবং বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ লালনকারী একজন ব্যক্তি। অভিযোগ আছে, ওই শিক্ষকের এমন ‘সনদের’ ভিত্তিতে মাইদুলের চেয়ে বেশি যোগ্যতা সম্পন্ন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে নিয়োগ না দিয়ে মাইদুল ইসলামকেই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয় প্রশাসন! কিন্তু মাইদুলের ব্যাপারে দেয়া ওই সিনিয়র শিক্ষকের ‘সনদ’টি পাঁচ বছরের মাথায় প্রমাণিত হল ভুয়া! সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সরাসরি আওয়ামীলীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ ও কটুক্তি করে একাধিক পোস্ট দিয়েছেন মাইদুল ইসলাম।

শুধু তাই নয়; ওই সময় স্নাতকে ৩ দশমিক ৬০, স্নাতকোত্তরে ৩ দশমিক ৭১ পয়েন্ট থাকার পরও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক এবং মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আরিফ উদ্দিন খান বাবুকে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। অথচ স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের ৩ দশমিক ৬৩ পয়েন্ট অর্জনকারী মাইদুল ইসলামকে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী শিক্ষকরা আক্ষেপ করে জানান, বেশি পয়েন্ট থাকার পরও ছাত্রলীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে ওই সময়ে নিয়োগ না দিয়ে কম পয়েন্টধারী যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সে আজ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে কটুক্তি করেছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মশিবুর রহমান বলেন, প্রগতিশীল কোন ব্যক্তি যদি মাইদুলের মতো ব্যক্তিকে শিক্ষক হিসেবে নেওয়ার জন্য সুপারিশ করেন তাহলে ব্যাপারটি দুঃখজনক। কারণ এতে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামীলীগ বিতর্কিত হয়। বিভিন্ন মন্ত্রী, এমপি, আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের তদবিরের প্রেক্ষিতে যেসব নিয়োগ দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে যদি এমন কোনো ব্যক্তি নিয়োগ পেয়ে থাকেন তাহলে তা আমাদের জন্য কলংকজনক৷ আমরা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে কটূক্তিকারী ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি করায় মাইদুল ইসলামের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য ইফতেখার উদ্দিন আয়াজ আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ‘মাইদুল ইসলাম তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে ‘হাসি না!’ লিখে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। অপর একটি পোস্টে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে তিনি লিখেন, ‘অতঃপর তোমরা আম্মাজানের কোন কোন নেয়ামতকে অস্বীকার করতে পারো….’।

এ বিষয়ে মামলার বাদী চবি ছাত্রলীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য ইফতেখার উদ্দিন আয়াজ একুশে পত্রিকাকে বলেন, আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সমাজতত্ত্ব বিভাগে মাইদুল ইসলামের নিয়োগ হয়। ওই বিভাগের সাবেক এক সভাপতি তার অনুগত জামায়াত-শিবিরের এজেন্ট মাইদুল ইসলামকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে প্রগতিশীল হিসেবে উপস্থাপন করে নিয়োগ দিতে প্রভাব বিস্তার করেন বলে আমরা জেনেছি।

‘এ সময় তিনি শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডের পদাধিকার বলে সদস্য ছিলেন। মাইদুলকে দেওয়া ওই শিক্ষকের প্রগতিশীলতার সনদটি আজ ভুয়া বলেই প্রমাণিত হল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিদ্রুপ করে শিক্ষক মাইদুলের এই অপকর্ম ও ঔদ্ধত্যের দায় সমাজতত্ত্ব বিভাগের ওই সাবেক সভাপতি কিভাবে এড়াবেন? আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন হলুদ দলের উচিত এদের দল থেকে বহিস্কার করা।’

তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র সংগঠন ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে আমি বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কটুক্তির বিচার চেয়ে মাইদুল স্যারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছি।

এ বিষয়ে শিক্ষক মাইদুল ইসলামের বক্তব্য জানতে চবি’র ডায়েরীতে উল্লেখ থাকা মোবাইল নম্বরে দুইদিন ধরে কল দিলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন হলুদ দলের আহবায়ক প্রফেসর ড. সুলতান আহমদ চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে মাইদুল ইসলামের কটূক্তি করার বিষয়টি আমরা জানি। এটি খুবই দুঃখজনক। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আমাদের সাথে আলোচনা করেছেন। আমাদের পরামর্শে তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত শেষে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।

প্রিন্ট করুন