১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, মঙ্গলবার

দুদক একা কী করবে

প্রকাশিতঃ রবিবার, ডিসেম্বর ৯, ২০১৮, ১:০৯ পূর্বাহ্ণ


মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী :দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একা কী করবে? যেখানে উইন-উইন প্রেক্ষাপট তৈরী করে দুর্নীতি ঘটছে, সে সব দুর্নীতির তথ্য দুদকের কাছে আসে না। বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি, নাগরিকদের একটি অংশ অন্যায় ও অনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য দুর্নীতির ছিদ্রপথ তৈরি করছে। ট্রেড লাইসেন্স, কারখানার ছাড়পত্র, পরিবেশ ছাড়পত্র, ভূমি রেজিস্ট্রেশন, ভূমি নামজারি, যানবাহনের ফিটনেস, ভবনের অনুমতিপত্র, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ, ব্যাংক-লোন ইত্যাদি নানা সেক্টরে আইন ভেঙে অন্যায় সুবিধা লাভের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় আমরা ডুবে আছি।

আমরা কয়জন পুরোপুরি ট্রেড লাইসেন্স ফি দিতে চাই? কতজন ভূমি ও ভবন মালিক পৌরকর বা হোল্ডিং ট্যাক্স ন্যায্যভাবে দিতে চাই? কয়জন গ্রাহক যথার্থভাবে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস বিল দিতে চাই? কয়জন ব্যবসায়ী সঠিক মুনাফা প্রকাশ করে প্রকৃত আয়কর দিতে চাই? কয়জন উদ্যোক্তা মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে সঠিক মর্টগেজের ভিত্তিতে ব্যাংক-লোন গ্রহণ করছি? দায়িত্বপালনকালে আমরা সেবাপ্রার্থী মানুষের প্রতি কতটুকু আন্তরিকতা প্রদর্শন করছি? কতজন রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নৈতিকতা মেনে চলছি? কেন আমরা সরকারি নিয়ম-নীতির প্রতিপালনের পথ এড়িয়ে দালালদের হাতে টাকা দিয়ে সিরিয়াল ভেঙে সরকারি সেবা নিতে দ্বিধাবোধ করছি না? কেন আমরা ঝামেলা এড়ানোর জন্য কালোবাজার থেকে ট্রেনের টিকিট নিতে দ্বিধাবোধ করছি না? এভাবে অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির ক্ষেত্র বা সুযোগ আমরাই সৃষ্টি করছি, যারা অর্থ-বিত্ত ও প্রভাব দিয়ে আইনকে কিনে নেয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরে দায়িত্বপালনকালে দেখেছি, হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া আর কেউ তাদের কারখানার বর্জ্য পরিশোধন যন্ত্র সঠিকভাবে চালু রাখেনি। এভাবে নদ-নদীগুলো ধ্বংস হয়েছে। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এমন কোন ইটভাটা মালিককে পাইনি, যিনি আইন মেনে সরকার নির্ধারিত তিন একর ভূমির মধ্যে তার ইটভাটার ব্যবসা সীমিত রেখেছেন। বিদ্যুৎ বিভাগে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এক শ্রেণীর আবাসিক-বাণিজ্যিক ও শিল্পগ্রাহক কী নির্বিচারে বিদ্যুৎ চুরি করে রাষ্ট্রকে নিঃস্ব করছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগেও দুর্নীতির লাগসই প্রযুক্তি প্রয়োগ করে মিটারকে অচল করিয়ে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে।

গত কয়েক মাসের দুদক এনফোর্সমেন্টের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এই রাজধানী শহরে এক শ্রেণীর এলিট শ্রেণী রাজউককে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভবন-ইমারত বিধিমালা লংঘন করছে। কেউ রাস্তা দখল করছে, কেউ পাশের জমি দখল করছে, কেউ পার্কিং স্পেস গ্রাস করছে। যখনই দুদক হস্তক্ষেপ করেছে, তাদের চোখের চাহনি বলে দিচ্ছে, কিসের আইন, কেন দুদক? আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যেও করফাঁকির এক ভয়ংকর চিত্র। নগণ্যসংখ্যক সৎ ব্যবসায়ী বাদ দিলে অনেকেই মিথ্যা ঘোষণাপত্র, ভুয়া এলসি এবং কাগজপত্রে জালিয়াতি করে ব্যবসার নামে আঙ্গুল ফুলে বটগাছ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে সমাজের বড় বড় মাপের অনেক মানুষ খুব সহজেই দুর্নীতিতে লিপ্ত হচ্ছে। এভাবে জিডিপি গ্রাস করছে তারা, আয়-বৈষম্য সৃষ্টি করছে তারা। এরাই সভা-সেমিনারে ব্যবসায়িক নৈতিকতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে উচ্চস্বরে কথা বলছে।

এই রাজধানী ঢাকাতেই জাল দলিল করে কত জমি ও ভবন দখলের ঘটনা ঘটেছে। কানাডা প্রবাসী এক ভদ্রলোক আমার কাছে এসে ধর্ণা দিয়ে যাচ্ছেন, জালিয়াতি করে তার দখল করা প্লটটা কবে তিনি ফেরত পাবেন? মাত্র দুমাস আগের ঘটনা। নায়ায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে চারলেন সড়কের নির্মাণ-প্রক্রিয়া যখন শুরু হলো, তখন রাতারাতি কৃষি জমিতে গড়ে তোলা হলো সস্তা ইট-বালি-সিমেন্টের তিন-চার তলা উচ্চতার ঘরবাড়ি। উদ্দেশ্য, জমির প্রকৃত ক্ষতিপূরণ দ্বিগুণ-তিনগুণ হারে বাড়িয়ে নেয়া।

একেবারে শিক্ষিত সজ্জন নাগরিককেও দেখেছি, মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে জমির ক্ষতিপূরণ অন্যায়ভাবে বাড়িয়ে নিতে। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে এভাবে একটি অধিগ্রহণ করা জমির প্রকৃত মূল্য ছিল প্রায় তিন কোটি টাকার বেশি। কিন্তু ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে দাবি করা হয়েছিল ১০ কোটি টাকা। যদিও তা কঠোর দৃঢতায় ব্যর্থ করে দিয়েছিলাম।

ম্যাজিস্ট্রেসি জীবনে ভেজালবিরোধী অভিযানে দেখেছি, কী দুঃসাহসে পঁচা গম আমদানি করে জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছিল। জাহাজ-ভর্তি ওই গম যখন ল্যাবরেটরি টেস্টে প্রমাণ করলাম মানুষের খাওয়ার অযোগ্য, তখন আইনের তরবারি নিয়ে দাঁড়ালাম। সেই ভদ্রবেশীরা তখন একেবারে নির্বাক, অসহায়। এক শিল্পপতিকে পরিবেশ দূষণের দায়ে বিশাল অংকের জরিমানায় দণ্ডিত করার পর বাধ্য হয়ে আইনী চাপে তিনি পরিবেশ আইন মেনেছিলেন। সেই তিনিই দুবছর পর আমার সঙ্গে সাক্ষাত করে গর্বভরে বলেছিলেন, তিনি তার শিল্পকারখানায় গ্যাস লাইনের প্রকৃত ডায়ামিটারকে অনেক টাকা ঘুষের বিনিময়ে বেআইনিভাবে বড় করেছেন।

সুতরাং আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ পেশা, ব্যবসা ও দায়িত্বে সৎ ও শুদ্ধ না হয়ে শুধু রাষ্ট্রযন্ত্রকে দায়ী করা কিংবা দুদককে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো কতটুকু যৌক্তিক? এভাবে সংক্রামক ব্যাধির মত দুর্নীতি সংক্রমিত হয়েছে আমাদের রক্তে, রন্ধে, শিরায়, নিউরনে। সেই আমরাই আবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনেক উচ্চবাচ্য করি। ব্যক্তিস্বার্থে মুহূর্তেই আইনকে নিষ্পেষিত করে ফেলি। আবার আমরাই আইনের জাল থেকে রক্ষা পেতে আদালতে যেয়ে অনেক বড় বড় মিথ্যা বলি। সুতরাং ব্যক্তি হিসেবে আমার সততা, শুদ্ধতা আর আইন মান্যতা কতটুকু আছে, তা নিজের বিবেককে প্রশ্ন করি। দুর্নীতি দমন কমিশন মাত্র সহস্রাধিক জনবল সমৃদ্ধ একটি ছোট প্রতিষ্ঠান।

১৭ কোটি জনসংখ্যাবহুল এই দেশে দুদকের পক্ষে ঘরে ঘরে কিংবা অফিস আদালতে অনুবীক্ষণযন্ত্র বসিয়ে দুর্নীতি উদঘাটন করা সম্ভব নয়। তথাপি শত সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতার দায় আমরা কাঁধে নিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাতিকে সোচ্চার হতে বলছি। আমরা বারবার বলছি, ঘুষ দেবেন না। কিন্তু কেন জানি অনেকে উইন-উইন তত্ত্বে বিশ্বাসী। তাদের ধারণা, ঘুষ দেয়া ও নেয়া সমান অধিকার। মানুষ যখন ঘুষ দেয়া বন্ধ করবে, সচেতন হবে এবং প্রতিবাদ করবে, তখন ফাইল আটকে রাখারও অবসান ঘটবে। কিন্তু যখন একটি দুর্নীতির মামলা দায়ের হয়, তা প্রমাণের জন্য দুদককে প্রচুর শ্রম, অর্থ, কৌশল ও সময় ব্যয় করতে হয়। আর অপরাধীরা তার চেয়েও বহুগুণ কৌশলী। এ এক বিশাল যুদ্ধ, যে যুদ্ধে জয়লাভ করা সত্যিই কঠিন।

পৃথিবীতে এখন সামরিক যুদ্ধ বিদায় নিচ্ছে। কিন্তু একটি ভিন্নমাত্রার যুদ্ধে পৃথিবীর ছোট, বড় এবং ধনী ও দরিদ্র সব দেশকে লড়াই করতে হচ্ছে। এ যুদ্ধটি দুর্নীতি নামক এক দানবের বিরুদ্ধে। দুর্নীতি ঘটে যাওয়ার আগেই দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে পারাটাই এ যুদ্ধে জয়লাভের সার্থকতা। পৃথিবীর কোনো দেশেই দুর্নীতি দমন সংস্থা এককভাবে কিছু করতে পারেনি। আজ আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবসে আমরা প্রতিজ্ঞবদ্ধ হই, “নাগরিক হিসেবে কোনো অন্যায় সুবিধা নেবো না, রাষ্ট্রকে বঞ্চিত করবো না, কারো অধিকার ক্ষুণ্ন করবো না, আইন ভাঙবো না”। আসুন নিজে সৎ ও শুদ্ধ হই, নিজে সৎ না হয়ে অন্যের উপর সততা প্রয়োগ করা যায় না, সততার বাণী শোনানো যায় না।

লেখক : মহাপরিচালক, দুর্নীতি দমন কমিশন
ইমেইল : [email protected]