বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২০, ৩১ আষাঢ় ১৪২৭

প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তা কাউন্সিলর, ভবনমালিক ও ব্যবসায়ীর পকেটে!

প্রকাশিতঃ বুধবার, জুন ১০, ২০২০, ৬:১৪ অপরাহ্ণ


শরীফুল রুকন : করোনা সঙ্কটে অসহায় পরিবারকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ঈদ উপহার’ হিসেবে যে আড়াই হাজার টাকা করে যে মানবিক সহায়তা দিয়েছিলেন, সেই তালিকায় চট্টগ্রামের বোয়ালখালী পৌরসভার আরেকজন কাউন্সিলরের মোবাইল নাম্বার পাওয়া গেছে।

অভিযুক্ত ৪ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুনীল চন্দ্র ঘোষ শুধু নিজের মোবাইলেই টাকা নেননি, আরও বেশ কয়েকজন অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তা নিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া তালিকায় একজনের নাম-জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম্বারের সঙ্গে অন্যজনের মোবাইল নাম্বারও দিয়েছেন এ জনপ্রতিনিধি।

তালিকা তৈরির সময় তালিকার ১৩২ নম্বরে শংকর চন্দ্র দে’র ছেলে বিপ্লব কুমার দে’র নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম্বার দিয়েছিলেন কাউন্সিলর সুনীল চন্দ্র ঘোষ; তবে বিপ্লবের মোবাইল নাম্বারের পরিবর্তে নিজের মোবাইল নাম্বারটি (০১৭১৬-৫২৮৯৯৪) বসিয়ে দিয়েছেন তিনি।

জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নাম্বারের এই গড়মিল যাছাই-বাছাইয়ের সময় ধরা পড়েনি। ফলে টাকাটা কাউন্সিলরের নাম্বারে পৌঁছে যায়। মুঠোফোনে কাউন্সিলর সুনীল চন্দ্র ঘোষ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ভুলবশত নাম্বারটি বসানো হয়েছে। যখন আমার মোবাইলে টাকা এসেছে তখন তাকে (বিপ্লব) ডেকে টাকা দিয়ে ফেলেছি।’

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা পাওয়া বিপ্লব কুমার দে বোয়ালখালী পৌরসভার পূর্ব গোমদণ্ডী বুড়ি পুকুর পাড়ের ‘মা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর’ নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক। কাউন্সিলর সুনীলকে ফোন করার কিছুক্ষণ পর বিপ্লবকে একাধিকবার ফোন করা হলে প্রতিবারই তার নাম্বারটি ‘ব্যস্ত’ পাওয়া যায়।

এরপর বোয়ালখালীর একজন বাসিন্দাকে মা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে পাঠিয়ে বিপ্লবের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়। বিপ্লব একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মোবাইল হারিয়ে যাওয়ায় তালিকায় আমার নামের সাথে কাউন্সিলরের নাম্বার দেয়া হয়। আড়াই হাজার টাকা তুলে কাউন্সিলর আমাকে দিয়েছেন।’ এভাবে অন্যের নাম্বার দেয়ার সুযোগ নেই, তাছাড়া আপনি সহায়তা পাওয়ার যোগ্য কিনা- জানতে চাইলে বিপ্লব কোনও সদুত্তর দেননি।

এদিকে বোয়ালখালী পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুনীল চন্দ্র ঘোষের করা তালিকায় ২৩ নাম্বারে থাকা নুরুল আলম ভবনের মালিক। তার দুই ছেলে বিদেশ থাকেন, এক ছেলে বোয়ালখালীতে দোকান করেন। প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা নেয়ার বিষয়ে জানতে নুরুল আলমের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে একজন নারী ফোন ধরে জানান, ‘নুরুল আলম বাড়িতে নেই। কিছুক্ষণ পর নুরুল আলমের ছেলে ফারুক পরিচয় দিয়ে কল করে বলেন, আমরা কী কোটিপতি? এটা তো সরকারি টাকা, সরকার দিয়েছে, কাউন্সিলর, এলাকার নেতা-কেতারা নাম দিয়েছে। পেয়েছে আর কি। শুধু কি গরীব মানুষ পাবে? আমরা কি এই দেশের নাগরিক নই?’

নুরুল আলমকে সহায়তা দেয়ার বিষয়ে কাউন্সিলর সুনীল বলেন, ‘এটা আমাকে দেখতে হবে। আমি তো এলাকাভিত্তিক যাছাই-বাছাই করে দিয়েছি। তালিকার বেশিরভাগই অভাবী দেখে দিয়েছি।’

কাউন্সিলর সুনীলের করা তালিকায় ২৪ নাম্বারে আছেন আহমদ মিয়ার ছেলে সরোয়ার উদ্দীন; তবে সরোয়ারের নাম্বারে পরিবর্তে সেখানে ০১৮৮৫-৩৩৯২৮২ নাম্বারটি উল্লেখ করা হয়। উক্ত নাম্বারে ফোন করা হলে একজন নারী ফোন ধরে জানান, নাম্বারটি আহমদ নবীর, প্রধানমন্ত্রীর টাকা পাননি বলেও জানান তিনি।

তালিকায় থাকা সরোয়ার উদ্দীনের জাতীয় পরিচয়পত্রের সূত্র ধরে তার সন্ধান পাওয়া যায়। সরোয়ার উদ্দীন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সুনীল কাউন্সিলরের সাথে থাকে সরোয়ার নামে ২৭-২৮ বছরের একজন আমার কাছ থেকে আইডি কার্ড নিয়েছিল, সরকারের টাকা দেবে বলে। মোবাইল নাম্বার নেয়নি। বলেছিল, উপজেলা থেকে টাকা দিলে জানাবে। কিন্তু এখনো পাইনি।’ এ বিষয়ে কাউন্সিলর সুনীল চন্দ্র ঘোষ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমার স্টাফ সরোয়ার আইডি কার্ড নিয়েছিল। অবশ্য এখনো সবার কাছে টাকা আসেনি।’ সরোয়ারের প্রকৃত নাম্বার তালিকায় উল্লেখ না করা প্রসঙ্গে কাউন্সিলর সুনীল বলেন, ‘আমরা তো এসব যাছাই-বাছাই করে দিয়েছি। তার নাম্বার হবে না কেন? জনে জনে ফোন করে নাম্বার শতভাগ নিশ্চিত করেছি। নাম্বার নয় বললে এখন কী বলবো। এসব আমাকে দেখতে হবে।’

তালিকার ৩২ নাম্বারে থাকা আশীষ চৌধুরী একটি কারখানায় চাকরি করেন; তিনি মোটর সাইকেল নিয়ে অফিসে আসা যাওয়া করেন বলে স্থানীয়রা তথ্য দিয়েছেন। তালিকায় চুমকি বিশ্বাস নামের একজন নারীও আছেন; তিনি একজন প্রবাসীর স্ত্রী ও আর্থিকভাবে স্বচ্ছল বলে জানা গেছে। এছাড়া দুই ভাই, আওয়ামী লীগ নেতার নামও আছে কাউন্সিলর সুনীলের করা তালিকায়।

এছাড়া তালিকায় ৮৯ নাম্বারে থাকা প্রকাশ কুমার ঘোষ, ১১৮ নাম্বারে থাকা আবদুর রশিদ, ১২৮ নাম্বারে থাকা জাহাঙ্গীর আলম টাকা পাননি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব পালন করা বোয়ালখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আতিক উল্লাহ বলেন, ‘পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের ১২শ’ জনের তালিকা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাছাই-বাছাই করা সম্ভব হয়নি, পর্যাপ্ত সময় ছিল না। রমজান মাস ছিল, শুক্রবার-শনিবারের বন্ধেও কাজ করেছি। রাত-দিন কাজ করেছি এই তালিকা নিয়ে। অনেক ভুল-ত্রুটি ধরেছি; আইডি কার্ড একজনের, মোবাইল নাম্বার আরেকজনের এমনও অনেক পেয়েছি। অসঙ্গতি থাকলে বাদ দিয়েছি। এরপরও কিছু কিছু সমস্যা থেকে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘কাউন্সিলর নিজের নাম ব্যবহার করলে আমার চোখে পড়ার কথা। অন্যের নামে কাউন্সিলর নিজের নাম্বার ব্যবহার করেছেন, এটা আমি নিশ্চিত হয়েছি আপনি বলার পর। তিনি খুবই খারাপ কাজ করেছেন এটা।’

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বদিউল আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার হিসেবে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা কাউন্সিলরের নাম্বারে যাওয়া, স্বচ্ছল মানুষকে দেওয়া, আত্মসাৎ করার সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এর আগে গত ২ জুন প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তা নগদ অর্থ কার্যক্রমে অনিয়মের দায়ে বোয়ালখালী পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সোলাইমান বাবুলকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিল স্থানীয় সরকার বিভাগ। কাউন্সিলর বাবুল প্রধানমন্ত্রীর দেয়া আড়াই হাজার টাকা সহায়তা নিজে নেয়ার পাশাপাশি কয়েকজন ধনী ব্যক্তিকেও নিয়ে দিয়েছিলেন।