শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭

‘আইসিইউ’ যখন আইসিইউতে!

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, জুলাই ৩০, ২০২০, ৬:২৯ অপরাহ্ণ


চট্টগ্রাম : জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে বা সঙ্কটাপন্ন পরিস্থিতিতে মানুষ আইসিইউতে যান জীবনরক্ষার শেষচেষ্টা হিসেবে। এটাই স্বাভাবিক ঘটনা। বরং অস্বাভাবিক হচ্ছে আইসিইউ যখন আইসিইউতে যায়। হ্যাঁ, এটাই সত্য। ১০ শয্যা বিশিষ্ট চট্টগ্রামের সরকারি জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিট অপ্রিয় হলেও সত্য যে, চিকিৎসা ও পরিচর্যার অভাবে ধুকে ধুকে মরছে।

একুশে পত্রিকার পক্ষ থেকে বুধবার (২৯ জুলাই) সন্ধ্যা পৌনে ৬টা থেকে সাড়ে ৬টা পর্যন্ত উক্ত আইসিইউ ওয়ার্ড পরিদর্শন করে এমনই ‘মৃত অবস্থা’ লক্ষ্য করা গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ১০ আইসিইউ বেডের ৭টিতে রোগী থাকলেও তিনটি বেড খালি। ৭ রোগীর ৫ জনের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। প্রত্যেককে জীবনরক্ষাকারী অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই অক্সিজেন সাপোর্ট পাওয়ার ফলে রোগীর অবস্থা কী হচ্ছে, অক্সিজেন স্যাচুরেশন কত দেখার জন্যে কোনো মনিটর নেই।

সংশ্লিষ্টরা জানালেন, ১০টি মনিটরের ৯টিই বিকল। সচল থাকা একমাত্র মনিটরটি ব্যবহার হচ্ছে সমাজে প্রভাব-পরিচিতি আছে, অথবা যার জন্যে তদবির বেশি, সেই রোগীর জন্য।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, আইসিইউতে অক্সিজেন স্যাচুরেশন দেখার ছোট্ট যে যন্ত্র পালস অক্সিমিটার, সেটিরও সঙ্কট রয়েছে। চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতালের উদ্যোক্তা ও সিইও ডা. বিদ্যুত বড়ুয়া বুধবার সন্ধ্যায় আইসিইউতে চিকিৎসাধীন করোনা আইসোলেশন সেন্টারের উদ্যোক্তা সাজ্জাত হোসেনকে দেখতে গিয়ে নিজের চোখেই দেখলেন জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটের এ করুণ অবস্থা।

পালস অক্সিমিটারের কাজ হলো রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ও হৃদস্পন্দনের গতি নির্ণয় করা। চিকিৎসাধীন সাজ্জাতের রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কত, তা দেখার জন্য সংশ্লিষ্টদের কাছে একটি পালস অক্সিমিটার চান ডা. বিদ্যুত বড়ুয়া। অনেক খোঁজাখুঁজির পর কর্তব্যরত নার্স সংগীতা ঘোষ একটি পালস অক্সিমিটার বের করে আনেন ঠিকই, কিন্তু অনেক চেষ্টার পর দেখা গেলো সেটিতে কাজ হচ্ছে না, অর্থাৎ পালস অক্সিমিটারটি বিকল। নার্স সংগীতাই জানালেন, এখানে অক্সিমিটারের ব্যবহার তেমন একটা হয় না।

দেখা গেছে, ৮১ থেকে ৮৫ অক্সিজেন লেভেল থাকা এক রোগীকে ১৫ লিটারের অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। একমাত্র সচল মনিটরটি সামনে রেখে ডা. বিদ্যুত বড়ুয়া বললেন, ৫ লিটার অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়ে দেখতে। তাতে দেখা গেলো, ৯০’র ঘরে গিয়ে ঠেকছে অক্সিজেনের মাত্রা। এবার বললেন, ৭ লিটার করে দিতে। তাতে অক্সিজেন লেভেল গিয়ে ঠেকলো ৯৫ তে। অর্থাৎ ৭ লিটার অক্সিজেন সাপোর্টে যে ফিডব্যাক আসে তার জন্য ১৫ লিটার অক্সিজেন ব্যয় করে প্রকারান্তরে জীবনরক্ষাকারী অক্সিজেনেরই অপচয় করা হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেলো, পদে পদে অনিয়ম, অবহেলা, অব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত অবস্থা আইসিইউ ইউনিটে। ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন নেই এমন রোগীও পর্যবেক্ষণের স্বার্থে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা সেই রোগীদের মতো তাদেরকেও পাম্পাস পরিয়ে উপুড় করে শুইয়ে রাখা হয়েছে।

খাবারদাবারের বালাই নেই, নেই গোসল, পায়খানা-প্রস্রাবের জন্য বাথরুম ব্যবহারের সুযোগ। ফলে দিনের পর দিন অপরিস্কার-অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় পড়ে আছেন রোগীরা। ইচ্ছা থাকলেও গত ৫ দিন ধরে গোসল করতে পারছেন না আইসিইউ ২ নং বেডে চিকিৎসাধীন সাজ্জাত। তার দাবি, নিয়মিত গোসল, পায়খানা-প্রস্রাবের সুবিধা নিশ্চিত হলে তিনি মানসিকভাবে প্রফুল্ল ও স্বস্তিতে থাকতেন। এজন্য নিজেকে কেবিনে স্থানান্তরের অনুরোধ জানান সাজ্জাত।

অন্যদিকে, দুইজন চিকিৎসক, দুইজন নার্স, দুইজন ওয়ার্ডবয়, দুইজন আয়া শিফটিং করে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকার কথা থাকলেও সরেজমিনে দেখা মিলল নার্স সংগীতা ঘোষ, আয়া অঞ্জলী নন্দী, ওয়ার্ডবয় আকবর ছাড়া আর কেউ নেই দায়িত্বে।

মাত্র তিনজনের পক্ষে ১০ জন আইসিইউ বেডের রোগীকে সেবা দেওয়া খুব কঠিন। ফলে প্রতিনিয়ত সেবাবিঘ্নিত হচ্ছে এখানে। ৪৫ মিনিট অবস্থানকালেই দেখা গেছে, ১ নম্বর বেডের মুমূর্ষু বয়োবৃদ্ধ রোগীটার পরনের কাপড় সরে আছে অনেকক্ষণ ধরে। ৫ নং বেডে চিকিৎসাধীন এক নারীর মুখমণ্ডল থেকে অক্সিজেন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে কখন থেকে কেউ জানে না। ফলে ছটফট করছেন মুমূর্ষু নারীটি। বিষয়টি একুশে পত্রিকার দৃষ্টিগোচর হতেই দৌড়ে যান নার্স সংগীতা। আর কিছুক্ষণ বিলম্ব হলেই হয়তো ঘটে যেতে পারত বড় দুর্ঘটনা।

কাছ থেকে জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটের এসব অব্যবস্থাপনা ও ‘মৃত অবস্থা’ সরেজমিনে দেখা ডা. বিদ্যুত বড়ুয়ার কাছে এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মুমূর্ষু রোগীদের জীবনরক্ষার অপর নামই হচ্ছে আইসিইউ। আইসিইউর যেখানে জীবনই নেই কিংবা মানুষের জীবনরক্ষা বা পর্যবেক্ষণের ব্যারামিটারগুলোই নষ্ট, সেই আইসিইও মানুষের জীবনরক্ষা কীভাবে করবে?

আইসিইউ’র জন্য মানুষ দিকবিদিক ছুটছে। কাজেই আইসিইউ’র রক্ষণাবেক্ষণ, পরিপূর্ণ ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত জরুরি। কারণ আইসিইউ’র রক্ষণাবেক্ষণ মানে মুমূর্ষু মানুষের জীবনের রক্ষণাবেক্ষণ। এ বিষয়ে জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এখনই নজর দেওয়া উচিত বলে মনে করেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার নাথ একুশে পত্রিকাকে বলেন, মনিটরগুলো সচল করার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যারা এগুলো সরবরাহ করেছেন, তাদেরকে চিঠি দিয়েছি। আমাদের মেডিকেলের ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের ঢাকায় যারা আছেন তাদেরকে চিঠি দিয়েছি এবং যোগাযোগ রাখছি। তারা ইতিমধ্যে একবার এসে দেখেও গেছেন। তারা বললেন ঠিক করে দেবেন। আশা করছি দ্রুত সচল করে দেবেন তারা।

সরেজমিন আইসিইউতে গিয়ে নার্স, আয়া ও ওয়ার্ডবয়- ছাড়া আর কাউকে না দেখার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ডা. অসীম কুমার নাথ বলেন, আমাদের এখানে জনবলের সংকট নেই। চিকিৎসক, নার্স সব পর্যাপ্ত আছে। তবে চিকিৎসক আইসিইউ’র ভেতরে থাকেন না, যখন দরকার হয় তখন যান।