১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ২ পৌষ ১৪২৫, রবিবার

সন্ত্রাসী ভাইদের রক্ষায় ‘পেশকার’ ভাইয়ের যত ক্যারিশমা!

প্রকাশিতঃ বুধবার, নভেম্বর ৭, ২০১৮, ১২:২৭ অপরাহ্ণ

পেশকার আবুল কালাম আজাদ

চট্টগ্রাম : প্রায় ৩০ বছর আগে চট্টগ্রাম জজ আদালতে নিম্নমান সহকারী হিসেবে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন রাঙ্গুনিয়ার দক্ষিণ রাজানগরের মৃত নূর মোহাম্মদ সিকদারের ছেলে আবুল কালাম আজাদ। পরে পদোন্নতি পান। পদোন্নতি পেয়ে চট্টগ্রামের পঞ্চম সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী হন।

আবুল কালাম আজাদের আরেকটি পরিচয় আছে। তিনি রাঙ্গুনিয়ার আলমগীর বাহিনীর প্রধান আলমগীর, সন্ত্রাসে অভিযুক্ত আবদুস ছালাম ও জাহাঙ্গীরের বড় ভাই। এই তিন ভাইয়ের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া খুন, ডাকাতি, অস্ত্র, এসিড নিক্ষেপ, অপহরণসহ যাবতীয় মামলা দেখভাল করেন পেশকার আবুল কালাম আজাদ।

জানা যায়, তিন ভাই ও তাদের অনুসারিদের বিরুদ্ধে মামলা হলেই শুরু হয় আবুল কালামের ‘ক্যারিশমা’। প্রায় দুই ডজন মামলার আসামি ও একাধিক মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পরও আবুল কালাম আজাদের ক্যারিশমায় আলমগীর ও আবদুস ছালাম রয়েছেন কারামুক্ত। আইনের মারপ্যাঁচ অভিজ্ঞ ও আদালতের কর্মচারী হওয়ার সুবাদে আদালত সংশ্লিষ্টদের কাছে তদবির করা পেশকার আবুল কালাম আজাদের জন্য সহজ।

অভিযোগ রয়েছে, আদালতে কর্মরত থাকার সুবাদে তার তিন ভাই ও তাদের অনুসারীদের অনৈতিক সুবিধা দিয়ে আসছেন আজাদ। এরমধ্যে আছে- মামলার নথি থেকে ভুক্তভোগীরা সুবিধা পেতে পারে এমন গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সরিয়ে ফেলা, ফাইল গায়েব করা, মামলার ধার্য্য তারিখ বিলম্বিত করতে তদবির করা, তদন্তে প্রভাব বিস্তার করা, সাক্ষীদের প্রতি ইস্যু হওয়া সমন জারি না হওয়ার ব্যবস্থা করা, কারাগার এবং কোর্ট লকআপে সুবিধা পেতে ব্যবস্থা করা।

জানা যায়, ডাকাতির অভিযোগে পেশকার আজাদের ভাই আবদুস ছালামের বিরুদ্ধে ১৯৮৭ সালের নভেম্বর মাসে রাঙ্গুনিয়া থানায় দণ্ডবিধির ৩৯৫ ও ৩৯৭ ধারায় একটি মামলা হয়। যার মামলা নং ০৮(১১)৮৭। পরবর্তীতে ওই মামলা ১৯৯১ সালে ৩২ নম্বর মামলা হিসেবে চট্টগ্রামের দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে বিচার শুরু হয়। ১৯৯২ সালের ২৮ অক্টোবর মামলাটির বিচার নিষ্পত্তি হয়।

রায়ে ২২ বছর সাজা হয় আবদুস ছালামের। নিয়ম অনুযায়ী ওই আদালতের রুল বইয়ে মামলার রায়ের ফলাফল ও নথির সর্বশেষ অবস্থান লিপিবদ্ধ থাকার কথা। একইভাবে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের স্যুট রেজিস্ট্রারে রায়ের ফলাফলের নোট থাকার কথা। কিন্তু রহস্যজনক কারণে রায় ঘোষণার দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময় পার হলেও এখনো ‘রুল বই ও স্যুট রেজিস্ট্রারে’ মামলার ফলাফল নোট লেখা হয়নি। তবে রুল বইয়ে মামলাটির নথি ২০০০ সালের ১৮ মে ৩৬ নম্বর স্মারকে জেলা রেকর্ড রুমে প্রেরণ করা হয়েছে উল্লেখ থাকলেও গ্রহণ করার তথ্য নেই।

অভিযোগ আছে, সেই মামলার নথিপত্র গায়েব করে ফেলেন আবুল কালাম আজাদ। ফলে তার ভাই আবদুস ছালাম সাজাপ্রাপ্ত আসামি হয়েও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাঙ্গামাটির কাউখালি থানার ০৩(৮)৮৮ মামলায়ও আবদুল ছালামের সাজা হয়। সেটির নথিপত্রও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

১৯৯৫ সালের ১ আগস্ট সন্ত্রাসমূলক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের একটি মামলায় যাবজ্জীবন সাজা হয় আবুল কালামের ছোট ভাই আবদুস ছালামের। একই মামলায় তার অপর ভাই আলমগীরের সাজা হয় ১০ বছর। রায় ঘোষণার সময় তারা পলাতক ছিলেন। পরে তারা ওই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে ২০০১ সালে একটি রিট আবেদন করেন উচ্চ আদালতে; যার নম্বর ৬৯২৩।

পেশকার আবুল কালাম আজাদের পরামর্শ ও কূট-কৌশলে রিটটি করা হয়। ১৮ বছর ধরে এই রিটের রুল নিষ্পত্তি হচ্ছে না। বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ওই মামলায় শুরুতে ৬ মাসের স্থগিতাদেশ নেন আসামিরা। নিয়ম অনুযায়ী স্থগিতাদেশ বর্ধিত করার কথা। অথচ কোনো ধরনের বর্ধিত স্থগিতাদেশ ছাড়াই এই মামলা ১৮ বছর ধরে বিচারাধীন আছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পেশকারের ভাই আলমগীর ও আবদুস সালাম

জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধা সোবহান হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ছিলেন আইয়ুব ও শামসু। এই দুইজন আবদুল ছালামের নাম জড়িয়ে স্বীকারোক্তি দেন। কিন্তু আইয়ুব ও শামসুরের সাজা হলেও খালাস পেয়ে যান আবদুস ছালাম।

মুক্তিযোদ্ধা সোবহানের দুই সন্তান ছবুর ও কবিরকে এসিড নিক্ষেপ করার ঘটনায়ও আবদুস ছালাম ও তাদের অপর ভাই জাহাঙ্গীর জড়িত ছিলেন বলে আইয়ুব ও শামসুর স্বীকারোক্তিতে উঠে আসে। কিন্তু তারা দুইজনও খালাস পান।

লেখাপড়ার দৌড় বেশি না থাকলেও পেশকার আবুল কালাম আজাদের তিন ভাইয়ের কেউ হয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য, কেউ হয়েছেন স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি। আবদুস ছালাম এখন স্থানীয় ৩নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য। রাজাভুবন উচ্চ বিদ্যালয়, রাজাভুবন দেবাশীষ কিন্ডারগার্ডেন ও রাজারহাট বাজার কমিটির সভাপতিও তিনি। ছালামের স্ত্রী দায়িত্বপালন করছেন স্থানীয় ইউপির সংরক্ষিত নারী সদস্য হিসেবে।

অন্যদিকে আলমগীর এখন রাজাভুবন প্রাইমারী স্কুলের সভাপতি। এছাড়া রাজাভুবন দেবাশীষ কিন্ডারগার্ডেন ও রাজার হাট বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও নিয়েছেন তিনি।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পঞ্চম সিনিয়র সহকারি জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী আবুল কালাম আজাদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কারা অভিযোগ দিয়েছে? তাদের নাম বলেন? এরপর আপনার যা মনে চায় লিখেন। আমি মানহানির মামলা করব বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।

এরপর পঞ্চম সিনিয়র সহকারি জজে থাকার পরিচয় দিয়ে একুশে পত্রিকার প্রতিবেদককে ফোন করেন এক ব্যক্তি। প্রতিবেদকের নাম, পদবী, পত্রিকার নাম, পত্রিকার অফিসের ঠিকানাসহ একাধিক তথ্য জানার পর তিনি এবার ‘সন্দেশ’ নামের একটি অনলাইন পত্রিকার সাথে যুক্ত আছেন বলে জানান।

এরপর প্রতিবেদকের কাছে ওই ব্যক্তি জানতে চান, পেশকার আবুল কালাম আজাদকে কেন ফোন করা হয়েছিল? প্রতিবেদকের জবাবে আদালতের নথি গায়েব করার কোনো প্রকার সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।

পরে অনুসন্ধানে জানা গেছে, যে নম্বর ব্যবহার করে পঞ্চম সিনিয়র সহকারি জজের বেঞ্চে থাকার পরিচয়ে একুশে পত্রিকার প্রতিবেদককে ফোন করা হয়, সেটি ব্যবহার করেন পেশকার আবুল কালাম আজাদের ‘উমেদার’ মাসুদুর রহমান। পরবর্তীতে তাকে ফোন করা হলে তিনি পঞ্চম সিনিয়র সহকারি জজ আদালতের পেশকার আবুল কালাম আজাদের অধীনে কাজ করেন বলে জানান। পাশাপাশি আবুল কালাম আজাদের প্ররোচনায় একুশে পত্রিকার প্রতিবেদককে ফোন করেছেন বলে স্বীকার করলেও জজ পরিচয় দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন মাসুদুর রহমান। যদিও জজ পরিচয় দিয়ে তার ফোনালাপের অডিও রেকর্ড একুশে পত্রিকার কাছে সংরক্ষিত আছে।