শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭

অর্থ আত্মসাত ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিষোদ্গার, কেঁওচিয়া স্কুলের সভাপতি-প্রধান শিক্ষককে তলব

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৩, ২০২০, ৪:৩১ অপরাহ্ণ


একুশে প্রতিবেদক : সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের নাসিরাবাদ শাখার ব্যাবস্থাপক মো. নাসির উদ্দিন ও প্রধান শিক্ষক সুনীল কুমারের বিরুদ্ধে বিদ্যালয় তহবিলের প্রায় ৩৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়েছে।

চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের উপ কলেজ পরিদর্শক ও তদন্ত কমিটির প্রধান মোহাম্মদ হালিম স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে অভিযুক্তরাসহ সংশ্লিষ্ট ৬ জনকে আজ বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের তদন্ত কমিটির সামনে তলব করা হয়েছে।

এর আগে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এ সংক্রান্ত অভিযোগ দাখিল করেন পরিচালনা পরিষদের নির্বাচিত অভিভাবক সদস্য কাজী মহিম উদ্দিন, আহমদ কবির, জাহাঙ্গীর আলম ও শিক্ষানুরাগী সদস্য জামাল হোসেন।

গত ১ মার্চ অভিযোগ দাখিলের পর ২৩ মার্চ দুই সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন বিদ্যালয় পরিদর্শক ড. বিপ্লব গাঙ্গুলী। তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন শিক্ষাবোর্ডের উপ-কলেজ পরিদর্শক মোহাম্মদ হালিম এবং সহকারী সচিব মো. সাইফুদ্দিন। দীর্ঘ প্রায় ৫ মাস পর তদন্ত কমিটির প্রধান মোহাম্মদ হালিম সংশ্লিষ্টদের বৃহস্পতিবার তলব করলেন।

অভিযোগে বলা হয়, সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী ‘খাতওয়ারি আয়, খাতওয়ারি ব্যয়’ নিশ্চিত না করে, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোচিংয়ের নামে বিশেষ ফি ও জরিমানা আদায়ের মাধ্যমে ২০১৬-২০২০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৪ লাখ টাকা কৌশলে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

অভিযোগে সভাপতি-প্রধান শিক্ষকের দহরম-মহরম সম্পর্কের নেপথ্যে আর্থিক দুর্নীতি জড়িত এবং প্রধান শিক্ষক অদক্ষ উল্লেখ করে বলা হয়, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ছাপানো ডায়েরিতে একটি বাণী প্রকাশ করেন প্রধান শিক্ষক। মাত্র ৮২ শব্দের সেই বাণীতে বাংলা বানান ভুল করেছেন ১১টি।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৩ জুলাই বিদ্যালয় কমিটির রেজুলেশনে অষ্টম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিশেষ কোচিং ফি বাবদ মাসিক ৩০০ টাকা হারে আদায়ের সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তীতে চার বছরে কোচিং ফি আদায় হলেও বিদ্যালয় তহবিলে বিধি মোতাবেক এক পয়সাও জমা হয়নি। এইখাতে প্রায় ১২ লাখ টাকা আত্মসাত হয়েছে।

এছাড়া বিদ্যালয় শিক্ষার্থী ভর্তির ফরম বিক্রির অর্থও নয়-ছয় হয়েছে। এসব অনিয়মের বিষয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির ২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তারিখের মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত অভিভাবক সদস্য ও শিক্ষক প্রতিনিধি নিয়ে পর্যালোচনা উপ-কমিটি গঠিত করা। পর্যালোচনা শেষে উপ-কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করে। এতে আর্থিক অনিয়মের বিস্তারিত তথ্য- ২০০৮ সাল থেকে অদ্যাবধি বিদ্যালয়ের অডিট না হওয়া, ২০১৬ সালের অডিট করার পরও আপত্তি নিষ্পত্তি না করে সেটি ধামাচাপা দেওয়া এবং প্রায় ৩৪ লাখ টাকা আত্মসাতের তথ্যাদি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে বিশেষ কোচিংয়ে চার বছরে প্রায় ১২ লাখ টাকা, আদায়কৃত জরিমানার এক লাখ ৯৩ হাজার টাকা, ‘মিলাদ’ ও ‘দরিদ্র ভাতার’র টাকা আত্মসাত, সরকারিভাবে শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন পাওয়া সত্ত্বেও দ্বিতীয় দফায় বিদ্যালয় তহবিল থেকে ‘বেতন’ পরিশোধ দেখিয়ে বছরে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা করে চার বছরে ২০ লাখ টাকা আত্মসাতসহ চার বছরে অন্তত ৩৪ লাখ টাকা আত্মসাতের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য উঠে আসে। কিন্তু সুনীল কুমার ও নাসির উদ্দিন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির নিয়মিত মিটিংয়ে প্রতিবেদন উত্থাপন না করে ধামাচাপা দেন।

অভিযোগ আছে, ভবিষ্যতেও সভাপতি নির্বাচিত হতে শিক্ষক প্রতিনিধিগণ তিনটি ভোট নাসির উদ্দিনের পক্ষে প্রয়োগ করবেন, এমন মৌখিক নিশ্চয়তা দিয়ে পর্যালোচনা প্রতিবেদন হিমাগারে পাঠান সুনীল কুমার।

অন্যদিকে, সুনীল কুমার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুবর রহমানের জন্মবার্ষিকী নিয়ে চরম আপত্তিজনক মন্তব্য করার বিষয়টিও আত্মসাতের ঘটনার পর নতুন করে আলোচনা এসেছে। প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন নিয়ে বিষোদ্গার করার পরও সুনীল কুমারের বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে।

অভিযুক্ত সুনীল কুমার তার ফেসবুক আইতে গত বছরের ১৭ মার্চ ফেসবুক পোস্টে লিখেন, “জন্মদিন ও জাতীয় দিবস পালন প্রসঙ্গে- আজ সব সরকারি অফিস আদালত বন্ধ কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা। মাস্টাররা কাজ করবে বাকিরা মজা করবে এটা মেনে নেওয়া যায় না। আমি সম্পূর্ণ এর বিরোধী। করলে সবাই পালন করবে না করলে কেউ করবে না। তাছাড়া কেউ মরার পর জন্মদিন পালন করার দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। আর এ সমস্ত দিবসগুলি বন্ধের তালিকাই দেওয়ার দরকার কি ছিল। যতসব রাবিশ।”

অভিযোগ রয়েছে, এমন আপত্তিকর প্রচারণার পরও বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি মূলত তারা পরস্পর অর্থ-আত্মসাতের সহযোগী হওয়ার কারণে।

এই বিষয়ে অভিভাবক সদস্য আহমদ কবির বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকের এমন গর্হিত প্রচারণায় গ্রামে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তাই ম্যানিজিং কমিটির মিটিংয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব করি। কিন্তু এতে সভাপতি রাজি হননি। উল্টো প্রধান শিক্ষককে রক্ষা করেন।’ অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয় তহবিল থেকে কৌশলে আত্মসাতের টাকায় পার্বত্য জেলা বান্দরবান সদরে আবাসন কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। এছাড়া চকরিয়ার পাহাড়ি এলাকা একটি বৃহৎ খামার গড়ে তুলেছেন।

অনিয়ম দুর্নীতি বিষয়ে সুনীল কুমার একুশে পত্রিকাকে বলেন, শিক্ষাবোর্ডে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। আসলে এ রকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। তদন্ত করার পর প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নিজের ফেইসবুক আইডিতে কটুক্তি করার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমি কোনও ধরনের কটুক্তি করিনি। আমার আইডি হ্যাক করে কে বা কারা এ পোস্ট করেছে। আইডি হ্যাক হওয়ার বিষয়ে থানায় জিডি করেছিলাম। পুলিশ তদন্ত করে দেখেছে, তাতে আমার কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই।

বান্দরবান সদরে আবাসন প্রতিষ্ঠানে অর্থলগ্নি ও চকরিয়ার পাহাড়ে খামার গড়ে তোলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি প্রধান শিক্ষক।

এদিকে শিক্ষাবোর্ডে অভিযোগ দেওয়ায় সংশ্লিষ্টদের উপর বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি নাসির উদ্দিন ক্ষুবদ্ধ হয়েছেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগকারীদের নাকি তিনি হুংকার ছেড়ে বলেছেন- আমি এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকে চাকরি করি, টাকার সমস্যা নেই। টাকা দিলে বোর্ড ম্যানেজ করা কোনো বিষয় নয়। আর অভিযোগকারীদের জানা উচিত ছিল, আমি জিয়াউল হক চেয়ারম্যানের ছেলে। ১৯৮৮ সালের ইউপি নির্বাচনের সময়ে আমার রূপ তাদের স্মরণ রাখা উচিত ছিল।

প্রসঙ্গত, ওই সময়ের ইউপি নির্বাচনের দিন তৎকালীন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী এজিএম শাহজাহানের সমর্থক কাজী লিয়াকত আলীকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছিলেন নাসির। সেদিন লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন মিয়া নামের এক বৃদ্ধ। গুলিবিদ্ধ মিয়া এখনো জীবিত আছেন। তবে বিচার পাননি তিনি। সেই পুরোনো দিনের হুংকার ও অস্ত্রবাজির কথা তিনি অভিযোগকারীদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে স্পষ্টতই হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগকারীরা মনে করছেন।

অর্থ আত্মসাত ও অভিযোগকারীদের ১৯৮৮ সালের ইউপি নির্বাচনের সময় একজনকে গুলি করার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার বিষয়ে মো. নাসির উদ্দিন বলেন, অভিযোগ সত্য না আর আমি এ ধরনের কোনো হুমকি দিইনি। আমি একজন চাকরিজীবী। এ ধরনের কথা বলার প্রশ্নই আসে না। অভিযোগকারীরা মিথ্যা অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে এমনসব আজগুবি কথাবার্তা ছড়াচ্ছে।

তার দাবি, স্কুলের অগ্রযাত্রায় ইর্ষান্বিত হয়ে একটি মহল, যারা স্কুলের পরিচালনা পরিষদ দখল করতে চান, মূলত তারাই এমন সব মিথ্যা অভিযোগ ও প্রচারণা চালাচ্ছেন। তদন্তে এসব অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হবে বলেও আত্মবিশ্বাস নাসির উদ্দীনের।