শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭

ফ্লাইওভারে সন্ধ্যার পর ভুতুড়ে পরিবেশ, জ্বলছে না আলো

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২০, ৩:০৮ অপরাহ্ণ


জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : চট্টগ্রাম নগরের চারটি ফ্লাইওভার বিদ্যুৎ নিয়ে বিড়ম্বনা শেষ হচ্ছে না। সন্ধ্যার পর ফ্লাইওভারে স্থাপিত বেশিরভাগ বাতি জ্বলছে না। এতে রাতে সৃষ্টি হচ্ছে ভুতুড়ে পরিবেশ। এ কারণে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যানবাহন।

যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট না থাকায় নগরীর কদমতলী ও দেওয়ানহাট ফ্লাইওভার, বহদ্দারহাট এম এ মান্নান ফ্লাইওভার, মুরাদপুর আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার গত বছরের ১ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) কাছে হস্তান্তর করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।

বিদ্যুৎ বিলসহ প্রতি মাসে এসব ফ্লাইওভারের পেছনে খরচ হতো অন্তত ৪০ লাখ টাকা। সেই ব্যয় মেটাতে ব্যর্থ হয়ে ফ্লাইওভারগুলোর দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হয় চসিককে। কিন্তু এসব ফ্লাইওভারের সৌন্দর্যবর্ধন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব চসিক নিলেও কমেনি ব্যবহারকারীদের বিড়ম্বনা, বরং বেড়েছে বহুগুণ।

নিতান্তই বাধ্য না হলে রাতের বেলা ফ্লাইওভার ব্যবহার করতে চান না অনেকেই। এই চারটি ফ্লাইওভারে রাতে যানবাহন চালাতে গিয়ে হিমশিম থেতে হচ্ছে গাড়ি চালক ও মোটরসাইকেল আরোহীদের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রায় প্রতিদিনই রাতে চারটি ফ্লাইওভারের বেশিরভাগ বাতি জ্বলে না। ফ্লাইওভারের শুরু আর শেষের দিকে কয়েকটি বাতি জ্বালিয়ে দায় সারছে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা চসিক।

সরেজমিনে গত ২৪, ২৫ ও ২৬ জুন পরপর তিনদিন উক্ত ফ্লাইওভারগুলোতে গিয়ে এই অভিযোগের সত্যতা মিলে। দেখা যায়, প্রত্যেকটি ফ্লাইওভারের শুরুতে এবং শেষের দিকে বাতি জ্বললেও মাঝের অংশে জ্বলছিলো না কোনো বাতি, অন্ধকারেই চলাচল করছিলো যানবাহন। আর গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে ফ্লাইওভারের রাস্তার ভাঙা অংশ, সংস্কারের অভাবে সৃষ্ট গর্ত এবং রাস্তায় পাশের বালি ও ময়লার স্তূপ।

আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার এই চারটি ফ্লাইওভারের মধ্যে সবচেয়ে ব্যস্ত এবং সর্বাধিক ব্যবহৃত হলেও ঝুঁকি নিয়ে বেশি যানচলাচল করছে এই ফ্লাইওভারেই। কেজিডিসিএল অংশ থেকে জিইসি স্যানমার অংশ পর্যন্ত ফ্লাইওভারে বাতি থাকা সত্ত্বেও জ্বলছিল না সেগুলো। আর সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র এই অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে নাইলনের সুতা বেঁধে করছে ছিনতাই, দুর্ঘটনাও ঘটছে অহরহ।

অন্যদিকে অবাক করা দৃশ্য চোখে পড়ে বহদ্দারহাট এম এ মান্নান ফ্লাইওভারে। সম্পূর্ণ ফ্লাইওভারে জ্বলতে দেখা যায় নি একটি বাতিও। ফ্লাইওভারের বিভিন্ন জায়গায় মেরামতের অভাবে সৃষ্টি হয়েছে গর্ত। আর বাতি না থাকায় অন্ধকারে সেটি অনেকটা মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। অন্ধকারে সুঁই খোঁজার মত করে ফ্লাইওভারটি ব্যবহার করতে হচ্ছে জনসাধারণকে।প্রায় একই চিত্রের দেখা মিলে কদমতলী এবং দেওয়ানহাট ফ্লাইওভারেও।

মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী সোবহান চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমি প্রায় সময়ই কাজের প্রয়োজনে ফ্লাইওভারগুলো ব্যবহার করে থাকি। দিনের বেলা কোনভাবে চললেও রাতের বেলা খুব বেশি ভয়ে থাকি। লরি বা ট্রাক আসলে সেগুলোকে জায়গা দেয়ার জন্য ফ্লাইওভারের পাশে গেলেই ময়লার স্তুপ সামনে চলে আসে। অন্ধকারের মধ্যে খুব অসুবিধা হয় গাড়ি চালাতে। এই ভোগান্তির শেষ কবে হবে জানি না।

সিএনজি অটোরিকশা চালক সিরাজ মিয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, রাতের বেলা ফ্লাইওভারে উঠলে আল্লাহর নাম জপে জপে গাড়ি চালাই। রাস্তা ভাঙা, আবার অন্ধকার, এভাবে ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হয়।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বিদ্যুৎ উপ-বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ঝুলন কান্তি দাশ বলেন, ফ্লাইওভাবে বাতি না জ্বলার বিষয়টি সত্য। তবে এই সমস্যা হওয়ার কিছু কারণ আছে। প্রথমত সিডিএ আমাদেরকে অনেকটা তড়িঘড়ি করেই এই ফ্লাইওভারগুলোর দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে। আমরা যখন দায়িত্ব নিয়েছিলাম তখন বহদ্দারহাট এম এ মান্নান ফ্লাইওভারে একটি বাতিও জ্বলতো না, এমনকি বেশকিছু জায়গায় বাতিও ছিল না।

তিনি বলেন, এছাড়া মুরাদপুর আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারে কিছু বাতি জ্বলতো, তবে সবগুলো ঠিকঠাক ছিল না। আমরা বেশকিছু কাজ করেছি, এই ফ্লাইওভারগুলোতে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যাটা হলো বাতির খুঁটিতে থাকা বিভিন্ন পার্টস, কন্ট্রোল বক্স, ক্যাবল চুরি হয়ে যাচ্ছে। যার কারণে আমাদের খুবই সমস্যায় পড়তে হয়। তারপরও আমি আজই একটি টিম পাঠিয়ে পুরো বিষয়টা সমাধান করার চেষ্টা করবো।

সিডিএর কাছ থেকে ফ্লাইওভারের দায়িত্ব নেয়ার আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বৈদ্যুতিক লাইটে সংযোগ ঠিকঠাক আছে কিনা দেখা পুরোপুরি নিশ্চিত করেছিল চসিক। কিন্তু তারপরও কেন এই ভোগান্তি এই প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ এ কে এম রেজাউল করিম একুশে পত্রিকাকে বলেন, এই বিষয়টি নিয়ে আমরাও খুবই ঝামেলায় আছি। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সমস্যা সমাধানের জন্য ট্রেড ম্যাক্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে আমরা ৫ বছরের চুক্তি করেছি। তারা বেশকিছু সরঞ্জাম দুবাই থেকে আনবে বলেছিল। কিন্তু করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে সেগুলো তারা এই মূহুর্তে আনতে পারছে না। তবে আমি সকলের কাছে অনুরোধ জানাবো আমাদের একটু সময় দেয়ার জন্য, খুব শিগগিরই আমরা এই সমস্যার সমাধান কর‍তে পারবো বলে আশা করছি।

এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামসুদ্দোহাকে বেশ কয়েকবার মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি কল কেটে দেন।