১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, সোমবার

পেছনে ফেলে আসি

প্রকাশিতঃ শনিবার, অক্টোবর ৬, ২০১৮, ১১:১২ পূর্বাহ্ণ

মো: আবদুল মান্নান : দেশবরেণ্য কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন ‘পিছনে ফেলে আসি’ শিরোনামে শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের কীর্তিমান মানুষদের নিয়ে নানা অম্লমধুর স্মৃতিচারণমূলক লেখা লিখছেন। ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এর সৌজন্যে আমরা তা উপভোগ করছি। সত্যিই বড় লেখকদের যে কোনো লেখাই সুখপাঠ্য এবং তথ্যবহুল। ইমদাদুল হক মিলন হলে তো কথাই নেই।

২. আশি’র দশকের শেষের দিকে একই শিরোনামে নিকট অতীতের বর্ণাঢ্য নানা বিষয়োল্লেখপূর্বক ‘বিচিন্তা’য় ধারাবাহিক লেখা প্রকাশ করতেন প্রয়াত সাংবাদিক ও ‘বিচিন্তা’ সম্পাদক মিনার মাহমুদ।

মিনার মাহমুদ আমাদের বন্ধুতুল্য সহপাঠী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০১২ সালের ৩০ মার্চ তার আকস্মিক প্রয়াণে ব্যথিত হয়ে বিদীর্ণ হৃদয়ে তাকে নিয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনে আমার লেখা ‘এ কী করলেন মিনার মাহমুদ’ প্রকাশিত হয়েছিল। মিনার মাহমুদের গা থেকে তখনো ক্যাম্পাসের গন্ধ যায়নি। ফলে তার বেশকটি ‘এপিসোড’ ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক ছাত্রনেতাদের প্রসঙ্গে।

৩. বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে এমন শিরোনাম ব্যবহারে অন্যতম পথিকৃত মিনার মাহমুদকে নিয়েই ছাত্রজীবনের একটি গল্প বলা যাক। অবশ্য জীবদ্দশায় বা ছাত্রজীবনেই মিনার বহুবার নানা কারণে আলোচিত হয়েছিলেন। আশি’র দশকের শুরুতে মিনার মাহমুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন। লেখাপড়ার চেয়ে শিল্প-সাহিত্যচর্চা, লেখালেখি, সাংবাদিকতায় তিনি বেশি আগ্রহী ছিলেন।

ছাত্রজীবনেই জনপ্রিয় ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’র বড় মাপের একজন প্রতিবেদক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন তিনি। বিশেষ করে সে সময় বিচিত্রায় প্রকাশিত তার ‘রাজনীতিতে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব’ প্রচ্ছদ প্রতিবেদনটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল। তবে প্রতিক্রিয়ার এক পর্যায়ে তাকে মহসীন হল ছাড়তে হয়েছিল।

৪. হলে মিনারের রুমমেট ছিলেন একজন অতি সাদামাটা, নিরীহ, গোবেচারা ধরনের সাহিত্যের ছাত্র। মিনারের সাথে তার দেখাসাক্ষাৎ খুব বেশি হতো না বললেই চলে। কারণ, মিনার বিলম্বে ঘুম থেকে উঠতেন। অন্যদিকে রুমমেট যথাসময়ে উঠে ক্যাম্পাসে চলে যেতেন। দুপুরের পর ফিরে এসে দেখেন মিনার বেরিয়ে গেছেন। আবার সবাই ঘুমিয়ে পড়লে মিনার মধ্যরাতে হাতে একটি বাটারবন ও কলা নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করতেন।

রুমমেট কখনো বিরক্ত হলেও কিছু বলার সাহস নেই। মিনারকে বহুবার এমন রুটি কলা হাতে আমাদের কক্ষে আসতেও দেখেছি। আমার রুমমেট ছিল তার ক্লাসমেট। তার কাছ থেকে টিউটোরিয়াল ক্লাস এবং পরীক্ষার সময়সূচি জানতে আসতেন।

৫. এক পর্যায়ে রুমমেটের সাথে তার বেশ সখ্যতা গড়ে উঠলো। গল্পে গল্পে মিনার জানতে পারেন তার রুমমেট ধানমন্ডির এক বিত্তবান ব্যবসায়ীর মেয়েকে পড়ান। মেয়েটিকে তার বেশ পছন্দ হয়েছে। মেয়েটিও তাকে পছন্দ করে।

সমস্যা হলো মেয়েটিকে সে সরাসরি প্রস্তাব দিতে পারছে না। কিন্তু তার আচার-আচরণ খুব পজেটিভ। রুমমেট সরল বিশ্বাসে তাকে সবকিছু শেয়ার করলো। মিনার বললেন, ‘কোনো অসুবিধা নেই, আমাকে একবার নিয়ে যান, আমি সব ব্যবস্থা করে দিব।’

৬. যথারীতি রুমমেট একদিন প্রোগ্রাম করে মিনারকে নিয়ে ঐ বাড়িতে হাজির। ড্রয়িংরুমে চুপচাপ বসে আছেন দু’জন। খবর দেয়া হলো স্যার পড়াতে এসেছেন। খানিক পরে ভেতর থেকে মেয়েটি জানালো, আজ সে অসুস্থ, পড়বে না। হতাশ এবং লজ্জিত হয়ে দু’জনই ফিরে আসেন।

এ ঘটনায় রুমমেট মিনারের কাছে খুব ছোট হয়ে যান। মিনার খেয়াল করলেন, রুমমেটকে আজকাল ভীষণ ম্রিয়মান এবং বিষণ্ন দেখাচ্ছে। তিনি রুমমেটকে সাহস ও প্রেরণা দিচ্ছেন। দেখা হলেই বলছেন, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে, মন খারাপ রাখতে নেই।’

৭. কিছুদিন পর মিনার মাহমুদ-এর একটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক পূর্বাণীতে। গল্পের নাম ‘স্বপ্নের সমুদ্রযাত্রা’। বিষয় তার হাউস টিউটর রুমমেটের অসম প্রেম। গল্পে রুমমেটের নাম-ধাম পরিবর্তন করে কাহিনীটি হুবহু রাখা হয়। ক’দিন বাদে কীভাবে যেন রুমমেট জেনে যায় এ গল্প তাকে নিয়েই লেখা। রুমমেট মিনারের ওপর সংক্ষুদ্ধ হন। এমন কি হলের বড়ভাই, নেতাদের কাছে এ বিষয়ে নালিশও করেন তিনি। কিন্তু সমস্যা হলো, অভিযুক্ত লেখককে পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ মিনার মাহমুদতো মধ্যরাতের অশ্বারোহী। অভিযোগ শুনানীর সময় পাওয়াই কঠিন।

যাক, কিছুদিন পর তাকে আকস্মিকভাবে পেয়ে অভিযোগের বিষয়টি জানানো হলো। রুমমেটকে হেয় প্রতিপন্ন করা ঠিক হয়নি ইত্যাদি, ইত্যাদি। একই সাথে সিদ্ধান্ত হলো, মিনার মাহমুদকে আরেকটি গল্প লিখে তার রুমমেটের নিষ্পাপ ভালবাসাকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরতে হবে।

সত্য হলো, মিনার মাহমুদরা যুগে যুগে সমকালীনদের স্মৃতিতেই বেঁচে থাকেন।

লেখক : চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার