বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২০, ৩১ আষাঢ় ১৪২৭

দেড় মাস আগে গ্রেপ্তার হলেও কারাগারে নেই রকি বড়ুয়া!

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, জুন ২৬, ২০২০, ১১:০২ অপরাহ্ণ

শরীফুল রুকন : বহুল আলোচিত-সমালোচিত রকি বড়ুয়া গত ১১ মে চট্টগ্রাম নগরে র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এরপর থেকে পুলিশ হেফাজতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ‘চিকিৎসাধীন’ আছেন তিনি। দেড় মাস আগে গ্রেপ্তার হলেও রকি বড়ুয়াকে এখনো আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানো হয়নি। এজন্য চমেক হাসপাতালকে দায় দিতে চায় পুলিশ।

এর আগে গত ৭ মে রাতে ‘সাঈদীর মুক্তির জন্য বৈঠক, সরকারকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া কে এই রকি বড়ুয়া? শিরোনামে একুশে পত্রিকায় অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশের পর বিভিন্ন মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এরপর গত ১১ মে রাতে চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশের মোহাম্মদপুর এলাকার একটি বাসা থেকে রকি বড়ুয়া ও পাঁচ সহযোগিকে অস্ত্র-গুলিসহ গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। একইদিন লালখান বাজার এলাকায় মেরিন কে এইচ টাওয়ারে রকি বড়ুয়ার বাসায় অভিযান চালিয়ে তার কথিত রক্ষিতা এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারের পর চমেক হাসপাতালে সাধারণ রোগীর মতো ‘চিকিৎসাধীন’ থাকার সুযোগে রকি বড়ুয়ার সঙ্গে থাকছেন তার স্ত্রী ও পরিবারের লোকজন। এছাড়া রকির সেবায় হাসপাতালে নিয়োজিত আছেন তার কয়েকজন সহযোগিও। হাসপাতালে বসেই মুঠোফোনে বাইরের লোকজনের সাথে যোগাযোগ করার সুযোগও রয়েছে রকি বড়ুয়ার। এছাড়া বিভিন্ন লোকজন হাসপাতালে গিয়ে অবাধে রকি বড়ুয়ার সঙ্গে বৈঠক করছেন বলেও অভিযোগ আছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, ৩৬ নং ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন রকি বড়ুয়া। এ সময় তার স্ত্রীকে পাশে দেখা গেছে। গ্রেপ্তারের সময় তিনতলা থেকে পড়ে দুই পায়ে আঘাত পেয়েছিলেন রকি বড়ুয়া। সে সময় তার দুই পায়ে প্লাস্টার করা হয়েছিল। এখন তার এক পায়ে প্লাস্টার দেখা গেছে।

চমেক হাসপাতাল সূত্র জানায়, চার দিন আগে ২৬ নং ওয়ার্ডে রকি বড়ুয়ার পায়ে অপারেশন হয়। পায়ের চামড়ার সমস্যা নিয়ে এই অপারেশনটি হয়েছে। এরপর তাকে ৩৬ নং ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। রকি বড়ুয়া এখন অনেকটাই সুস্থ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রেপ্তার হওয়া কোন আসামির দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসার প্রয়োজন হতেই পারে। কিন্তু এত দীর্ঘ সময় আদালতে হাজির না হয়ে, কারাগারে প্রবেশ না করে পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসা নেয়ার নজির খুবই কম। পুলিশ হেফাজতে অযথা দীর্ঘ সময় ধরে সাধারণ রোগীর মতো করে রকি বড়ুয়ার হাসপাতালে থাকা নিয়ে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

এখন রকি বড়ুয়াকে পাহারা দেয়ার জন্য দামপাড়া পুলিশ লাইন্স থেকে দুই পুলিশ সদস্য প্রতিদিন চমেক হাসপাতালে আসেন। তারা পালা করে রকিকে ‘পাহারা’ দেন। কিন্তু বন্দি পাহারা দেয়ার জন্য বিশেষায়িত কারাগার কর্তৃপক্ষের মতো ব্যবস্থা বা কারারক্ষীদের মতো প্রশিক্ষণ তাদের নেই। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে, গ্রেপ্তার হয়েও সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন রকি বড়ুয়া। আর অন্য দশজন সাধারণ রোগীর মতো করে অনেকটা মুক্তভাবে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে তাকে, তার হাতে থাকছে না হাতকড়া।

এদিকে রকি বড়ুয়াকে গ্রেপ্তারের পর সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, অস্ত্র আইন ও দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধরায় রকি বড়ুয়ার বিরুদ্ধে নগরের পাঁচলাইশ থানায় চারটি মামলা করে র‌্যাব। এসব মামলা এখন পাঁচলাইশ থানার এসআই রিতেন কুমার সাহা, এসআই ইমাম হোসেন, এসআই আশেকুর রহমান ও এসআই আশরাফুল কবির তদন্ত করছেন। তবে উক্ত চারটি মামলার তদন্তভার হস্তান্তর করার জন্য র‌্যাবের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে পাঁচলাইশ থানাকে চিঠি দেয়া হয়েছে। যে কোন সময় মামলার তদন্তভার বুঝে নেবে র‌্যাব।

এদিকে দেড় মাস ধরে রকি বড়ুয়ার হাসপাতালে পড়ে থাকা নিয়ে অস্বস্তিতে থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তাকে দ্রুত আদালতে হাজির করতে চায় তারা। ‍পুলিশ চায়, প্রয়োজনে কারাগারের প্রিজন সেলের মাধ্যমে রকি বড়ুয়া হাসপাতালে থাকুক। তখন রকি বড়ুয়া কারাগারের অধীনে থাকবে। হাসপাতালের প্রিজন সেলে যে কেউ সহজে প্রবেশ করতে পারবে না। এখন প্রিজন সেলে না থাকায় রকির কাছে মানুষের আসা-যাওয়া সেভাবে থামাতে পারছে না পুলিশ।

জানতে চাইলে চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক জহিরুল হক ভূঁইয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, রকি বড়ুয়াকে যত দ্রুত আদালতে হাজির করা যায় ততই আমাদের জন্য ভালো। কিন্তু চেষ্টা করেও সেটা সম্ভব হচ্ছে না। রকি বড়ুয়াকে যদি ডাক্তাররা ছাড়পত্র না দেয়, আমরা তো তাকে জোর করে নিতে পারি না। আমি গতকাল ও আজকেও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কাছে গিয়েছি, রকি বড়ুয়াকে যাতে ছাড়পত্র দেয়া হয়- সে অনুরোধ করতে।

দেড় মাস ধরে চমেক হাসপাতালে রকি বড়ুয়ার চিকিৎসাধীন থাকার বিষয়ে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আফতাবুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি এখনই খোঁজ নিচ্ছি। কেন এতো দিন ধরে রকি বড়ুয়া হাসপাতালে আছে- সেটা খতিয়ে দেখা হবে।’

এদিকে গ্রেপ্তারের পর রকি বড়ুয়া ও তার সহযোগিদের নানা অপকর্মের বিষয়ে মুখ খুলতে শুরু করে ভুক্তভোগীরা। এ নিয়ে বিভিন্ন থানায় তার নামে একের পর এক মামলা দায়েরের খবর পাওয়া যাচ্ছে। কক্সবাজারের উখিয়ার রত্নাপালং গ্রামে রোকন বড়ুয়া নামে এক কুয়েতপ্রবাসীর বাড়িতে ঢুকে দুর্বৃত্তরা তাঁর মা-স্ত্রীসহ চারজনকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায়ও রকি বড়ুয়ার সংশ্লিষ্টতা উঠে আসছে। এছাড়া উখিয়ার মনখালী এলাকার যুবক জসিম উদ্দিন হত্যার ঘটনায়ও তার হাত দেখতে পাচ্ছে পুলিশ। এ নিয়ে গত ৪ জুন উখিয়ার ৫ খুনে সেই রকি বড়ুয়ার হাত? শিরোনামে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে একুশে পত্রিকা।

এছাড়া চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার চরম্বা বিবিবিলা শান্তি বৌদ্ধ বিহারে রকি বড়ুয়া তার অনুসারীদের নিয়ে হামলা, ভাঙচুর চালান। পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের আসামি করে থানায় তার বাবাকে দিয়ে মামলা করান- যা লোহাগাড়া থানা পুলিশের তদন্ত ও ঘটনায় জড়িতদের দেয়া ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে উঠে আসে।