মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

ঘর বাঁধার স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি দূর্ঘটনা!

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ৩, ২০১৭, ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ

নজিব চৌধুরী: ওর নাম মালিহা মাধুরী। সবাই মাধুরী নামেই ডাকে। এই নামটির সাথে তাঁর অনেকটাই মিল আছে। মাধুরী দেখতে চাঁদের কণার মত উজ্জ্বল ও ফরসা বর্ণের। খুবই আবেগী। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম তাঁর। মিষ্টি কথায় যেমন অল্পতে হাসাতে পারে, তেমন কাঁদাতেও পারে। খুবই শান্তশিষ্ট এবং সংস্কৃতমনাও। খুব ছোট বেলায় মাধুরীর পিতামাতা না ফেরার দেশে পাড়ি দেয়। মাধুরী যেন চাচ্চু রমিজ উদ্দিন বেপারীর স্বর্গীয় বড় ভাইয়া-ভাবির রেখে যাওয়া আমানত। হাসিখুশিতে চলছিল মাধুরীর সুন্দর জীবন।

মাধুরীকে আদর করে চাঁদনী নামে ডাকেন চাচা রমিজ উদ্দিন বেপারী; তিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী। চট্টগ্রামের কদমতলীতে তাঁর রয়েছে বেশ কয়েকটি কাশ্মীরি ফলের আড়ত। খুবই সহজ-সরল ও সাদাসিধা প্রকৃতির মানুষ। নগরীর কোন এক এলাকায় ভাড়াই বাসায় থাকেন তিনি। বিবি, খুকী আকলিমা আর ভ্রাতুষ্পুত্রী মাধুরীকে নিয়ে তাঁর ছোট্ট সংসার। বাল্যকাল থেকে চাচাত বোন আকলিমা, আর মাধুরী এক সাথেই বড় হয়। দুজনই নাগরীর কোন এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএতে পড়ছে। রমিজ উদ্দিন ভাবছে, দুজনকে পাত্রস্থ করার এটাই উপযুক্ত সময়। চাচ্চুর প্রতি মাধুরীর অগাধ ভালোবাসা। সযত্নের প্রতি নেই তাঁর কোন ধরনের তাচ্ছিল্য। তাই চাচ্চুর ব্যবসার আয়ব্যয়ের হিসাবও মাঝে মধ্যে তাঁকে দেখতে হয়। মাধুরী চাচ্চুর শুধু বড় মেয়ে নয়, মাও বটে। রমিজ উদ্দিন মাধুরীকে মায়ার চোখে দেখত, আর অসন্তোষ মনে ভাবতেন, সমাজে কিছু অমানুষ আছে যারা এই সভ্যতার যুগে এসেও কন্যা সন্তানকে বোঝা মনে করে। মাধুরী দেখতে রঙ, রূপে অনেকটাই আলাদা আকলিমার চেয়ে। তাই চাচি হামেশা মাধুরীকে আড়চোখে দেখত। তারপরও চাচা-চাচী যেন তাঁর মা বাবা।

হঠাৎ বাসায় একদিন সিরাজ মিয়ার আগমন। তিনি রমিজ উদ্দিনের খুব পুরানো বন্ধু। পেশায় একজন ঘটক। বন্ধু রমিজ উদ্দিনের কাছে আসার একটাই কারণ, মেয়ে আকলিমার ব্যাপারে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসা। নিজের মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব শোনে চাচীও খুব খুশি হন। কিন্তু না, সিরাজ মিয়া মাধুরীকে দেখে প্রস্তাবের মোড় ঘুরিয়ে নেন। রমিজ ভাই, বড় মেয়ে মাধুরীর কথা না ভেবে, আকলিমার কথা কেন ভাবছেন? হুম, ওর জন্য ভালো ঘর পাব কোথায়? সময়ের সাথে মানুষের মূল্যও পরিবর্তন হচ্ছে। আপনি কোন চিন্তা করবেননা। আমার কাছে মাধুরীর জন্য ভালো পাত্র আছে। নিশ্চয়ই শিল্পপতি হাকিম সোবহানের নাম শুনেছেন। ঢাকায় তাঁর বিশাল কোম্পানি, চট্টগ্রামও শাখা রয়েছে। তাঁর ছোট ছেলে মাইমুন সোবহানের জন্য পাত্রী দেখছে। ছেলে সবই এমবিএ পাশ করে বের হয়েছে। আর বাবার ফ্যাক্টরিতে ইন্টার্র্নি করছে। বিয়ের পর চট্টগ্রামই শিফট হবে । এখানেও তাঁদের দুটি বাড়ি রয়েছে। রমিজ ভাই!

আপনি যদি সম্মতি দেন, আমি কালকেই মাধুরীর বিয়ের প্রস্তাব সোবহান সাহেবকে পৌঁছে দিবো । হাকিম সোবহানও অবশ্যই সহজ-সরল মানুষ। যদিও শিল্পপতি তেমন কিপটে স্বভাবের না। হাকিম সাহেব ছেলেকে যখন পাণিগ্রহণের কথা বলেছে, তখন মাইমুন আপত্তি করে বলেন, বাবা এত তাড়াতাড়ি বিয়ে কেন? দেখো মাইমুন, তোমার এই বয়সটা বিয়ের উপযোগী। সঠিক সময়ে শুভকাজ সেরে ফেলা ভালো। এতে অনেক উপকারিতা আছে। তোমার বড় ভাই সাইমুনও এই বয়সে বিয়ে করেছে। আর তোমার যদি পছন্দের কেউ থাকে, তাও আমাকে খুলে বলতে পার। আমি মনে করি, কনে তোমার পছন্দ হবে, সিরাজ মিয়া ছবি দিয়ে গেছে। ওর নাম মাধুরী, যদিও ধনী পরিবারের মেয়ে নয়, তবে সুখী পরিবারে তাঁর বেড়ে উঠা। মা-বাবা বেচে নেই। চাচাই তাঁর সব কিছু। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএতে পড়ছে। সপ্তাহ শেষে, শুক্রবার, সবাই মিলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে কনে দেখতে আসেন। মাধুরীকে দেখে সবার পছন্দ হয়েছে। মাইমুনও আর অস্বাভাবিক থাকেনি, মধুরীর সাথে কথোপকথন সেরে নিয়েছে। ওদিনই সবার সম্মতিতে ধুমধাম করে, হাকিম সোবহান মাধুরী-মাইমুনের বাগদাদ করে ফেলেন। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা আর মাত্র দু মাস বাকী । হবু দম্পতীর এক মাত্র যোগাযোগর মাধ্যম সেলফোন। না এখন আরও আপডেট কতকিছু রয়েছে। সেলফোনই তাঁরা সন্তুষ্ট।

ফোনালাপে তাঁদের আবেগ,অনুবেদন আরও বেড়ে যায়। এইভাবে বিবাহের সম্বন্ধটাও আরো মজবুত হয়ে উঠে। বেশ কয়েকবার দেখা করার সুযোগও হয়। এমনকি এক সময়,উভয় পরিবার মিলে বান্দরবন-কক্সবাজারও সফর করে আসেন। স্বর্গীয় প্রেমের শুধু এখন শুভ পরিণয় বাকি। আর দরকার সামাজিক ও শরিয়তি স্বীকৃতি। বাগদানের পর থেকে মাইমুনের নসিব আরও খুলে যায়, যেমন-বাবার কোম্পানিতে পদন্নোতি লাভ করা, আর কোম্পানির কাজে সুইজারল্যান্ডে ভ্রমণ করে আসা। মাইমুন আপাতদৃষ্টিতে ভাবছে, অর্জনের সবই ভাগ্যবতী মাধুরীর জন্য হয়েছে। এখন মাধুরীই তাঁর সব কিছু। এদিকে বিয়ের দিন-তারিখ যত গুনিয়ে আসছে, চাচির খলতা আরও বেড়েই যাচ্ছে। ধনী পরিবারের সাথে সম্বন্ধ চাচী কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা, অর্থাৎ এই বিয়েতে তার তেমন মত নেই। একটাই কারণ মাধুরী তার আপন মেয়েনা। চাচির ভাবনা, রমিজ উদ্দিন যেন মাধুরীর বিয়ের জন্য সব উজাড় করে দিচ্ছেন, মেয়ে আকলিমার বিয়ের কথা রমিজ উদ্দিনের মাথায় নেই। এদিকে হাকিম সোবহানেরও কোন দাবিদাওয়া নেই, তাঁরা শুধু মাধুরীকে চাই। বিয়ে অনুষ্ঠানের আর মাত্র দুদিন বাকী। দুঃখের বিষয়, মেহেদী অনুষ্ঠানে আর মাধুরীর হাত রাঙ্গানো হল না। মেহেদী রাতে যখন বিয়ে বাড়িকে চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জা করা হয়েছে। আর যখন আত্মীয়স্বজনে পুরা বাড়ি ভরপুর। পাড়া -প্রতিবেশীরাও আনন্দ ভাগাভাগি করতে ভুলে নি। এদিকে বিয়ে বাড়ী মানে সবার ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়া। ।

পাড়ার দুষ্টু ছেলের দলও থেমে ছিলনা আলোর উৎসব মাতাতে, আর আতশবাজি ফুটাতে। ঠিক তখনই, আলোর ঝিলিক যেন কাল হয়ে আসলো রমিজ উদ্দিনের বিয়ে বাড়ীতে। হঠাৎ আতশবাজি থেকে ডেকোরেশনের কাপড়ে আগুন লেগে যায়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন সবখানে ছড়িয়ে পড়ে। সাথে সাথে আগুন নিভানোর জন্য সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। হৈ চৈ করে মোটামুটি সবাই বাড়ি থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছে। কিন্তু মাধুরী আর আকলিমা ভিতরে আটকা পড়েন। মাধুরী কে রমিজ উদ্দিন কোন মতে বের করে নিয়ে আসে। তবে আকলিমাকে পাওয়া যাচ্ছিলোনা। সাথে সাথে মাধুরী আগুন উপেক্ষা করে, আদুরে ছোট বোন আকলিমাকে বাঁচাতে বাড়ীর ভিতরে ঢুকে পড়েন। আর কৌশলে আকলিমাকে বাড়ির ভিতর থেকে বের করে নিয়ে আসে। কিন্তু আগুনের আর ধৈর্য্য হল না, মুহূর্তের মধ্যে মাধুরীকে ঘায়েল করে ফেলে। আগুনের শুধু মাধুরীর চেহারাটির প্রতি মায়া হয়েছিল, অর্থাৎ হাসি মাখা চেহারাটি ছাড়া, শরীরের চল্লিশ শতাংশ ঝলসে যায়।

এমন অবস্থায় অঝোরে কান্নার শব্দ, খোদা বুঝি নারাজ হয়ে গেছে। বার্ন ইউনিটের হেড, ডাক্তার বলছেন, রোগীর অবস্থা খুবই মারাত্মক। ত্বকের গভীরতা পর্যন্ত ঝলসে গেছে। প্লাস্টিক সার্জারি ছাড়া ত্বক ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। তাই প্রসাধনী শৈল্য চিকিৎসা করতে হবে, কিন্তু তার আগে মেজর অপারেশন দরকার। আজকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর অপারেশন করাতে হবে। তাই আপনাকে বন্ড পেপারে সই করতে হবে, রমিজ সাহেব। ডাক্তার সাহেব,ওর আজকে বিয়ে, বিয়ে! বর পক্ষকে আসতে না করে দেন। এদিকে রোগী মৃত্যুর সাথে লড়ছে। আর আপনি আছেন বিয়ে নিয়ে। না, সেটা না ডাক্তার সাহেব, বলে, রমিজ উদ্দিন অতি আবেগে বোবার মত কান্না শুরু করে দিয়েছিল। তবে এই করুণ সময়ে চাচি বেশি কান্না করছিল, যে চাচি মাধুরীকে হামেশা আড় চোকে দেখত, নিজের মেয়ে বলে মেনে নিতে পারতোনা। মাধুরী আজ মৃত্যুর সাথে লড়ছে, একমাত্র আকলিমাকে বাঁচাতে গিয়ে। ভালোবাসা কি? চাচী সেটা এখন ভালই বুঝতে পেরেছে। মাধুরী শুধু আকলিমার কথায় জিজ্ঞেস করেছে। আকলিমা ভালো আছে? তাঁর কিছু হয়-নিতো? দেরি না করে, সিরাজ মিয়া বর যাত্রী নিয়ে না আসার জন্য, হাকিম সাহেবকে ফোনে বলে দেন। সাথে সাথে এক্সিডেন্টের কথা শোনে মাইমুনসহ সবাই মাধুরীকে দেখতে হাসপাতালে চলে আসে। রমিজ উদ্দিন যখন বন্ডে সই করার জন্য ফর্মটি হাতে তুলেন। ঠিক তখনই মাইমুন বলে উঠেন,চাচা! আপনি যদি সম্মতি দেন মাধুরীর সাথে আমার বিয়ে এখনই, এই অবস্থায় হবে।

আমি শুধু মাধুরীর একটু সম্মতি নিয়ে আসবো। আর বন্ডে সই আমি নিজেই করবো। রমিজ উদ্দিন মাইমুনের করুণ ভালোবাসা দেখে খুবই অবাক হয়ে যায়। আর হাসপাতালে বিস্ময়কর এমন সত্যিকার প্রেমিক হবু বরের এই অভিনব বিয়ে দেখে, ডাক্তারও খোদ আবেগাপ্লুত হয়ে যায়। আর দেরি না করে, মাধুরীকে ঢাকায় নিয়ে যায়, অপারেশন সফল। মাধুরীকে প্লাস্টিক সার্জারি করা হয়েছে। প্রায় এক মাস হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। দীর্ঘ এক মাস জুড়ে মাধুরীর প্রতি মাইমুনের ভালোবাসার যত্নবান হওয়ার কমতি ছিলনা। তারপরও মাধুরীকে চাই মাইমুন। হাসপাতাল থেকে রিলিজ পাওয়ার এক সপ্তাহ পর, পুনরায় আনুষ্ঠানিকভাবে জাঁকজমকপূর্ণ সাজে মাধুরী-মাইমুনের বিয়ে হয়। বিদায়বেলায় রমিজ উদ্দিন হাকিম সোবহানকে জরিয়ে ধরে কাকুতে সুরে বল ছিল, সত্যিই আপনি অনেক ভাগ্যবান ব্যক্তি, যে মাইমুনের মত ছেলের বাবা হতে পেরেছেন। আমিও মাধুরীকে ঘরের বউ হিসেবে না, মেয়ে হিসেবে নিয়ে যাচ্ছি রমিজ সাহেব। এটাই ছিল হবু বর মাইমুনের করুণ ভালোবাসা মাধুরীর প্রতি, অত:পর শুভ পরিণয়।

(একটি হিন্দি ফিল্ম অবলম্বনে)

লেখক: শিক্ষার্থী, জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম।