২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫, মঙ্গলবার

দুবাইয়ের গাড়ি ব্যবসায়ী এখন চট্টগ্রামে আঁখ-বিক্রেতা!

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৮, ১০:১২ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : দুবাইয়ে গাড়ি-ব্যবসা করে একসময় কোটি টাকা গুণেছেন যিনি, তিনি এখন আঁখ-বিক্রেতা। ভ্যানগাড়ি করে চট্টগ্রাম নগরের এখানে-ওখানে আঁখ ফেরি করেন। ধারালো কাঁচি দিয়ে আঁখ ছাটেন; তারপর টুকরো করে একেকটা ১০ টাকায় বিক্রি করেন। কাঁচি আর টুকরো আঁখের মাঝেই আবর্তিত তার একসময়ের বিলাসী পরিবারের জীবিকা, সন্তানদের পড়াশোনা।

জীবনের উত্থান-পতনের নির্মমতার শিকার মানুষটির নাম মোহাম্মদ আলী। বাড়ি সাতকানিয়ার চরতি ইউনিয়নে। ভাগ্যান্বষণে ১৯৮৯ সালে সৌদি আরবের জেদ্দায় পাড়ি জমান মোহাম্মদ আলী। তপ্ত মরুর বুকে শরীর অঙ্গার করে ভাগ্য ফেরাতে চেয়েছিলেন। সমস্ত চেষ্টা যেন পেটে-ভাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। অপরিবর্তিত, জং ধরা ১০ বছরের প্রবাস জীবন ফেলে একসময় ফিরে আসেন দেশে।

সময়টা ২০০০। এবার ভাগ্য ফেরাতে পাড়ি দেন আরব আমিরাতের শারজায়। কিছুদিন এদিক-সেদিক ঘুরে পুরোনো গাড়ি বেচাকেনার সঙ্গে যুক্ত হন। প্রতিদিন পর্যটকদের পদভারে গম গম করে শারজা আবু সাকারা বিচ এলাকা। সেখানেই পর্যটকরা পুরোনো গাড়ি এনে বিক্রি করে দিতেন। সেই গাড়ি কিনে তাতে প্রলেপ লাগিয়ে মোহাম্মদ আলী অন্যত্র বিক্রি করতেন। ৪-৫ হাজার দিরহামে কেনা গাড়িতে আরো ৫শ’-১ হাজার দিরহামের ঘষামাজা। তারপর ১০-১২ হাজার দিরহামে বিক্রি। একগাড়িতেই দ্বিগুণ লাভ! অল্পদিনেই লাখ টাকা নয়, লাখ দিরহামের হিসাব কষতে লাগলেন আলী।

এক আরব্য তরুণের আগ্রহে আলী এবার যুক্ত হলেন যৌথ গাড়ি-ব্যবসায়। পুরোনো গাড়ি ছেড়ে নামলেন গাড়ি ইমপোর্টে। কেবল নিজেরই বিনিয়োগ বাংলাদেশের এক কোটি টাকার উপরে। জাপান, জার্মান থেকে আমদানি হতে থাকলো গাড়ি। সবমিলিয়ে বাড়-বাড়ন্ত অবস্থা। কে পায় আলীকে। ব্যবসার প্রয়োজনে আলী ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশ-দেশান্তর। জার্মান, জাপান, চীন, কোরিয়া বাদ যায়নি এমনতর উন্নত দেশগুলো।

বিধিবাম! আলীর এই উচ্চতা, বাড়বাড়ন্ত মুহূর্তেই মাটির সঙ্গে মিলিয়ে যায়। শোরুমের মিশরী ম্যানেজার জার্মানে গাড়ি-ব্যবসার লেনদেন করতে গিয়ে মোটা অংকের টাকা নিয়ে লাপাত্তা। অনেক খোঁজাখুজি করেও তাকে আর পাওয়া গেলো না। লাঠে উঠলো ব্যবসা। ২২ হাজার দিরহাম খেলাপী ঋণের জন্য গ্রেফতার হলেন আলী। জেল খাটলেন ৬ মাস। তারপর চারবছর আগে শূন্য হাতে বাড়িফেরা।

অল্পদিনে কোটিপতির খাতায় নাম লেখাতে চেয়েছিলেন আলী। টাকায় টাকা আনতে চেয়েছিলেন। ফলে দুবাইয়ে উপার্জিত টাকা দুবাইয়েই ঢাললেন। সন্তানদের বিলাসী জীবনদান এবং সাতকানিয়ার চরতিতে একতলা একটি পাকাদালান ছাড়া আর কিছু করতে পারেননি। অবশ্য শুরুর দিকে ৩ কানি ধানী জমি কিনেছিলেন। সেটিই বেঁচে থাকার অবলম্বন হলো ধপাস করে আকাশ থেকে মাটিতে পড়া আলীর। জমিতে ধানচাষ, ক্ষেতখামার করে সংসার ঠিকমতো চলে না।

স্ত্রী দিলরুবা, তিন ছেলে এক মেয়ে নিয়ে সংসার। মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বাকি তিন সন্তানই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া। তারা সবাই মেধাবী। কিন্তু অর্থাভাবে তাদের পড়ালেখা বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছিল। মূলত তাদের পড়ালেখা চালিয়ে নিতেই কাঁচি আর কঞ্চি আঁখের জীবন বেছে নিলেন আলী। চাষাবাদের কারণে তিনমাস থাকেন গ্রামে। বছরের বাকি সময় শহরে থাকেন পরিবারের সঙ্গে। নগরের চাক্তাইয়ে বাসা। ভাড়া ৭ হাজার। তিনসন্তানের পড়ালেখার খরচ মাসে ১০ হাজার টাকার বেশি। বড় ছেলে জাবেদ উদ্দিন চুয়েটে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষবর্ষের ছাত্র। মেজ ছেলে বিএ পাস করে চট্টগ্রাম আইন কলেজে ভর্তি হয়েছে। ছোট ছেলে মেট্রিকের শিক্ষার্থী। তাদের জোগান দিতেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আঁখ বিক্রি করেন ঘাম ঝরিয়ে।

কদিন আগে সন্ধ্যায় নগরের থিয়েটার ইনস্টিটিউটের সামনে মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল আঁখ খেতে খেতে। বললেন-জীবনে সব হারিয়েছি। একসময় টাকা ছুটেছে আমার পেছনে। আর এখন আমিই ১০ টাকার পেছনে ঘুরছি, ছুটছি আমার জন্য নয়, সন্তানদের জন্য, তাদের ‘মানুষ’ করার জন্য। সন্তানরা চুয়েটে পড়ছে, আইন কলেজে পড়ছে- এটাই এখন সর্বস্ব হারানো আলীর বেঁচে থাকার স্বাদ, আনন্দ!

একুশে/এটি