১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, বৃহস্পতিবার

আ জ ম নাছির ও বাবার রাজনীতির সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই : নওফেল (ভিডিও)

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ৬, ২০১৮, ২:০২ অপরাহ্ণ

রাকীব হামিদ : জন্ম, বেড়ে উঠা দুটোই রাজনৈতিক পরিবারে। বিলেতে ব্যারিস্টারি পড়ে দেশে ফিরে যুক্ত হয়েছিলেন আইনপেশায়। কিন্তু রাজনীতির নির্যাস যার চিন্তা ও মননে, শিরা-উপশিরায়, রাজনীতিতে তার না আসা বড্ড বেমানান। কারণ তিনি যে চট্টলবীর প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সন্তান! তাই তো বাবার ইচ্ছা ও নিজের ভালোবাসা থেকেই লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে স্নাতক পাস করেও হেঁটেছেন রাজনীতির বন্ধুর পথে। বলছিলাম ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল-এর কথা।

তার পিতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর হৃদয়ে গাঁথা রাজনীতির মর্মকথা। রাজনীতিই ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। নেশার মতো হয়ে উঠা এই রাজনীতিকেই করেছেন পেশা। নিজ পরিবারেও দিয়েছিলেন সেই দীক্ষা। দুই যুগেরও বেশি সময় ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদে। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক দুই পদেই ছিল বিচরণ। পিতার অবর্তমানে সেই হাল ধরে রাখার চেষ্টা করছেন নওফেল।

সেই যাত্রা শুরুর সময়টা খুব বেশি দিন আগের নয়। ২০১০ সালে বাবার মেয়র পদে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়ার মধ্য দিয়েই শুরু হয় তার সেই পথচলা। বাবার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সুবাধে সেই পথচলা তার জন্য অনেকটাই সুগম হয়। তাই ২০১৬ সালে পিতার রাজনৈতিক ত্যাগ-তিতিক্ষার স্বীকৃতিস্বরূপ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পান নওফেল। এর আগে তিনি ২০১৪ সালে ৭১ সদস্যের নগর কমিটির নির্বাহী সদস্য হন।

উত্তরাধিকার সূত্রে কেন্দ্রে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেলেও, নিজের জাত চিনিয়েছেন ব্যারিস্টার নওফেল। ৩৩ বছর বয়সে সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েই সাংগঠনিক দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নেত্রীর নির্দেশে দলের প্রার্থীকে জয়ের নেপথ্যে বড় ভূমিকা রাখেন। একইভাবে ভূমিকা রেখেছেন ঢাকা বিভাগে দলের সাংগঠনিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে। কেবল সাংগঠনিক কাজের গণ্ডিতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। টেলিভিশন টক-শোতে অনলবর্ষী, যুক্তিতে মহারাজ তিনি।

পাদপ্রদীপের আলোয় আসা তারুণ্যদীপ্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এই কেন্দ্রীয় নেতা আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী। চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী) আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচনী এলাকায় বর্তমানে ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যারিস্টার নওফেল। নেতাকর্মীদের সঙ্গে উঠোন-বৈঠকের পাশাপাশি অংশ নিচ্ছেন নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে। তবে নিজেই ঘোষণা দিয়ে প্রার্থী হতে চাননি তিনি। নেত্রীর সার্ভে রিপোর্ট ও দলের রাজনৈতিক কৌশলের কারণেই প্রার্থী হয়েছেন।

ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের সঙ্গে কথা বলছেন একুশে প্রতিবেদক

বুধবার দুপুরে চশমা হিলের বাসভবনে একুশে পত্রিকার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। জানান, ‘নিজ থেকে ঘোষণা দিয়ে পদ চাওয়া কখনো সাংগঠনিক শৃঙ্খলার প্রকাশ হতে পারে না। আমি দলের সাংগঠনিক সম্পাদক, আমি নিজেই যদি ঘোষণা দিয়ে দেই আমাকে মনোনয়ন দিতে হবে। তাহলে আমার একজন কর্মী তো মনোনয়নের ক্ষেত্রে সমতল ভূমি পাবে না।’

চট্টগ্রামের রাজনীতিতে তার বাবা মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রচ্ছন্ন প্রভাব এখনো বিদ্যামান। রয়েছে তার নিজ হাতে গড়া বিশাল কর্মীবাহিনী। এসব পুঁজি করে প্রথমবারের মতো অংশ নিয়ে নির্বাচনের বৈতরণী কীভাবে পার করবেন-এ প্রসঙ্গে নওফেল জানান, ‘আমার বাবার একটি বিশাল ঐতিহ্য আছে। তার রেখে যাওয়া সহযোদ্ধারা আমাদের জন্য বিশাল রাজনৈতিক পাওয়া। আমি তার সন্তান বলে আমার জন্য কাজ করবেন অন্যদের জন্য করবেন না বিষয়টি তা নয়। তারা সকল আসনে নৌকা মার্কার প্রার্থীর জন্য কাজ করবেন। একইসঙ্গে আমি তার ছেলে এটা মুখ্য বিষয় নয়। মুখ্য বিষয় হলো-আমরা কাজ করেছি, দেখাতে পেরেছি ও শেখ হাসিনার ওপর মানুষের আস্থা আছে। আমাদেরও আত্মবিশ্বাস আছে শেখ হাসিনার সরকার যে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নিয়েছে-এর যতগুলো দৃশ্যমান হয়েছে, মানুষ এসব দেখেই আমাদের ওপর আস্থা রাখছে।’

আওয়ামী লীগের তরুণ যে ক’জন নেতা আছেন তার মধ্যে নওফেল অন্যতম। এমনকি চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে একমাত্র তরুণ ও নবীন প্রার্থী তিনি। তাই তার নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার অভিনবত্ব ও কলা-কৌশলে সবার আগ্রহ রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে আধুনিক ও সনাতনের মিশেলে এগুতে চান তিনি।

কারণ হিসেবে বললেন, মানুষের সঙ্গে মানুষের যে সম্পর্ক, সেটা কখনো একশ’ভাগ ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে সম্ভব হয় না। রিয়েলিটির মাধ্যমেই বাস্তবে রূপ দিতে হয়। শুধু ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছাবো আর রিয়েলিটিতে আমি মানুষের সংস্পর্শের বাইরে থাকবো, সেটা জনগণ পছন্দ করে না। তরুণদের কাছে পৌঁছানোর জন্য ফেসবুকে-অনলাইন এক ধরনের প্রচারণা। তবে নির্বাচনের সময় সকলে চায় যিনি প্রার্থী হবেন তিনি সকলের কাছে যাবেন। এই চাওয়াটা কিন্তু সনাতন ও চিরন্তন। উন্নত রাষ্ট্রেও এটির চর্চা হয়ে থাকে। এমনকি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণের টানে জনসভায় ছুটে যান। তারপরেও প্রচার-প্রচারণার জন্যে পরিকল্পিতভাবে দল থেকে বিশেষ প্রকাশনা, অডিও, ভিডিও ভিত্তিক ডিজিটাল কন্টেট রাখা হয়েছে। সেগুলোই প্রচার করবেন বলে জানিয়েছেন ব্যারিস্টার নওফেল।

শুধু ভালোবাসা দিয়ে ভোট হয় না, পাশাপাশি কাজও থাকতে হয় বলে বিশ্বাস করেন চট্টলবীরের উত্তরসুরী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। বাবার মতো জনগণের সেবা করার মানসেই জাতীয় নির্বাচন করছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার বাবা তাঁর দীর্ঘ রাজনীতির ইতিহাসে প্রমাণ করে গেছেন, তিনি অসৎ উপায়ে জীবনযাপন করেননি। মানুষকে সেবা করতে চেয়েছেন। তাঁর সন্তান হিসেবে আমারও সেই বিশ্বাসটা আছে, রাজনৈতিক ক্ষমতা পেলে অসৎ হয়ে নিজের অবস্থানকে ব্যবহার করে, আয় উন্নতি বৃদ্ধি করার মনোবৃত্তি থাকবে না। এই আস্থাটা মানুষের মধ্যে আছে।’

‘আমাদের বাসায় সকল স্তরের মানুষের আনাগোনা আছে। এই বিষয়টা আমাদের রাজনৈতিক ঐতিহ্য। এটি ধরে রাখার চেষ্টা করছি। সব মানুষের জন্য আমাদের দুয়ার খোলা-এসব আমলে নিয়েই মানুষ সিদ্ধান্ত নিবে নৌকা মার্কার পক্ষে। সেই আত্মবিশ্বাস থেকে আমরা বলেছি নগরীর সকল আসন আমরা নেত্রীকে উপহার দিতে পারবো।’-যোগ করেন নওফেল।

চট্টগ্রামের সিটি মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিনের সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব ছিল নওফেলের। মৃত্যুর আগে তার বাবা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সাথেও নাছিরের বিরোধ ছিল ওপেন সিক্রেট। জীবদ্দশায় মহিউদ্দিন চৌধুরী নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। অন্যদিকে সেই সময় থেকে এখনো নগরে দলের সাধারণ সম্পাদক আছেন আ জ ম নাছির। তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র দূরত্ব কমিয়ে এক হয়েছেন নওফেল-নাছির।

এই বিষয়ে নওফেল বলেন, ‘আমার বাবার রাজনীতি ও আ জ ম নাছির উদ্দীনের রাজনীতির সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক বিষয়ে অনেক মতবিরোধ থাকতে পারে। এটা আওয়ামী রাজনীতির সৌন্দর্য, গণতন্ত্র।

রাজনীতিতে মতদ্বৈততা থাকতে পারে, এটা স্বাভাবিক। তবে দলের বৃহত্তর স্বার্থে, অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে সমস্ত নেতাকর্মী এক, একাট্টা। সভাপতি-সেক্রেটারির নেতৃত্বে নগর আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ। কারণ, তারা সবাই শেখ হাসিনার কর্মী।

আমার বাবা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী সৃষ্টি করেছেন। এসব নেতাকর্মীরা যারাই আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক থাকবেন তাদের সঙ্গে কাজ করবে।- বলেন নওফেল।

একুশে/আরএইচ/এটি

ছবি আকমাল হোসেন