বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬

চবিতে বিশেষ ব্যবস্থায় সেমিনার করলেন জামায়াতের শীর্ষ নেতা

প্রকাশিতঃ সোমবার, জুলাই ৮, ২০১৯, ৮:৩৭ অপরাহ্ণ


চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ঢাকা মহানগর জামায়াতের আমীর হামিদুর রহমান আযাদকে পিএইচডি দেওয়ার আয়োজন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

এ জন্য গত ২০ জুন সকালে বিশ্ববিদ্যালয় কলা অনুষদভুক্ত ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে হামিদুর রহমান আযাদ বিশেষ ব্যবস্থায় পিএইচডি সেমিনার সম্পন্ন করেছেন। পিএইচডি রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তাকে সেমিনার করার সুযোগ প্রদান করায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

হামিদুর রহমান আযাদ ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধীনে ২০১১ সালে ‘বাংলায় ইসলামী রাজনীতির উৎপত্তি ও বিকাশ’ শীর্ষক পিএইচডি বিষয়ে ভর্তি হন।

গত ১৪ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর মেয়াদ শেষ হয়। মেয়াদ শেষে বিশ্ববিদ্যালয় উপ উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতারকে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব পালন করতে চিঠি দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রায় শতাধিক মামলার আসামী কক্সবাজারের মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনে জামায়াতের সাবেক এই সংসদ সদস্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার করার বিষয়টি জানাজানি হলে বেশ সমালোচনা শুরু হয়। জানা গেছে, প্রফেসর ড. শিরীণ আখতারের এলাকাও কক্সবাজার জেলায়। শিরীণ আখতার চবি ভিসির রুটিন দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগটি কাজে লাগান হামিদুর রহমান আযাদ। একই জেলার বাসিন্দা হওয়ায় শিরীণ আখতারের পরিবারের সঙ্গে আযাদের পারিবারিক সম্পর্ক থাকার কথাও শোনা যাচ্ছে এই ঘটনার পর।

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা জানান, আওয়ামীলীগ সরকার দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্রতিক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের দখল থেকে মুক্ত হয়। এরপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াত-শিবিরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। হলগুলোতে প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলো রাজনীতির সুযোগ পায়।

দীর্ঘদিন পর গত ২০ জুন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কোনো নেতা সেমিনার করার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। এ বিষয়টি ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের পক্ষ থেকে গোপন রাখা হয়। প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের ডিনকেও অবহিত করেনি। এমনকি শতাধিক মামলার আসামী হামিদুর রহমান আযাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের খবর জানে না গোয়েন্দা সংস্থাসহ পুলিশ প্রশাসনও। পরে ১৮ জুন স্বাক্ষর দেখিয়ে নোটিশ বোর্ডে চিঠি ঝুলায় বিভাগ কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, ২০ জুন সকাল ৯টা থেকে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শ্রেণিকক্ষে হামিদুর রহমান আযাদ তার পিএইচডি সেমিনার উপলক্ষে দীর্ঘ সময় বক্তব্য রাখেন। তার পিএইচডি বিষয়ের উপর আলোচনা রাখেন, আরবী বিভাগের প্রফেসর ড. আ.ক.ম আব্দুল কাদের ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসর ও হামিদুর রহমান আযাদের পিএইচডি সুপারভাইজার ড. এ.এফ.এম আমীনুল হক। সেমিনার আহ্বান করেন ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহযোগি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মমতাজ উদ্দিন কাদেরী। এ তিন শিক্ষক জামায়াতে ইসলামীর নীতিনির্ধারক পর্যায়ের শিক্ষক বলে অভিযোগ আছে। সেমিনার চলা অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্ট, শহীদ মিনার, প্রশাসনিক ভবনসহ বিভিন্ন পয়েন্টে শিবিরের নেতাকর্মীরা ছদ্মবেশে অবস্থান নেয় বলেও জানা গেছে।

নিয়ম অনুযায়ী পিএইচডি সেমিনার করার বিষয়টি বিভাগের নোটিশ বোর্ডে আগেই ঘোষণার নিয়ম থাকলেও সেমিনার শেষে নোটিশ ঝুলায় বিভাগ কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে হামিদুর রহমান আযাদের নাম গোপন করা হয় কৌশলে। এ.এইচ.এম হামিদুর রহমান আযাদ নামে তিনি পরিচিত হলেও বিভাগের ঝুলানো নোটিশ বোর্ডে তার নাম দেখানো হয় ‘আবুল হাসানাত মুহাম্মদ হামিদুর রহমান’। অথচ সেমিনারে উপস্থাপিত অভিসন্ধর্ভের (অ্যাবস্ট্রাক্ট) প্রচ্ছদে তার নাম লিখা আছে এ.এইচ.এম হামিদুর রহমান আযাদ।

শুধু তাই নয়; পিএইচডি সেমিনার শেষে ২৩ জুন ছুটিতে চলে যান ওই বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আনেয়ারুল হল খতিবী।
২০ জুন বৃহস্পতিবার হওয়ায় শুক্র ও শনিবার ক্যাম্পাস বন্ধের ফলে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়। প্রায় সাতদিন পর বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক ও ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে জানাজানি হয়। এরপর ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে গিয়ে রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নিয়ম বহির্ভূতভাবে জামায়াতের কেন্দ্রীয় এ নেতাকে পিএইচডি সেমিনার করার সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেন।

এ বিষয়ে চবি ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা একুশে পত্রিকাকে বলেন, শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, ঢাকা মহানগর জামায়াতের আমীর ও চবি শিবিরের সাবেক সভাপতি হামিদুর রহমান আযাদ শতাধিক মামলার আসামী। দেশব্যাপী পেট্রোলবোমা সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ প্রতিষ্ঠার অন্যতম হোতা জামায়াতের এ কেন্দ্রীয় নেতাকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে গোপনে পিএইচডি সেমিনার করতে দিয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ কর্তৃপক্ষ চরম ধৃষ্ঠতা দেখিয়েছে। আমরা এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে। তার পিএইচডি সেমিনার যদি বাতিল করা না হয় তাহলে আমরা আন্দোলন-কর্মসূচি ঘোষণা করবো।

হামিদুর রহমান আযাদের পিএইচডি অভিসন্ধর্ভটিও একুশে পত্রিকার হাতে রয়েছে। এতে বিতর্কিত ইসলামী চিন্তাবিদ আবুল আলা মওদূদীকে উপমহাদেশের ইসলামী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করেন হামিদুর রহমান আযাদ। এছাড়া গোলাম আযমের লিখা ‘ইকামতে দ্বীন’ ও ‘জীবনে যা দেখলাম’ বইকেও এই পিএইচডি অভিসন্ধর্ভের বিভিন্ন স্থানে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে হামিদুর রহমান আযাদের মোবাইলে কল দেওয়া হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।

হামিদুর রহমান আযাদের পিএইচডি সুপারভাইজার ড. এ.এফ.এম আমীনুল হক একুশে পত্রিকাকে বলেন, তিনি (হামিদুর রহমান আযাদ) তো ২০১১ সালের গবেষক ছিলেন। তার রুটিন কাজের মধ্যে একটি সেমিনার বাকি ছিল। এখন তার রুটিন কাজটি হয়ে গেছে।

চবিতে বিশেষ ব্যবস্থায় ঢাকা জামায়াত আমীর হামিদুর রহমান আযাদের সেমিনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগুলোর মধ্যে আমি নাই। এগুলো সম্পর্কে আমি জানি না। একজন গবেষকের সুপারভাইজার হিসেবে.. বিশ্ববিদ্যালয় তাকে গবেষণা করার সুযোগ দিয়েছে, আমি তার রুটিন কাজটা করছি। আর বেশী কিছু আমি জানি না। সে কি করে না করে এগুলো খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন আমি মনে করিনি। আমি সরল-সোজা মানুষ, আমি এসবের ভেতরে নাই।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন প্রগতিশীল শিক্ষক অভিযোগ করেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হঠাৎ করেই সক্রিয় হয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মকর্তা পর্যায়ে চাকরিরত জামায়াত নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাব বিস্তার শুরু করেছে। তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি দখল, সীমানাপ্রাচীর ভাঙচুর, নামফলক ভাঙচুরের অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি আত্মসাতের মামলায় এদের কেউ কেউ বিগত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে বহিস্কার হলেও বর্তমানে তারা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা হামিদুর রহমান আযাদের মত শতাধিক মামলার আসামী বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে অন্যায় সুবিধা নিচ্ছে। এসব বিষয়ে সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তারা।

চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) মহিউদ্দিন মাহমুদ সোহেল একুশে পত্রিকাকে বলেন, ঢাকা জামায়াত আমীর হামিদুর রহমান আযাদ বেশকিছু মামলার আসামী। তার সেমিনারের বিষয়ে চবি কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে আগে থেকে কিছুই জানায়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

জানতে চাইলে চবি ভিসির রুটিন দায়িত্বে থাকা উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার একুশে পত্রিকাকে বলেন, এ ব্যাপারে আমার জানা নেই। আমি তখন ঢাকায় ছিলাম।