১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ২ পৌষ ১৪২৫, রবিবার

‘দেশবরেণ্য ক্রিকেটারের শাশুড়ির প্রশ্ন-কেন যুদ্ধাপরাধীর শাস্তি’

প্রকাশিতঃ শনিবার, অক্টোবর ২৭, ২০১৮, ১০:১৮ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : দেশে ‘মানুষের’ সংখ্যা কত?- চট্টগ্রাম নগরের সার্সন রোডের অক্সব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন নারী নেত্রী অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু।

প্রশ্ন শুনেই চুপ শিক্ষার্থীরা! উত্তর না পেয়ে এবার উপস্থিত অভিভাবকদের প্রতি একই প্রশ্ন রাখেন তিনি।

তখন উপস্থিত অভিভাবকদের কেউ বলেন ১৬ কোটি, আর কেউ জানান রোহিঙ্গাসহ ১৮ কোটি!

‘আপনারা কেউ ১৬, কেউ ১৮ কোটি বলেছেন, আমার কথা কি কেউ খেয়াল করেছেন? আমি প্রশ্ন করেছি, মানুষের সংখ্যা কত? লোকসংখ্যা নয়!’ মৃদু হেসে বলেন রেহানা বেগম রানু।

শনিবার সকালে অক্সব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে ‘বিতর্ক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে লোকসংখ্যা বেড়েই চলেছে। আর ‘মানুষের’ সংখ্যা এতো কমে গেছে… আমি মাঝে মধ্যে ভাবি, সাংসদ তো ৩০০ জন আছেন, আমরা মানুষ কি ৩০০ পাবো? কিংবা ২০০ মানুষ পাবো?’

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের শিক্ষা স্ট্যান্ডিং কমিটির প্রাক্তন চেয়ারম্যান রেহানা বেগম রানু বলেন, ‘কোন স্কুলে পড়েছ, কত ভালো ইংরেজি উচ্চারণ জানো, তুমি কি ইঞ্জিনিয়ার হলে নাকি ডাক্তার হলে- কিছুই কাজে আসবে না। যদি তুমি মা-বাবার চেয়েও দেশকে ভালো না বাসো। জাহানারা ইমামের ছেলে রুমী কোথায় গিয়েছিল? দেশকে ভালোবেসে, দেশের জন্য উৎসর্গ করেছে জাহানারা ইমাম তার সন্তানকে। আমরা তেমন মা-বাবা চাই বাংলাদেশে। তেমন মানুষ চাই, ১৮ কোটি লোকসংখ্যা চাই না। মানুষের সংখ্যা চাই। আমরা ক্লাসে প্রথম হতে পারি, মানুষ কি হতে পারি না?’

‘অক্সব্রিজ স্কুলের যিনি প্রিন্সিপাল, ওনাকে আমি খুব ছোট থেকেই চিনি, কিছুটা জানি। মানুষকে তো পুরো জানা যায় না। আমার দৃষ্টিতে যতটুকু জেনেছি একজন চমৎকার, অসাধারণ ভালো মানুষ। আমি বিশ্বাস করতে চাই অক্সব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে ‘মানুষ’ বের হবে, দুর্নীতিবাজ নয়, যারা বাংলাদেশকে কলঙ্কিত করবে। অক্সব্রিজ… মানুষের সংখ্যা বাড়াবে। লোকসংখ্যা বাড়াবে না।’ যোগ করেন রেহানা বেগম রানু।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ কেন হয়েছিল? বছরের পর বছর আমরা কঠিন এক কারাগারে ছিলাম। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি আমাদের ছিল না। মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছে। ৭ লক্ষ মা-বোনের সম্ভম লুন্ঠিত হয়েছে। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পরে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। এর চেয়ে বড় অর্জন কী হতে পারে?’

শিশুশিক্ষার্থীদের কাছে রেহানা বেগম রানু জানতে চান, তোমাদের বাবা-মা ও ভাই-বোনকে যদি গুলিতে হত্যা করা হয় কিংবা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয়, মা-বোনের সম্ভ্রম লুণ্ঠন করা হয়, তোমরা কি তাদের ছেড়ে দেবে?

উপস্থিত শিক্ষার্থীরা মাথা নেড়ে সবাই ‘না’ জবাব দেয়। তখন রেহানা বেগম রানু বলেন, তাহলে যুদ্ধাপরাধীর বিচার বাংলাদেশে কেন হবে না। একজন দেশবরেণ্য ক্রিকেটারের শাশুড়ি আমাকে বললেন, কেন যে বুড়ো বয়সে যুদ্ধাপরাধে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। আমি বললাম, আপা আপনার কাছে আমি এমন কথা আশা করি না। আপনার মুখে এ কথা শুনে আমি কষ্ট পেলাম। আপনার মেয়ের সম্ভ্রম কেউ লুণ্ঠন করে আপনি কি তাকে ছেড়ে দেবেন? আপনার স্বামীকে কেউ হত্যা করেছে, আপনি কি তাকে ছেড়ে দেবেন?

‘তখন তিনি মুখ কালো করে ফেললেন। মাথা নিচু হয়ে গেল। বললেন, আমি লজ্জা পেলাম। কঠিন প্রশ্ন করেছো। আমি বললাম, প্রত্যেকটা অন্যায়ের বিষয়ে নিজেকে দিয়ে ভাববেন আগে, অন্যকে দিয়ে নয়। বিবেকের দরজা-জানালা যদি আমরা বন্ধ করে দিই, বিবেকে যদি কড়া না নাড়ি, নিজের সাথে নিজে যদি কথা না বলি, এই পড়ালেখার কোনোই মূল্য থাকবে না।’

স্মৃতি হাতড়ে রেহানা বেগম রানু বলেন, এক সময় আমরা খেলাঘর করতাম। আমার সৌভাগ্য নাকি দুর্ভাগ্য জানি না নার্সারি, কেজি, কেজি ওয়ান এসব আমি পড়িনি। তৃতীয় শ্রেণী থেকে পড়াশোনা শুরু করেছি আমি। ছোট থেকে আমার ইচ্ছে ছিল ভালো আবৃত্তি করবো, ভালো উপস্থাপনা করবো, সংবাদ পাঠিকা হবো, অভিনয় করবো। এই বিষয়গুলো আমার মাথায় ছিল। সেই সময় থেকে বাংলা ভালোভাবে উচ্চারণের দিকে আমার আগ্রহ ছিল। কিন্তু পাশাপাশি ইংরেজিটা আমি ভালো পারি না। ভালো উচ্চারণ পারি না। সেটার জন্য অনেক জায়গায় ভর্তি হয়েছি। কিন্তু যখন রাজনীতি করি, কমিশনার নির্বাচিত হয়ে গেলাম তখন নির্বাচনের পর সঙ্কোচ লাগে, তখন আর উচ্চারণের ক্লাশগুলো আর করিনি।

অক্সব্রিজ স্কুলের ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের চমৎকার ইংরেজি উচ্চারণে মুগ্ধ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের তিনবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর রেহানা বেগম রানু বলেন, এবার বুঝ তোমরা কত সফল!

কখনও আবৃত্তি, কখনও দলীয় সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনার পাশাপাশি কথামালায় অনুষ্ঠান হয়ে উঠে বর্ণিল।

অক্সব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রিন্সিপাল রেহানা ইকবাল অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।