১৮ অক্টোবর ২০১৮, ২ কার্তিক ১৪২৫, বুধবার

বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘এটেন্ডেন্স’ জটিলতা, দায় কার?

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, অক্টোবর ৯, ২০১৮, ৮:১৬ অপরাহ্ণ

মাসুদ ফরহান অভি : পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কিছু কিছু বিভাগে উপস্থিতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মারাত্মক নির্যাতন করা হয়। এ নির্যাতনকাণ্ডে নির্যাতকের ভূমিকায় থাকেন কিছু শিক্ষক। তাদের পাষণ্ডতার বলি হয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে হয়েছে সার্টিফিকেট ছাড়াই। অনেকে হয়েছেন মানসিক রোগী।

ওই শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের প্রচণ্ড ক্ষোভ কাজ করে। এ ক্ষোভ দীর্ঘস্থায়ী। অনেক সময় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে হয়েছে অসন্তোষ। ভাঙচুরও। কিছু শিক্ষকের এমন অমানবিক আচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্দর পরিবেশকে নষ্ট করে।

মূলত শিক্ষার্থীদের আটকে দেওয়ার আয়োজনটি আইন বাস্তবায়নের জন্য করা হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কর্মসূচি হিসেবেই এ আয়োজন করা হয়। অবাক করা বিষয় হল, একেক বিভাগে এ বিষয়টি নিয়ে শিক্ষকরা নিজেদের মতই আইন বানিয়েছেন। যে এখতিয়ার তাদের নেই।

বিভাগগুলোর কিছু শিক্ষক ১০০ নম্বরের কোর্সের বিপরীতে ক্লাস নেন ৫-১০টি। আবার কোনো কোনো শিক্ষক ৬০-৭০টি। অনেক শিক্ষকের সারা বছর খবর থাকেনা। পরীক্ষার আগে এসে কয়েকদিন ধরে টানা ক্লাস নিয়ে দায় সারেন।

পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীরা কি সার্বিক প্রস্তুতি নেবেন নাকি ওই শিক্ষকের দায় মেটানোর ক্লাসে এসে বসে থাকবেন? হাজিরার হিসেবে তার ৫টি ক্লাসের সমান অন্য শিক্ষকের ৬০টি ক্লাসের মতই! যদি ৬০টি ক্লাস নেওয়া শিক্ষক হাজিরা তালিকা জমা দেন, ৫টি ক্লাস নেওয়া শিক্ষক জমা না দেন – সে ক্ষেত্রে বিপদ শিক্ষার্থীদের।

৭-৮টি কোর্সের মধ্যে যে শিক্ষক সবচেয়ে কম ক্লাস নিয়েছেন, তিনি যদি হাজিরা তালিকা জমা দেন, যারা বেশি ক্লাস নিয়েছেন তারা যদি জমা না দেন তাহলেও বিপদ শিক্ষার্থীদের। বছর শেষে গড় হাজিরায় ঠকে যায় শিক্ষার্থীরা। অনেক শিক্ষক আবার ক্লাসে মাঝে মাঝে হাজিরা গ্রহণ করেন, মাঝে মাঝে করেন না।

কোনো বিভাগে কোনো শিক্ষার্থীর ৪০ শতাংশ উপস্থিতি থাকলে ‘বিভাগের মুখে’ ৫ হাজার টাকা গুঁজে দিলেই তার সারা বছর ক্লাস না করার অপরাধ মাফ! আবার কোন কোন বিভাগে এ অপরাধের মাশুল গুনতে হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। ওই শিক্ষকদের ‘মানসিক অত্যাচার’ নীতির তারতম্য ভেদে এ টাকার অংকের তারতম্য ঘটে।

অনৈতিকভাবে আদায় করা টাকাগুলোর কোন রশিদ থাকেনা শিক্ষার্থীর হাতে। ‘গোপন’ একাউন্টে টাকা দিয়ে জমা রশিদ বিভাগে জমা দিলেই বিভাগীয় সভাপতি পরীক্ষার ফরমে স্বাক্ষর করেন।

তবে শিক্ষার্থীদেরও দায় থেকে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থী কেবলই শিক্ষার্থী। সে কিভাবে জীবিকা নির্বাহ করবে তা শিক্ষকদের দেখায় বিষয় নয়। শিক্ষার্থীদের ক্লাসে শতভাগ উপস্থিতি প্রত্যাশিত, যৌক্তিক।

কারণ বাংলাদেশে ১৯৭৩ এর অধ্যাদেশ বলে প্রতিষ্ঠিত চারটি বিশ্ববিদ্যালয় শতভাগ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শতভাগ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় করা হয়েছে। কারণ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তের সন্তানরাই এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

প্রশ্ন হল, অধ্যাদেশ অনুযায়ী এসব বিশ্ববিদ্যালয় কি শিক্ষার্থীদের শতভাগ আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে পেরেছে? এই প্রশ্নের উত্তর যদি ‘না’ হয় তাহলে শিক্ষার্থীরা বাসস্থান নিশ্চিতের তাগিদে শতভাগ ক্লাসমুখো হওয়ার সুযোগ নেই। জীবিকার সন্ধানে টিউশন, চাকরির দ্বারস্থ হওয়া বাস্তবতা!

১৯৭৩ এর অধ্যাদেশ বলে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ম অনুযায়ী, সকল কোর্সে গড়ে ৬০ শতাংশের কম উপস্থিতি হলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের অনুমতি লাগবে। সেক্ষেত্রে তিনিই একমাত্র কর্তা যিনি জরিমানা করতে পারেন।

এক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত নন-কলেজিয়েট ধরা হয়। পরীক্ষা ফরম পূরণের টাকার সঙ্গে ৬০০ টাকা জরিমানা যোগ করে তারা পরীক্ষা দিতে পারেন। ৬০ শতাংশের কম হলে সমাধান করবেন উপাচার্য। একপ্রকার উপাচার্যের ক্ষমতাটি শিক্ষকরা নিজেদের মত প্রয়োগ করেন।

এমনও হয়েছে, বিভাগের চেয়ারম্যানকে ‘দুঃখে ফেলতে’ কোন কোন শিক্ষকের আঁকা ছঁকের ভাঁজে ফেলে আটকে দেওয়া হয় বেশকিছু শিক্ষার্থীকে। যাতে তারা চেয়ারম্যানের উপর চড়াও হয়। কিছু কিছু শিক্ষক ‘টাকা মারার’ নীতি হিসেবে বেশ কিছু শিক্ষার্থীকে কৌশলে ৬০ শতাংশের কম হাজিরা ধরিয়ে দেন।

আবার চেয়ারম্যান তাঁর শত্রুপক্ষকে শিক্ষার্থীদের সাথে ‘লাগিয়ে’ দিতে ‘ফাঁদ’ ফেলেন। সে ফাঁদে শিক্ষার্থীদের আটকে দিয়ে হাসিল করেন নিজের ফায়দা। আবার শিক্ষকের বাসার মালিকের ছেলে যদি হয় বিভাগের শিক্ষার্থী। তাহলে তার জন্য বিশেষ কায়দায় দেওয়া হয়েছে অবিশ্বাস্য ছাড়!

বিভাগের একাডেমিক কমিটিতে এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে প্রণীত নানা রঙের নীতিমালার যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী। টিউশন, চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের উপর খড়গ হয়ে নেমে এসেছে শিক্ষকদের এই ‘এটেন্ডেন্স’ নীতিমালা!

প্রশ্ন জাগে, যে ‍বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের ক্লাস নেওয়ার কোন নীতিমালা মানা হয় না, সে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতির বিষয়ে এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে শত রকমের নীতিমালা প্রণয়ন করা কি হাস্যকর, অপ্রত্যাশিত, অগ্রহণযোগ্য নয়?

মজার ব্যাপার হল, নীতিমালাগুলো এমনভাবে শিক্ষকরা প্রণয়ন করেন যাতে তারা চাইলে ‘অনিয়ম, অনৈতিকপন্থা, টাকার বিনিময়ে’ পারও করে দিতে পারেন শিক্ষার্থীদের। শিক্ষক রাজনীতির জটিল সমীকরণের মারপ্যাঁচে পড়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য নীতিমালার কঠোর ধারাগুলো আরোপ করা হয়।

অমানবিক, জটিল প্রকৃতির শিক্ষার্থী অধিকারহরণকারী ওই শিক্ষকদের জানা উচিত, একটি বিভাগের প্রতিটি কোর্সের শিক্ষকের অন্যতম দায়িত্ব ওই কোর্সের শিক্ষার্থীদের হাজিরা যথাযথভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিভাগে জমা দেওয়া। যদি কোন শিক্ষক তা না করেন তাহলে তিনি ‘শিক্ষার্থী অধিকারহরণ’ করছেন। শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীর সাথে তিনি প্রতারণা করছেন। তিনি একজন ‘শিক্ষার্থী নির্যাতক’ হিসেবেই পরিচিত হয়েছেন বা হবেন। একই সাথে তাদের এ বিষয়টাও মনে রাখা উচিত, বিভাগের সভাপতি, পরীক্ষা কমিটির দায়িত্ব কোন ক্ষমতা নয়।

শিক্ষার্থীদের গলায় খড়গ ধরে যে টাকা বিভাগগুলো আদায় করছে সে টাকা কোনখাতে ব্যয় হয়? কোন নীতিমালার আওতায় এ টাকা ব্যয় হয়? এ টাকার অডিট করে কারা? এত বড় অনিয়ম ও দূর্নীতির বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কেন ব্যবস্থা নেয় না?

এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সাংবাদিকরাই এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করে আমাদের জানাতে পারেন।

লেখক: সাবেক সহ সভাপতি
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি

প্রিন্ট করুন