১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ৪ পৌষ ১৪২৫, মঙ্গলবার

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গাফেলতি, স্নাতকে ফাঁকা থাকছে এক-তৃতীয়াংশ আসন

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, নভেম্বর ২০, ২০১৮, ১১:২০ পূর্বাহ্ণ

রাকীব হামিদ : নগরীর একটি সরকারি কলেজ থেকে ২০১৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিকে ৪.৮০ পেয়ে উত্তীর্ণ হয় মাহিয়াত মাইশা। শুরুতেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন ছিল তার। তাই সেই স্বপ্নপূরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিযুদ্ধে অংশও নিয়েছিল। কিন্তু মেধার প্রতিযোগিতায় চান্স পাওয়া হয়নি তার। শেষ ভরসা ছিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা চট্টগ্রাম নগরীর সরকারি কলেজগুলো। কিন্তু তিনবারের রিলিজ স্লিপেও কোনো সরকারি কলেজে ঠাঁই মিলেনি এই মেধাবী শিক্ষার্থীর।

যদিও নগরীর ঐতিহ্যবাহী সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের ভর্তি অফিস থেকে জানতে পারে মেধা তালিকায় পূর্বে ভর্তি হওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী ভর্তি বাতিল করে অন্যত্র চলে গেছে। এতে বেশ কিছু আসন ফাঁকা রয়েছে। তবে পুরো ভর্তিপ্রক্রিয়ার কাজটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে করে থাকলেও, আসন ফাঁকা থাকার বিষয়টি ওয়েবসাইটে আপডেট করা হয়নি।

এভাবেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মাইশার মতো হাজারো মেধাবী। এদের কারো ভাগ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ মিললেও অনেকের ক্ষেত্রে তাও সম্ভব হয় উঠে না। ফলে ১২ বছরের শিক্ষাজীবন শেষে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষা থেকে ঝরে পড়তে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন গাফেলতির পিছনে রয়েছে কেন্দ্রীয়করণ। সারাদেশে তাদের অধীনে থাকা কলেজগুলোর ভর্তিপ্রক্রিয়া গাজীপুর থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রথম মেধা তালিকায় যেসব শিক্ষার্থী ভর্তি হন তাদের অনেকেই পরবর্তীতে ভর্তি বাতিল করে অন্যত্র চলে যান। কলেজগুলো থেকে ভর্তি বাতিলের বিষয়টি অবহিত করা হলেও, কেন্দ্র থেকে ওয়েবসাইটে তা আপডেট করা হয় না।

এতে করে সেই ফাঁকা আসনগুলো ছাড়াই পরবর্তী রিলিজ স্লিপ দেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবিকভাবে সেই ফাঁকা আসনগুলো ফাঁকাই থেকে যায়। ফলে প্রতিবছর চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচটি সরকারি কলেজে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসন ফাঁকা পড়ে থাকে। একুশে পত্রিকার সঙ্গে আলাপকালে কলেজগুলোর অধ্যক্ষরাও সেটি স্বীকার করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরীতে সরকারি কলেজ রয়েছে মোট সাতটি। এতে অনার্সে ভর্তির জন্য ৬২টি বিষয় রয়েছে। এর বিপরীতে মোট আসন সংখ্যা ৪ হাজার ৭৩৮ টি। কলেজগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে প্রতিটি বিষয়ে গড়ে ১৫-২০টি আসন ফাঁকা ছিল। সে হিসেবে সাত কলেজে প্রায় ১২৪০টি আসন ফাঁকা ছিল। যা মোট আসনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট কলেজগুলো। এতে করে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক শিক্ষার্থী কলেজগুলোতে ভর্তি হতে পারেনি।

বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীদের ভর্তিবঞ্চিত হবার পেছনে পুরো দায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বলে মনে করছেন কলেজগুলোর শিক্ষকরা। তারা বলছেন, ফাঁকা থাকা আসনের বিষয়ে প্রতিদিনই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে জানানো হলেও তারা তাতে কর্ণপাত করে না। এতে ফাঁকা আসনগুলো বাদ রেখেই শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়।

সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক অঞ্জন কুমার নন্দী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ফাঁকা থাকা আসনের ব্যাপারে গত সপ্তাহে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাতেও জানিয়েছি। কিন্তু তারা সেটা আমলে নেয় না। প্রতি বছর এর ফলে অনেকগুলো আসন ফাঁকা থাকে। তবে এবার সেটা আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে।

সরকারী কমার্স কলেজের অধ্যক্ষ আইয়ুব ভূঁইয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, কমার্স কলেজে এটা খালি থাকে না। তবে একেবারেই যে থাকে না তাও না। কিন্তু কিছু কিছু কলেজে খালি থেকে যায়। এ বিষয়ে একাধিকবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে জানানোও হয়েছিল। তবে আমাদের কাছ থেকে শোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

তিনি বলেন, ভর্তি বাতিলের সঙ্গে সঙ্গেই কেন্দ্রে আমরা তা জানিয়ে দিই। তাদের বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তাদের ওয়েব সাইটে সবসময় ওপেন থাকে না। আমরাও সহজে এক্সেস করতে পারি না। ফলে চার-পাঁচদিন পরে আপডেট করে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিনেট সদস্য বলেন, এই সমস্যর মূল কারণ কেন্দ্রীয়করণ। দায়িত্বের বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে এটি সমাধান সম্ভব। সিনেট সভায় প্রস্তাব দিয়েছিলাম আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোতে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগ দিলে কাজে গতিশীলতা বাড়বে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, আসন ফাঁকা থাকার অভিযোগটি পুরোপুরি সত্য নয়। আগের চেয়ে এখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অনেক বেশি আপডেটেড। মেধাবী শিক্ষার্থীদের সুযোগ দিতেই আমরা আসন খালি থাকা পর্যন্ত রিলিজ স্লিপ দিয়ে থাকি।

একুশে/আরএইচ/এটি