শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭

এসআই হেলালের ‘পাপের’ প্রায়শ্চিত্ত করছে এসআই তারিকরা!

প্রকাশিতঃ বুধবার, জুলাই ২২, ২০২০, ২:০৪ অপরাহ্ণ


শরীফুল রুকন : সাদা পোশাকে অভিযানে গিয়ে কিশোরের আত্মহত্যায় প্ররোচনায় অভিযুক্ত নগরের ডবলমুরিং থানার এসআই হেলাল উদ্দিন। আরও নানা অভিযোগ এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। কিন্তু হেলালের ‘পাপের’ প্রায়শ্চিত্ত করতে বিভিন্ন থানার দক্ষ অফিসারদের বলির পাঁঠা বানাল চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)! একযোগে বদলি করা সেই ১২ এসআইয়ের অধিকাংশই ভালো ও দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। এসব কর্মকর্তাদের বদলিতে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে থানাগুলোতে। কেউ কেউ এ ঘটনায় ‘ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, চক্রান্ত’ও দেখছেন।

ডবলমুরিং থানা এলাকায় কিশোরের আত্মহত্যার দুইদিন পর গত ১৯ জুলাই সিএমপির বিভিন্ন থানার ১২ এসআইকে একযোগে বদলি করা হয়। বদলি হওয়া এসআইদের মধ্যে আছেন কোতোয়ালী থানার এসআই সজল কান্তি দাশ, এসআই তারিকুজ্জামান, বাকলিয়া থানার এসআই এসএম জামাল উদ্দিন, এসআই রেজোয়ানুল ইসলাম, সদরঘাট থানার এসআই তন্ময় ভট্টাচার্য্য, এসআই মোর্শেদ আলম।

এছাড়া পাঁচলাইশ থানার এসআই আব্দুল মোমিন, চান্দগাঁও থানার এসআই সালাউদ্দিন খান নোমান, ডবলমুরিং থানার এসআই হাসানুজ্জামান রোমেল, হালিশহর থানার এসআই পলাশ চন্দ্র ঘোষ, পাহাড়তলী থানার এসআই আব্দুল্লাহ আল মাসুদ ও বায়েজিদ বোস্তামী থানার এসআই গোলাম মোহাম্মদ নাসিমকেও বদলি করা হয়েছে।

সিএমপি’র উপ-কমিশনার (সদর) আমীর জাফর বলছেন, এই বদলি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হলেও এর মধ্য দিয়ে একটি সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এক থানায় থাকা এবং ডবলমুরিং থানার একটি ঘটনা- সব মিলিয়ে সবাইকে অ্যালার্ট করার জন্য এই আদেশ।

তবে যে ১২ এসআইকে একযোগে বদলি করা হয়েছে তাদের মধ্যে অধিকাংশই ভালো ও দক্ষ অফিসার হিসেবে পরিচিত; তাদের মধ্যে শুধু এসআই গোলাম মোহাম্মদ নাসিম বারবার নেতিবাচক খবরের শিরোনাম হয়েছেন। বাকিদের বিরুদ্ধে তেমন কোন অনিয়ম বা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ গণমাধ্যমে আসেনি। তবুও সিভিল টিম পরিচালনার ‘কলঙ্ক’ মাথায় নিয়ে তাদের থানা ছাড়তে হয়েছে।

এদিকে সৎ, দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত কোতোয়ালী থানার এসআই তারিকুজ্জামানকে কেন একই সাথে বদলি করা হলো তা ভেবে পাচ্ছেন না অনেকেই। পেশাদার অপরাধীকে আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক সফলতা পাচ্ছিলেন কোতোয়ালী থানার এসআই সজল কান্তি দাশও। চোরাই মালামাল উদ্ধার, আন্ত:জেলা চোর চক্রের সদস্য গ্রেপ্তার, চোরদলের একাধিক গ্রুপ শনাক্তকরণ, সিএনজি অটোরিকশা ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারসহ অসংখ্য সাফল্যের রেকর্ড রয়েছে কোতোয়ালী থানার এই দুই কর্মকর্তার।

বদলি হওয়া বাকলিয়া থানার এসআই এসএম জামাল উদ্দিন ও রেজোয়ানুল ইসলামও অপরাধ দমনে অত্যন্ত দক্ষ হিসেবে পরিচিত। দুই বছর হয়েছে তারা সিএমপিতে যোগ দিয়েছেন। বাকলিয়ায় জটিল সব মামলার রহস্য উদঘাটনে তাদের দায়িত্ব দেয়া হয়। বাকলিয়া থানার প্রতিটি অর্জনে তাদের সম্পৃক্ততা থাকে, সিএমপিতে প্রতি মাসে তারা পুরস্কৃতও হচ্ছিলেন। বাকলিয়া থানার এই দুই এসআই এখন ‘চক্রান্তের শিকার’ বলে মন্তব্য করেছেন তাদের একজন সহকর্মী।

তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, এসএম জামাল উদ্দিন চাক্তাই পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত। তিনি সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অফিস সময়ে পোশাক গায়ে দিয়ে ডিউটি করেন। চাক্তাইয়ে অবস্থিত ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তায় দিন-রাত তাকে কাজ করতে হয়, তার পক্ষে সিভিল টিম পরিচালনা করার সুযোগ কতটুকু? এসআই জামালের কাছে গাড়িও নেই। অথচ তাকে সিভিল টিম পরিচালনার অভিযোগ তুলে বদলি করা হলো।

‘প্রকৃত সত্য হচ্ছে, বিভিন্ন সময় সিটিএসবির একজন কর্মকর্তা এসআই জামালকে ফোনে করে বিভিন্ন তথ্য জানতে চাইতেন। জামাল কোন সময় তথ্য দিতেন। আবার কোন সময় এলাকায় এসে জেনে নিতে বলতেন। আর এতেই ক্ষুব্ধ সিটিএসবির ওই কর্মকর্তা সুযোগ পেয়ে সিভিল টিম পরিচালনাকারীদের নামের তালিকায় জামালের নাম দিয়ে দেন।’

আরেকজন পুলিশ কর্মকর্তা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পুলিশে অনেক ধরনের মানুষ আছে। কেউ ইয়াবা উদ্ধারের নামে মাদক কারবারের জড়িয়ে পড়ে। আর কেউ শুধু পেশাদার অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে ছুটে, তাদের আমরা ‘ক্রাইম অফিসার’ বলে থাকি। বাকলিয়া থেকে যে দুজনকে বদলি করা হয়েছে, তারা ক্রাইম অফিসার। অপরাধী ধরতে, রহস্য উদঘাটনে তাদের দায়িত্ব দিয়ে নির্ভার থাকতেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।’

অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও রহস্য উদঘাটনে অদম্য নেশা রয়েছে পাঁচলাইশ থানার এসআই আব্দুল মোমিনেরও। তার সহকর্মীরা জানিয়েছেন, সম্প্রতি পাঁচলাইশ থানা পুলিশ যে ১৩৭টি চোরাই মোবাইল উদ্ধার করেছে সেই অভিযানে মূল ভূমিকায় ছিলেন এসআই আব্দুল মোমিন। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন জটিল মামলার রহস্য উদঘাটনে দক্ষ এ কর্মকর্তা।

এসআই আব্দুল মোমিনের একজন ব্যাচমেট একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এসআই হেলালের ‘পাপের’ প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে ভালো অফিসারদের। বদলি করা এসআইদের মধ্যে বায়েজিদের গোলাম মো. নাসিমের বদনাম আছে। অন্যদের বিরুদ্ধে তেমন অভিযোগ নেই। ভালো কাজের মধ্যে থাকা অবস্থায় মোমিনের বদলির আদেশ এসেছে।’

তিনি বলেন, ‘এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বদলি করা কোন সমস্যা নয়। কিন্তু কিশোরের আত্মহত্যার পরপর একযোগে ভালো অফিসারগুলোকে বদলি করা ও সিভিল টিম পরিচালনার দায় দেয়া দুঃখজনক, কষ্টদায়ক। এতে ভালো অফিসারগুলোকে নিয়ে মানুষের মনে নেগেটিভ ধারণা জন্ম নেবে। অফিসাররাও ভালো কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।’

বদলি হওয়া চান্দগাঁও থানার এসআই সালাউদ্দিন খান নোমান ভালো ও দক্ষ অফিসার বলে মন্তব্য করেছেন থানাটির ওসি আতাউর রহমান খোন্দকার। এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।

এদিকে বদলি হওয়া ১২ এসআইয়ের মধ্যে একজন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্লান্তিহীন কাজ করে এসেছি। আমার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ আজ পর্যন্ত নেই। অথচ আমাকে এ সময় বদলি করে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো সিভিল টিম পরিচালনাকারী খারাপ অফিসার হিসেবে। খুবই কষ্ট পাচ্ছি।’

বদলিকৃত আরেকজন এসআই বলেন, ‘সাদা পোশাকে এসআই হেলালের অভিযানের পর কিশোরের আত্মহত্যার পরপর আমাদের একযোগে বদলি করা হলো। আর এ বদলির ফলে গণমাধ্যমে এটা এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে যেন আমরা অপরাধী। গণমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে ‘সিএমপির বিষফোঁড়া সিভিল টিম’। আর আমরা সিভিল টিম পরিচালনা করি বলে ইঙ্গিত দিয়ে খবর প্রকাশ করা হচ্ছে। সিএমপিতেই থাকবো না আর। সিআইডি বা অন্য ইউনিটে বদলি হওয়ার চেষ্টা করছি।’

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, এই বদলি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। এটা প্রশাসনিক বিষয়। এখানে কাউকে খারাপ জেনেই বদলি করা হয়েছে এ রকম না।

তিনি বলেন, দক্ষিণ বিভাগের এসআইকে উত্তর বিভাগে দেয়া হয়েছে, এতটুকুই। এমন না যে তাকে পানিশমেন্ট পোস্টিং দেয়া হয়েছে। তাদের যখন ট্রেনিং সেন্টারে দিতাম, দাঙ্গা পুলিশে দিতাম, তখন একটা কথা ছিল।

‘এখন দেখা গেল দক্ষিণের বাকলিয়ার কেউ উত্তরে বদলি হল, তখন সে পাঁচলাইশ থানায় যাবে, বায়েজিদ থানায় যাবে। সেখানে তো তার আরও ভালো কাজ করার সুযোগ আছে। অনেক সময় দেখা যায় এসব থানায় যেতে অফিসাররা আগ্রহ দেখায়। এখন তো সহজেই পোস্টিং হয়ে গেল। তাহলে তারা ভুল বুঝতেছে কেন?’ যোগ করেন সিএমপি কমিশনার।