২০ অক্টোবর ২০১৮, ৫ কার্তিক ১৪২৫, শনিবার

আহমদ ছফা হারিয়ে গেলে আমরা হারবো : মাহবুবুল আলম খোকা

প্রকাশিতঃ রবিবার, জুলাই ২৯, ২০১৮, ২:৪৬ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : ‘আহমদ ছফা কখনো হারিয়ে যেতে পারেন না। তিনি হারিয়ে গেলে আমরা হারবো। কাজেই আমাদের স্বার্থে আহমদ ছফার সৃষ্টিকর্ম বাঁচিয়ে রাখতে হবে, সংরক্ষণ করতে হবে তাঁর স্মৃতি।’

শনিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের চন্দনাইশ পৌরসভা অডিটরিয়ামে শুদ্ধ বানানচর্চা (শুবাচ) আয়োজিত বাংলা সাহিত্যের কীর্তিমান পুরুষ আহমদ ছফার ১৮ তম প্রয়াণ দিবসের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় পৌর মেয়র মাহবুবুল আলম খোকা এই অভিমত ব্যক্ত করেন।

শুদ্ধ বানানচর্চার সাধারণ সম্পাদক শিক্ষক-লেখক নুরুল আলমের সঞ্চালনায় এবং সংগঠনের সভাপতি, লেখক-ছড়াকার শাহজাহান আজাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সম্মানীয় অতিথির বক্তব্য দেন একুশে পত্রিকা সম্পাদক আজাদ তালুকদার।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রাক্তন কমিশনার, নারী নেত্রী অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু, বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক একরাম হোসেন, লেখক-গবেষক এম ওসমান গণি, পিপিএস পরিচালক নুরুল হক চৌধুরী, হুলাইন ছালেহ নূর কলেজের অধ্যাপক তৈয়বুর রহমান, গবেষক সোহেল মো. ফখরুদ্দিন, স. ম জিয়াউর রহমান, বেলাল হোসেন মিঠু, অধ্যক্ষ ইউনুছ কুতুবী।

বক্তব্য রাখেন রতন দাশগুপ্ত, সিরাজুল ইসলাম, একেএম ইউসুফ, তানভীর সিদ্দিকী, জসিম উদ্দিন, আহমদুর রহমান, বাদশা মিয়া, জাকের হোসেন, মহিউদ্দিন ইছা, আমিনুল ইসলাম প্রমুখ।

পৌর মেয়র মাহবুবুল আলম খোকা বলেন, আহমদ ছফার স্মরণসভা ‘শুদ্ধ বানানচর্চা’ আয়োজনের কথা ছিল না। এটি একটি ব্যতিক্রমী সংগঠন। দায়িত্ববোধ থেকে তারা এটি করেছে। আমি তাদেরকে সাধুবাদ জানানোর পাশাপাশি আমাদেরকেই ধিক্কার, নিন্দা জানাই। আমরা কেন পারি না আহমদ ছফার জন্য একটি স্মরণসভার আয়োজন করতে, আমরা কেন পারি না তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে কাজ করতে। হাজী দানেশের নামে, বেগম রোকেয়ার নামে বিশ্ববিদ্যালয় হয়, অনেকের নামে ছাত্রাবাস হয়, অডিটরিয়াম হয়। কিন্তু সাহিত্যের ‘বাতিঘর’ আহমদ ছফার নামে একটি ছাত্রাবাস হয় না, নেয়া হয় না স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ। এ লজ্জা, দীনতা আমাদেরই। বলেন একসময়ের তুখোর ছাত্রনেতা মাহবুবুল আলম খোকা।

এসময় সাহিত্যিক আহমদ ছফার সঙ্গে নিজের নানা স্মৃতি তুলে ধরেন মাহবুবুল আলম খোকা; বলেন আহমদ ছফার সঙ্গে আমার অজস্র স্মৃতি, ভালোবাসার সাতকাহন। কোনটা রেখে কোনটা বলি, কোন ভালোবাসার গল্প বলি।

আমি তখন চন্দনাইশ থানা ছাত্রলীগের সভাপতি। ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট রাতে যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ মনির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। পরদিন চট্টগ্রাম জেলা ছাত্রলীগ, যুবলীগের কমিটি ঘোষণার কথা ছিল। রাত ১১টা পর্যন্ত তাঁর বাসায় গল্প করে হোটেলে ফিরে যাই। ভোর হতেই শুনি বঙ্গবন্ধু আর নেই। স্বপরিবারে তাকে হত্যা করা হয়েছে। কাঁপতে কাঁপতে হাজির হই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসে আহমদ ছফার কক্ষে। ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আহমদ ছফা ছাড়া তখন ঢাকায় আমাদের আর কেউ ছিলেন না। কাকডাকা ভোরে আমাদের আগমনে বিচলিত হন ছফা ভাই।

বললাম, বঙ্গবন্ধু আর নেই। তাকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। বলো কী? এটা হতেই পারে না। আত্মমর্যাদা আর অস্তিত্বের ঋণে ৮ কোটি মানুষকে জড়িয়ে রাখা মানুষটিকে কেউ মারতে পারে না-বলেই কর্নেল তাহের, হাসানুল হক ইনু, সিরাজুল আলম খানসহ পরিচিত বেশ কয়েকজনকে ফোন করেন ছফা ভাই। কেউ ফোন ধরেন, কেউ ধরেন না। নিশ্চিত হলেন সত্যি সত্যি বঙ্গবন্ধুকে ”নাই” করে দিয়েছে বিপথগামি হায়েনার দল। এরপর কিছু সময়ের জন্য পাথর হয়ে গেলেন ছফা ভাই। তারপর নিরবতা ভাঙলেন; বললেন বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা তোমাদের ঠিক হবে না। বাড়ি ফিরে যাও। চলো তোমাদের গাড়িতে উঠিয়ে দিই। বলেই ছফা ভাই নিজেই স্টেশনে এসে আমাদের জন্য টিকেট কাটলেন, গাড়িতে উঠিয়ে দিলেন।

বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতে আহমদ ছফা অনেকগুলো স্মৃতিতে জড়িয়েছিলেন। ‘৬৯ এ কক্সবাজারে নির্বাচনী প্রস্তুতির সভা শেষ করে ফেরার পথে আহমদ ছফা যে স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ করেছিলেন সেই নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র হাই স্কুলে গিয়েছিলেন। আমার মতো কিশোরদের সঙ্গে আড্ডায় মাতেন প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে বসে। কষ্ট হয় সেই স্কুলটিতেও যখন আহমদ ছফার স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয় না। তিনি বলেন, চন্দনাইশে হাজার হাজার একর সরকারি খাস জমি, যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উপযোগী চমৎকার পরিবেশ বিরাজমান। আজকের স্মরণসভায় দাঁড়িয়ে আবেদন জানাতে চাই, চন্দনাইশে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হোক, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ হতে পারে আহমদ ছফা বিশ্ববিদ্যালয়।

এসময় মেয়র স্কুলজীবনে চন্দনাইশের যে সড়ক দিয়ে আহমদ ছফা যাতায়াত করতেন সে সড়কটি তাঁর নামে নামকরণের ঘোষণা দেন। একইভাবে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে ‘আহমদ ছফা ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠাসহ তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে গবেষণা ও অধ্যয়নের দ্বার উন্মোচন করা হবে বলে জানান পৌর মেয়র। তিনি বলেন, কদিন আগে আহমদ ছফার বাড়িটা আমি দেখতে গিয়েছিলাম। বাড়িটার জীর্ণদশা আমাকে কষ্টে নিমজ্জিত করেছিল। এটিকে সংরক্ষণ করে আহমদ ছফা স্মৃতি যাদুঘর করার উদ্যোগ নিলে আমিও সেই উদ্যোগের সারথী হবো। আহমদ ছফার অপ্রকাশিত সৃষ্টিকর্মগুলোর পাণ্ডুলিপি খুঁজে বের করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা হবে বলেও জানান তিনি।

একুশে পত্রিকা সম্পাদক আজাদ তালুকদার বলেন, জীবদ্দশায় আহমদ ছফা ছিলেন বৈষয়িক হিসাব-নিকাশ, লাভ-অলাভের উর্ধ্বে। বঙ্গবন্ধু তাঁকে রাষ্ট্রদূত হবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আহমদ ছফা সেই প্রস্তাব বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি সবসময় সম্মাননা, স্বীকৃতি এবং পুরস্কারের বিরুদ্ধে ছিলেন। সে কারণে ১৯৭৫ সালে তিনি লেখক শিবির সাহিত্য পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। ফিরিয়ে দেন বাংলা একাডেমির সাদত আলী আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার। জীবদ্দশায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি একুশে পদকটিও নিতে অস্বীকৃতি জানান, যেটি রাষ্ট্র তাঁকে দিতে পেরেছিল তাঁর মৃত্যুর পর।

তিনি কখনো অনুকম্পা কিংবা কারো করুণা প্রত্যাশী ছিলেন না। আজকের অনুষ্ঠানে তাঁর নামে চন্দনাইশে সড়ক কিংবা সেতুর নামকরণের যে আকুতি ঝরে পড়ছে তাতে করে আহমদ ছফার আত্মা কষ্ট পাচ্ছে বলে আমার মনে হয়। কারণ শুধু চন্দনাইশ নয়, ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলজুড়ে ছড়িয়ে আছে আহমদ ছফার অমর সৃষ্টি। তাই জাতীয়ভাবেই আহমদ ছফার স্মৃতি রক্ষার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু বলেন, আহমদ ছফা কেবল চন্দনাইশের সন্তান নন, তিনি পুরো বাংলাদেশের সন্তান। জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ। সব অনবদ্য, অমর সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে তিনি আমাদের মাঝে আজীবন বেঁচে থাকবেন। জীবদ্দশায় তিনি কারো আনুকূল্য দয়া-দাক্ষিণ্য গ্রহণ করেননি। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাব তিনি সানন্দে ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন আমাকে ধারণ করার ক্ষমতা আপনার সরকার এবং প্রশাসনের নেই। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর দেয়া কম্বল ঠিকই তিনি মৃত্যু পর্যন্ত জড়িয়ে ছিলেন। কোনো কাপড় তিনি বেশিদিন পরতেন না। অথচ শীত চলে যাওয়ার পর লন্ড্রি থেকে সেই কম্বল ওয়াশ করে এনে তালাবদ্ধ করে রাখতেন। এখানেই আহমদ ছফা ব্যতিক্রম। বঙ্গবন্ধুর আনুকূল্য তিনি নেননি, কিন্তু তাঁর মমতা জড়ানো কম্বল ঠিকই নিয়েছেনে এবং তা সযত্নে সংরক্ষণ করেছেন মৃত্যু অবধি।

একুশে/এসআর/এটি

প্রিন্ট করুন