বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬

মাদকের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টে নিষেধাজ্ঞা, অসন্তোষ

আইনের চেয়ে ‘সার্কুলার’ বড়!

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৬, ২০১৯, ৫:২৫ অপরাহ্ণ

ফাইল ছবি

শরীফুল রুকন : চট্টগ্রামসহ সারাদেশে মাদকের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট (ভ্রাম্যমাণ আদালত) না চালাতে নির্দেশনা দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা অসন্তোষ প্রকাশ করে বলছেন, আইন না মেনে অযৌক্তিক এই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

মাদকের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট চালানোর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় খুচরা মাদক বিক্রেতা ও সেবনকারীদের আইনের আওতায় আনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

জানা গেছে, গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এ তফসিলভুক্ত হয়নি। এ কারণে গত ১৮ জানুয়ারি থেকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা বন্ধ রাখতে আদেশ জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

উক্ত আদেশের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এরপর আবার মন্ত্রণালয় থেকে একটি আদেশ জারি করে বলা হয়, মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট চালাতে সমস্যা নেই।

সর্বশেষ ২৭ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠানো আরেকটা আদেশে জানানো হয়, পূর্বের আদেশ বাতিল করা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট চলবে না। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এ তফসিলভুক্ত না হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোবাইল কোর্ট আইনে বলা আছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০- অনুযায়ী বিচার করা যাবে। এখন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ হয়েছে। ৯০ এর স্থলে ১৮ হলেও আইনের নাম তো ঠিকই আছে। এখন মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ তফসিলভুক্ত হয়নি বলে ভ্রাম্যমাণ আদালত চালাতে দিচ্ছে না। আবার তফসিলভুক্তও করছে না।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘তফসিলভুক্ত না থাকলে যে মোবাইল কোর্ট করা যাবে না- এটা অগ্রহণযোগ্য যুক্তি। কারণ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, এই আইনে ভিন্নতর যা কিছুই থাকুক না কেন, মাদকদ্রব্য অপরাধসমূহ মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এর অধীন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে বিচার করা যাবে।’

এ বিষয়ে চট্টগ্রামের একটি উপজেলার ইউএনও ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাম প্রকাশ না করার শর্তে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট না চালাতে কোনো নিষেধাজ্ঞার চিঠি আমার কাছে আসেনি। তবে এই তথ্য সত্যি হলে, এটা খুবই দুঃখজনক হবে। সর্বশেষ মাদক আইনে বলা হয়েছে, মোবাইল কোর্ট চালানো যাবে। এখানে তফসিলভুক্ত করা জরুরি নয়। আইনের চেয়ে একটা সার্কুলার বা অফিস আদেশ বড় হতে পারে না।’

এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুই বিভাগে বিভক্ত- জননিরাপত্তা বিভাগ ও সুরক্ষা সেবা বিভাগ। জননিরাপত্তা বিভাগের অধীনে পরিচালিত হয় পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ড, আনসার। অন্যদিকে সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কারাগার, পাসপোর্ট ও ফায়ার সার্ভিস পরিচালিত হয়।

মোবাইল কোর্ট না চালাতে জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে সুরক্ষা সেবা বিভাগের অধীনে থাকা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে; বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। তারা বলছেন, নিয়ম অনুযায়ী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেয় সুরক্ষা সেবা বিভাগ। উক্ত বিভাগে একজন সচিবের নেতৃত্বে কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। সুরক্ষা সেবা বিভাগকে পাশ কাটিয়ে পুলিশের দায়িত্বে থাকা জননিরাপত্তা বিভাগ কেন অতিউৎসাহী হয়ে মাদকের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট বন্ধ রাখতে তৎপর এটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এখন দেখা যাচ্ছে ইয়াবা পাচার ও বিক্রি হচ্ছে শিশুদের ব্যবহার করে। কারণ তাদের ক্ষেত্রে আইন শিথিল। আর খুচরা বিক্রেতারা দুই থেকে পাঁচটি করে ইয়াবা রাখছে পকেটে। এসব বিক্রির পর আবার একই পরিমাণ নিয়ে আসছে। এখন তাদেরকে ধরে একটি-দুটি ইয়াবার জন্য তো থানায় মামলা করা যায় না।’

‘এ ছাড়া সেবনকারীকে ধরতে গেলে দেখা যায় এক মিনিটে সে ইয়াবা সেবন করে ফেলছে। আলামত জব্দ ছাড়া তো কাউকে আমরা ধরতে পারি না। অথচ আইন অনুযায়ী, কেউ যদি নেশার জন্য উদ্যোগও গ্রহণ করে তাদেরকেও আইনের আওতায় আনা যাবে। এখন মোবাইল কোর্ট বন্ধ থাকায় মাদক-সংশ্লিষ্ট এ ধরনের ছোট অপরাধগুলোকে বিচারের আওতায় আনা যাচ্ছে না। এতে মাঠপর্যায়ে মাদক ব্যবহার বেড়ে গেছে।’ যোগ করেন তিনি।

এ সব বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দিতে রাজী হননি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (চট্টগ্রাম মেট্রো) শামীম আহমেদ।

তবে তিনি একুশে পত্রিকাকে জানান, জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে চট্টগ্রামে প্রতিমাসে ৬০ থেকে ৮০টি মোবাইল কোর্ট চালাতেন তারা। এখন মাদকের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট অভিযান চালাতে পারছেন না।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মো. মজিবুর রহমান পাটওয়ারি একুশে পত্রিকাকে বলেন, মাদক শুধু একটা পরিবার না, একটা দেশকে ধ্বংস করে। মাদকের বিরুদ্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে আমরা তৎপর আছি। মাঠপর্যায়ে মাদকের ব্যবহার কমাতে মোবাইল কোর্টের বিকল্প নেই। এ অবস্থায় সর্বশেষ মাদক আইনটি মোবাইল কোর্টের তফসিলভুক্ত করার জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ চলছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বিচার বিভাগ থেকেও মোবাইল কোর্ট নিরুৎসাহিত করা হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নলেজে দেওয়া হয়েছে বিষয়টা। তিনি নিজেই, বিষয়টা দেখবেন বলেছেন। কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে মোবাইল কোর্ট অনেককিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে। হঠাৎ করে এটা বন্ধ করে দিলে অপরাধপ্রবণতা তো বাড়বে।’

একুশে/এসআর/এটি