বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬

অ্যাক্ট লঙ্ঘন করে চবিতে সহকারী প্রক্টর নিয়োগের হিড়িক!

প্রকাশিতঃ বুধবার, জুলাই ১০, ২০১৯, ১১:৩৫ অপরাহ্ণ


চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতারের বিরুদ্ধে এবার ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রেরিত চিঠি অনুযায়ী তাঁর উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব পালনের কথা। সে অনুযায়ী তিনি সিন্ডিকেট আহ্বান, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, প্রশাসনিক পদে নিয়োগ, জনশক্তির রদবদল, পদোন্নতিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।

কিন্তু এসব নিয়মের তোয়াক্কা না করে প্রফেসর ড. শিরীণ সম্প্রতি নিয়োগ দিয়েছেন চারজন সহকারী প্রক্টর। শুধু তাই নয়; সিন্ডিকেট আহ্বানের এখতেয়ার না থাকলেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি এই সহকারী প্রক্টরদের নিয়োগকে সিন্ডিকেটে রিপোর্ট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট ১৯৭৩ এর পরিপন্থী বলে মনে করছে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, গত ৮ জুলাই রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মরিয়ম ইসলাম লিজা ও লোকপ্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহম্মদ ইয়াকুবকে সহকারী প্রক্টর হিসেবে নিয়োগ দেন প্রফেসর ড. শিরীণ। পরদিনই ৯ জুলাই ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের প্রভাষক মোহাম্মদ রিফাত রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হয় একই পদে। এর আগে ২৬ জুন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রেজাউল করিমকে নিয়োগ দেওয়া হয় সহকারী প্রক্টর হিসেবে।

অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর হিসেবে প্রণব মিত্র, সহকারী প্রক্টর হিসেবে হেলাল উদ্দিন আহম্মদ, নিয়াজ মোরশেদ রিপন, মিজানুর রহমান দায়িত্ব পালন করছেন। ২১ জুন সহকারী প্রক্টর হিসেবে লিটন মিত্রের মেয়াদ শেষ হলে তাকে ওই পদে আর যোগ দিতে দেননি প্রফেসর ড. শিরীণ। পরদিনই তিনি নতুন সহকারী প্রক্টর হিসেবে রেজাউল করিমকে নিয়োগ দেন।

বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট ১৯৭৩ অনুযায়ী পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। এ অ্যাক্ট এর ১৩(৩) ধারা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের জরুরি প্রয়োজনে উপাচার্য নিজ ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন। এই ক্ষমতাবলে উপাচার্য কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকলে তা সিন্ডিকেটে শুধুমাত্র অবহিত করা হয়। যা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সিন্ডিকেটে রিপোর্ট করা’ হিসেবে প্রচলিত। একজন পূর্ণাঙ্গ উপাচার্যকে অ্যাক্ট এই বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করেছে। এ ক্ষমতাবলে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বহিস্কার, নিয়োগসহ যাবতীয় কর্মকান্ড উপাচার্য পরিচালনার বিধান রয়েছে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া চারজন সহকারী প্রক্টরকে নিয়োগ দিয়ে সিন্ডিকেটে রিপোর্ট করতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ (কাউন্সিল) শাখাকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। তাদের সহকারী প্রক্টর হিসেবে নিয়োগপত্রের অনুলিপিতেও বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ কয়েকজন শিক্ষক জানান, উপাচার্যের রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো উপ উপাচার্য প্রশাসনিক কোনো পদে নতুন নিয়োগ দিতে পারেন না। যেখানে রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে উপ উপাচার্য প্রফেসর শিরীণ সিন্ডিকেটই আহ্বান করতে পারেন না, সেখানে তিনি কী করে সিন্ডিকেটের উপর ক্ষমতা চর্চা করতে পারেন তা একটি বড় প্রশ্ন। কারণ ১৯৭৩ এর অ্যাক্ট এর ১৩(৩) ধারার ক্ষমতাবলে উপাচার্যই কেবল জরুরি প্রয়োজনে সিন্ডিকেটের উর্ধ্বে উঠে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন। পরবর্তীতে শুধুমাত্র সিন্ডিকেটে তা উপস্থাপিত হয়। এবং উপাচার্যের এ সিদ্ধান্ত নিয়ে সিন্ডিকেটে কোনো আলোচনারও সুযোগ নেই। সে হিসেবে এই সহকারী প্রক্টরদের নিয়োগ সম্পূর্ণ অবৈধ। এ বিষয়টি আদালতের নজরে আনলে তাদের নিয়োগ বাতিল হয়ে যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক রেজিস্ট্রার জানান, উপাচার্যের রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ উপাচার্যের জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সহকারী প্রক্টর নিয়োগ দেওয়া অবৈধ। যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রক্টর, সহকারী প্রক্টরের পদের মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায় সেক্ষেত্রে প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী উপ উপাচার্য ওই ব্যক্তিদেরই মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। কিন্তু কিছুতেই তিনি নতুন সহকারী প্রক্টর নিয়োগ দিতে পারেন না। এটি আদালতের নজরে আনলে উক্ত সহকারী প্রক্টরদের প্রদেয় বেতন-ভাতা পরবর্তীতে কেটে রাখার সিদ্ধান্তও আসতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট ১৯৭৩ এর ১৩(৩) ধারাতে উল্লেখ রয়েছে, ‘In an emergency arising out of the business of the University and requiring, in the opinion of the Vice-Chancellor immediate action, the Vice-chancellor may take such action as he may deem necessary and shall report for approval of the action so taken to the Authority concerned at the earliest opportunity.

এদিকে সহকারী প্রক্টর পদে নিয়োগ পেয়ে সংবর্ধনা নিতে দেখা গেছে রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মরিয়ম ইসলাম লিজাকে। আবেদনকৃত প্রার্থীদের কারো কারো তুলনায় কম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাকে সদ্য বিদায়ী উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্ষদে দায়িত্ব দিতে কাজ শুরু করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে উপ উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতারের বিরুদ্ধে। জানা গেছে, শুরুতে নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোক্তার আহমেদ চৌধুরীকে সহকারী প্রক্টর হিসেবে নিয়োগ দিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু প্রফেসর শিরীণের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাবেক প্রক্টর সিরাজ উদ দৌলা, লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক খসরুল আলম ও নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রহমান নাছিরের বাঁধার মুখে মোক্তার আহমেদের কপাল পুড়ে যায়। এ নিয়ে মোক্তার আহমেদ চৌধুরী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেন বিভিন্ন মহলে। কারণ উপ উপাচার্য শিরীণ উপাচার্য পদে আসীন হতে রাজনৈতিক নেতাদের কাছে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মোক্তার আহমদকে দিয়ে তদবির করিয়েছিলেন বলেও প্রচার রয়েছে। এরপরও তার ভাগ্যে জোটেনি সহকারী প্রক্টরের পদ।

এদিকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে অ্যাক্ট লঙ্ঘন করে সহকারী প্রক্টর হিসেবে নিয়োগ পেয়ে ‘অস্বস্তি’তে রয়েছেন নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের কেউ কেউ। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী প্রক্টর কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রেজাউল করিম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাকে সহকারী প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ঠিকই। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়া যদি আইনের লঙ্ঘন করে হয় তাহলে আমি পদত্যাগ করতেও রাজি আছি।’

নিয়ম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই সহকারী প্রক্টরদের দায়িত্ব। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী প্রক্টরদের কেউই ক্যাম্পাসের বাসিন্দা নন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সার্বক্ষণিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের ভূমিকা রাখার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সহকারী প্রক্টরদের ক্যাম্পাসে থাকার অলিখিত রীতি রয়েছে। এক্ষেত্রে উপাচার্য ক্যাম্পাসে সার্বক্ষণিক অবস্থান করেন এমন ব্যক্তিদেরই এ পদে নিয়োগে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। বর্তমান উপ উপাচার্য এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেননি।

এর আগে ১৩ জুন উপাচার্যের রুটিন দায়িত্বের চিঠি পেয়ে সেদিন বিকেলেই উপাচার্য হিসেবে যোগদান করে বসেন প্রফেসর শিরীণ। অথচ ১৪ জুন পর্যন্ত উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য ছিলেন। সেদিনই উপাচার্যের জন্য নির্ধারিত পাজেরো জিপটি তিনি ব্যবহারের জন্য নিয়ে নেন। এসব বিষয় নিয়ে বিতর্ক উঠেছে উপ উপাচার্যের প্রফেসর শিরীণের বিরুদ্ধে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য চবি ভিসির রুটিন দায়িত্বে থাকা উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতারের মুঠোফোনে একুশে পত্রিকার পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।