১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, বৃহস্পতিবার

থাকুন অনন্তকালের সূর্য হয়ে, আকাশের তারা হয়ে

প্রকাশিতঃ সোমবার, ডিসেম্বর ৩, ২০১৮, ৩:১০ অপরাহ্ণ

ওমর ফারুক হিমেল : এত বড় দুঃসংবাদের জন্য কোনোভাবেই প্রস্তুত ছিলাম না। প্রথমে আমার ইমোতে হাসান ভাই ম্যাসেজ দিয়ে জানালেন, হিমেল ভাই মামা আর নেই। সাংহাইতে মারা গেছেন। এরপরে ম্যাসেঞ্জারে সিপ্লাস টিভির সিইও আলমগীর অপু ভাইয়ের ম্যাসেজ দেখলাম- হিমেল তুমি কি জান মোরশদ ভাই চলে গেলো। এরপর অনেকে ম্যাসেজ দিয়ে জানালেন, মোরশেদ ভাই আর নেই।

তিনি আমার কাছে মোরশেদ মামা। মোরশেদ মামা আর নেই, শোনার পর অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না। এমন মানবিক, অমায়িক, প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বাসপূর্ণ, সতেজ, সজীব, সুদর্শন, পরিপাটি একজন মানুষের সঙ্গে মৃত্যুর দুইদিন আগেও সিউলে প্রাণবন্ত আড্ডা দিয়েছি। তিনি প্রাণখুলে কথা বলেছেন, হেসেছেন। গল্প করলেন বাংলাদেশের রাজনীতি, চট্টগ্রামের সংবাদপত্র, নগর আওয়ামী লীগের খুঁটিনাটি বিষয়ে।

সেই প্রাণবন্ত আড্ডার অংশী হয়েছিলেন সিউলস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর (বাণিজ্য উইং) মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী। মোরশেদ মামা এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যাবেন বলে প্রাণ খুলে হেসেছেন কিনা জানি না।

মামাকে বললাম- চট্টগ্রামের আওয়ামী রাজনীতি, মেয়র নাছির ভাইয়ের কর্মকাণ্ড এসব নিয়ে কিছু বলুন। এরপরই মামা খুললেন কথার ঝাঁপি। বললেন, অভিজ্ঞ রাজনীতিক নগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীর কথা, নগর পিতা আ জ ম নাছিরের উন্নয়নের নানা বর্ণময় গল্প, প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির সারল্যপনার গল্প।

ভবিষৎবাণী করে বললেন, ড. হাছান মাহমুদ মন্ত্রী হবেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উনাকে এবার দারুণ মূল্যায়ন করবেন। কারণ, হাছান ভাই রাজপথের লড়াকু সৈনিক। সেই আড্ডায় উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন চট্টগ্রামের পাঠকনন্দিত একুশে পত্রিকার সম্পাদক আজাদ তালুকদারের।

সিউলের তুর্কি রেস্টুরেন্টে আড্ডাশেষে, সিউলের ব্রান্ডিং নেসকেফ কফি হাউজে কফির চুমুকে চুমুকেই টানা তিনঘণ্টা আড্ডা হলো। আড্ডার কোলাহল ছেড়ে, হাসান ভাইয়ের বাসায় খাওয়া-দাওয়া হলো।

মোরশেদ মামাকে বললাম, রবিবার ক্লাস আছে আমি সকালে চলে যাবো, আপনি রাতে হাসান ভাইকে নিয়ে আমার বাসায় আসবেন, একসাথে ডিনার করব। আমার দিকে তাকিয়ে একফালি হাসি দিয়ে বললেন, মামা এবার নয়। এবার সংক্ষিপ্ত সফর, মঙ্গলবার চলে যাবো। রোবার-সোমবার কোরিয়ান কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে ব্যস্ত থাকব। পরে আসলে অবশ্যই যাবো। কোরিয়ায় তোমরা মেজবানের আয়োজন করো, চট্রগ্রাম থেকে রাজনীতিক ও সাংবাদিকদের বহর নিয়ে আসব। সেই সময় তোমার বাসায় যাব। সামনে নির্বাচন- সময় নেই, দলকে সময় দিতে হবে। আমি বললাম মামা, কথা দিয়েছেন আবার আসলে যাবেন। ঠিক আছে এই কথাই রইলো। বাংলাদেশ থেকে লম্বা সফর করে আসায় চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট ছিল মোরশেদ মামার।

 

মৃত্যুর কদিন আগে সিউলে মোরশেদ মামার সঙ্গে শেষ আড্ডা

মামাকে বললাম, সকালে আমি ক্লাসে চলে যাব, আপনি ঘুমান, আপনার ঘুমে ডিস্টার্ব করবো না। পরে মামা ব্যাগ খুলে আমাকে একুশে পত্রিকার প্রিন্ট ভার্সন কপিগুলো দিলেন, বললেন কপিগুলো সময় করে রাষ্ট্রদূত আবিদা ম্যাডামকে দিও। এরপর সবাই ঘুমিয়ে গেলাম, সকালে যথারীতি চলে আসলাম। রবিবার রাতে ইমোতে কথা বললাম, সোমবারেও কথা হলো। মোরশেদ মামার মঙ্গলবার ১টায় ফিরতি ফ্লাইট ইনছন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে। ফোন করে মামার সাথে কুশলাদি সেরে নিলাম।

চীনের উদ্দেশে রওনা দেয়ার জন্য তখন তিনি চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইনস উঠলেন, জানালেন দশমিনিট পর প্লেন উড়াল দেবে। দোয়া চাইলাম দিল খুলে, ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে বললাম। মোরশেদ মামা বললেন, সিউলে তোমাদের আতিথ্য ভুলব না মামা। ভালো থেকো আবার আল্লাহ চাইলে দেখা হবে!

কিন্তু কখনো ভাবিনি এই দেখা শেষ দেখা, এই বিদায় শেষ বিদায়। কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে চিরদিনের জন্য নাই হয়ে গেলেন আমার প্রিয় মোরশেদ মামা।

সদা বিনয়ী, হাস্যোজ্জ্বল মোরশেদ মামার মৃত্যুসংবাদ যখন লিখছি বারবার হাসিমাখা মুখখানিই মনে পড়ছে। আহা! কী পরিপাটি, কী সতেজ, কী কর্মঠ মানুষ ছিলেন। ঝিনুক নীরবে সহে, ঝিনুক নীরবে সহে যাই, হাসিতে মুক্তা ফলায়, এই লিখাটির প্রতিটি বাক্য একেকটি শব্দ আমাকে বিদ্ধ করছিল ভীষণ। হৃদয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তিন দিন আগেও যার সাথে কথা বলেছি, সেই প্রাণবন্ত মানুষটি নেই। তার মৃত্যু সংবাদও লিখছি আমি। খুব স্বল্পসময়ের জন্য কাছে পাওয়া সময়টুক থাকুক স্মৃতির ফ্রেমে।

মোরশেদ মামা থাকুক অনন্তকালের সূর্য হয়ে, আকাশের তারা হয়ে। সত্যিই পৃথিবীতে লোকসংখ্যা অনেক, কিন্তু মানুষের সংখ্যা খুবই কম। সেই ছোট্ট তালিকার আপনি শীর্ষ মানুষ। স্টিভ জবস বলেছিলেন, স্রষ্টার অসাধারণ উদ্ভাবন হচ্ছে মৃত্যু। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলি সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।

লেখক : একুশে পত্রিকা প্রতিনিধি, দক্ষিণ কোরিয়া