শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭

নিত্য করা শারীরিক নির্যাতন শিশুটিকে মানুষ হতে দেবে তো?

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, জুলাই ৯, ২০২০, ৭:০২ অপরাহ্ণ


শারমিন সুলতানা রাশা : প্রজাপতির মত ছোটাছুটি করতে গিয়ে হঠাৎ মেঝেতে পড়ে খানিকটা চোট পায় মুনিয়া। ইশ! অনেকটা কেটে গেছে! হাঁটু গড়িয়ে রক্ত পড়ছে। নতুন জামাটাও ভিজে গেছে। চিৎকার করে কেঁদে উঠলো মেয়েটি। চিৎকার শুনে মেয়েটির মা এসেই আচমকা ধরাস ধরাস পিঠে লাগিয়ে দিল! অপরাধ সে আহত হলো কেন! আবার ওষুধ কিনে কতগুলো টাকা খরচ করতে হবে! এমনিতেই কতরকম অভাব!

মেয়েটির বয়স কত জানেন? চার! মাত্র চার! এটা আমাদের শাসন সংস্কৃতি! বিশ্বাস হচ্ছে না তো? চোখে দেখা গল্প! নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন ‘মুনিয়ার মা’ চরিত্রটি দারিদ্র্যতার সাথে সংগ্রাম করা কোনো মায়ের। এখানে আহলাদেপনার কোনো স্থান নেই। গল্পটি একটি বস্তি এলাকার। বছর কয়েক আগের।

পুরোন গল্প নতুন করে এই করোনাকালে মনে করিয়ে দিল আরেকটি শিশুর চিৎকার! আরেকটি গল্প। একটি শিশু… না থাক। আমাদের এখানে মুখ ফুটে করে কথা বলতে শুরু করলেই শিশুরা বড় হয়ে ওঠে! ওদের ভিক্ষা করতে পাঠানো হয়! চুরি করতে শেখানো হয়! ইমোশোনাল ব্ল্যাকমেইল করতে শেখান হয়! বড় হওয়ার আগেই ওরা হয়ে ওঠে নামানুষ! তাই সচেতনভাবেই ‘শিশু’ শব্দটি পরিহার করে ‘ছেলেটি’ লিখছি। ঠিক কিশোর বলা যাবে কিনা জানি না। ছেলেটি রোজ মার খায়! কিন্তু কেন? কী এমন করে সে, যে রোজ তার মাকে ছেলেটির গায়ে হাত তুলতে হয়?

স্কুল বন্ধ। বাইরে গিয়ে খেলাধূলা বারণ। পুরোটা সময় কাটাতে হয় ঘরের মধ্যে। আর শিশুদের ঘরে রাখা যে কতটা কঠিন কাজ সেটি অভিভাবকরাই ভাল জানেন। ছেলেটিও অন্য শিশুদের মত কঠিন সময় পার করছে। মাও হয়তো এই পরিবর্তন মেনে নিতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন । আর তাই শাসনও আগের চাইতে একটু বেশিই করতে হচ্ছে। কীভাবে শাসন করছেন? হাতের কাছে যা পান তাই দিয়েই মারেন! হোক সেটা শলারঝাড়, পানির বোতল, গাছের ডাল, পায়ের জুতো অথবা যে কোনো কিছু।

যেমন আজ (১৭.০৫.২০২০) ছাদের উপর দু’ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়া একখানা ইটের অর্ধেক ছেলেটার দিকে ছুড়ে মারা হলো। একটুর জন্য লাগেনি! ছেলেটা কেবল নিজেকে বাঁচালো আর ভাঙা কণ্ঠে প্রতিবাদ করলো। ইদানীং প্রায়ই এমন হয় ছেলেটি চিৎকার করতে করতে ঘর থেকে বের হয়ে ছাদে চলে যায়, মাও পিছু নেয়। আর প্রতিবেশীরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে নাটক দেখে। শুরুর দিকে কোরাস অভিনেতাদের মত দু-চারটা নিষ্ক্রিয় সংলাপ প্রক্ষেপ করতো, এখন তাও করে না। এক নাটক আর কত করবে?

এবার একেবারে সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপারটাকে দেখার চেষ্টা করি। ধরে নিলাম শিশুটি কথা শোনে না। পড়াশুনা করতে চায় না। সারাক্ষণ শুধু দুরন্তপনা করে, এ সময়টায় অন্য সময়ের চাইতে একটু বেশিই! আর সেই সাথে দারিদ্র্যতা, অনিশ্চয়তা ইত্যাদি তো আছেই প্রভাবক হিসেবে। তাই অভিভাবক শাসন করছেন সন্তানের ভালোর জন্য। সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য। মানুষ হয়ে ওঠার জন্য। কিন্তু ছেলেটির উপর নিত্য করা শারীরিক নির্যাতন তাকে মানুষ হতে দেবে তো? এই যে ছেলেটি প্রতিবেশীদের সামনে প্রতিনিয়ত মার খাচ্ছে এতে তার ব্যক্তিত্বের বিকাশে কোনোরকম প্রভাব পড়বে না? আর আধখানা ইটের নিশানা যে কখনও ছেলেটিকে পত্রিকার শিরোনাম করবে না সেই নিশ্চয়তাই বা কিসে?

শারমিন সুলতানা রাশা : মঞ্চাভিনেত্রী, নির্দেশক, গল্পকার ও নাট্যকার।