বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩ আশ্বিন ১৪২৬

ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগ পতেঙ্গা থানা পুলিশের বিরুদ্ধে

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, জুলাই ১১, ২০১৯, ১০:৪৩ অপরাহ্ণ

শরীফুল রুকন : ২৫টি ইয়াবা দিয়ে এক ব্যক্তিকে ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা থানা পুলিশের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে।

গ্রেপ্তার মো. আলাউদ্দিনের (৩০) স্ত্রী মুন্নি আক্তার একুশে পত্রিকার কাছে এই অভিযোগ করেছেন।

আলাউদ্দিন দক্ষিণ পতেঙ্গা দক্ষিণপাড়া এলাকার মো. আবদুল লতিফের ছেলে। তিনি গত ৭ বছর ধরে নেভাল রোডের বিমানবন্দর এলাকায় ‘পতেঙ্গা স্টোর’ নামে কাঁকড়া বিক্রির একটি দোকান চালান।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকাল ৯টার দিকে দক্ষিণপাড়া এলাকার নিজ বাড়ি থেকে পায়ে হেঁটে নেভাল বিচে নিজের দোকানে যাচ্ছিলেন আলাউদ্দিন। নেভাল বিচ রোড দিয়ে যাওয়ার পথে তাকে সাদা পোশাক পরিহিত বিমানবন্দর পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই আজগর আলী, এএসআই মোজাফর আলী ও কনস্টেবল মুসা আটক করে। এরপর আলাউদ্দিনকে বিমানবন্দর পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

অন্যদিকে মামলার এজাহারে পুলিশ উল্লেখ করেছে, গত সোমবার (৮ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে দক্ষিণ পতেঙ্গার নেভাল রোডের জিয়ানা স্টোরের সামনে থেকে ২৫টি ইয়াবাসহ আলাউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তবে আলাউদ্দিনের স্ত্রীর দাবি, সোমবার বিকেলে নয়, সকাল সাড়ে ৮টা-৯টার দিকে নিজের দোকানে যাওয়ার সময় তার স্বামীকে পুলিশ আটক করেছে, পরে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যায় এবং ইয়াবা দিয়ে ফাঁসিয়ে দিয়েছে।

একই কথা বলেছেন কথিত ইয়াবা উদ্ধারের মামলার জব্দ তালিকার দুই নম্বর সাক্ষী দক্ষিণ পতেঙ্গা মধ্যমপাড়া এলাকার সোলেমানের ছেলে মো. ইয়াছিন আরাফাত। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, আলাউদ্দিনকে নেভাল রোডের ‘জিয়ানা স্টোর’ নামক দোকানের সামনে থেকে পুলিশ আটক করতে তিনি দেখেননি। আলাউদ্দিনের কাছ থেকে পুলিশ ইয়াবা উদ্ধার করার কথা শুনে তিনি বিস্মিত।

কী পরিমাণ ইয়াবা আলাউদ্দিনের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে- জানতে চাইলে ইয়াছিন আরাফাত বলেন, ‘সেটা তো আমি জানি না। ওরা (পুলিশ) জোর করে সাক্ষী নিয়েছে। সাক্ষী দিতে পুলিশ ভয় দেখাইছে। সাক্ষী না দিলে পুলিশ মারে।’

আলাউদ্দিনের লুঙ্গির ডান পাশের গোছা থেকে কথিত ইয়াবা বের করতে দেখেছেন কিনা- প্রশ্নে ইয়াছিন আরাফাত বলেন, ‘আমি তো কিছু দেখিনি। আমাকে সিগনেচার দিতে বলেছে, আমি সিগনেচার দিয়েছি। আমার নাম-ঠিকানা লিখেছে। ওর (আলাউদ্দিন) থেকে কী পেয়েছে সেটা তো আমি জানি না।’

ইয়াবা দিয়ে আলাউদ্দিনকে ফাঁসানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে ইয়াছিন আরাফাত বলেন, ‘কী হয়েছে আমি জানি না। পুলিশের ভয়ে তো সাক্ষী দেওয়া লাগে। সাক্ষী দিলেও দোষ, না দিলেও দোষ।’

জব্দ তালিকায় সাক্ষীদের স্বাক্ষর গ্রহণ করেছেন পতেঙ্গা থানার এসআই মো. নাছির উদ্দিন। তবে পেশায় ইজিবাইক (টমটম) চালক ইয়াছিন আরাফাত বলেন, ‘এএসআই আজগরের (বিমানবন্দর পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত) কথামতো আমি সাক্ষী হয়েছি। এর আগেও অনেকবার আমাকে জব্দ তালিকায় সাক্ষী করেছে পুলিশ।’ এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে চাইলে প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে মোবাইলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।

এদিকে জব্দ তালিকায় উল্লেখ করা অপর সাক্ষী দক্ষিণ পতেঙ্গার ডুরিয়া পাড়ার জাহাঙ্গীরের ছেলে মো. নুর কাইয়ুমের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

আলাউদ্দিনের স্ত্রী মুন্নি আক্তার একুশে পত্রিকার কাছে অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার স্বামীকে আটকের পর বিমানবন্দর পুলিশ ফাঁড়ি থেকে আমাকে ফোন করা হয়। এরপর আমি ফাঁড়িতে যাই। সেখানে এএসআই আজগর আলী আমার স্বামীকে মুক্তি দেয়ার জন্য এক লাখ টাকা দাবি করেন। আমি তাদের হাতে পায়ে ধরে বলেছি, ‘ও তো কোনো অপরাধ করেনি। কেন টাকা দেবো। আমরা গরীব মানুষ এত টাকা কীভাবে দেবো? কিছুক্ষণ পর এএসআই আজগর আমাকে বলেন, আপনার স্বামীকে আমরা পতেঙ্গা থানায় পাঠিয়ে দিচ্ছি। সেখানে টাকা দিলে ছেড়ে দেবে।’

মুন্নি আক্তার বলেন, ‘এরপর আমি পতেঙ্গা থানায় গেলাম। এক অফিসারের সাথে কথা বলি। আমার স্বামীকে ছেড়ে দিতে তিনি এক লাখ টাকা দাবি করেন। পরে আমি বলি, ৫০ হাজার দেবো, আমার স্বামীকে ছেড়ে দিন। এরপর আমাকে অপেক্ষা করতে বললেন। বিকেল ৫টার দিকে আমি আমার কয়েকজন আত্মীয় থেকে ৫০ হাজার টাকা যোগাড় করে নিয়ে আসি। অফিসার আমার থেকে একটা সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে ৫০ হাজার টাকা গুনে নেয়। এরপর আমাকে অপেক্ষা করতে বলেন।’

তিনি বলেন, ‘আধা ঘন্টা অপেক্ষা করার পর অফিসার আমাকে টাকা ফেরত দিয়ে বলেন, ঘটনা জানাজানি হয়ে গেছে। আসামিকে ছাড়া যাবে না, মামলা হবে। আসামিকে না ছাড়তে ওসি সাহেব নির্দেশ দিয়েছেন।’

মুন্নি আক্তার বলেন, ‘এরপর অফিসার আমার স্বামীর জব্দকৃত মোবাইল ফোন ফিরিয়ে দেন। কিন্তু আমার স্বামীর পকেট থেকে উদ্ধার করা ৬ হাজার টাকা ফিরিয়ে দেননি। আমার স্বামীকে রিমান্ডে নেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকাগুলো রেখে দেন।’

এএসআই মোজাফর আলী, এএসআই আজগর আলী এবং কনস্টেবল মুসার যোগসাজসে আলাউদ্দিনকে ফাঁসিয়ে দেওরার ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগ করেছেন আলাউদ্দিনের স্ত্রী মুন্নী। তবে অভিযানে এএসআই আজগরের অংশ নেয়ার বিষয়ে মামলার এজাহারে কোন বর্ননা নেই।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য বিমানবন্দর পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই আজগর আলীর মুঠোফোনে বৃহস্পতিবার রাতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়, প্রতিবারই নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মামলার বাদী পতেঙ্গা থানার এএসআই মোজাফর আলী একুশে পত্রিকাকে বলেন, আলাউদ্দিনকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর প্রশ্নই উঠে না। সে ইয়াবা ব্যবসা করে। তার ভাইয়ের বিরুদ্ধেও মাদকের মামলা আছে মনে হয়।

এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য পতেঙ্গা থানার ওসি উৎপল বড়ুয়ার সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন এএসআই মোজাফর আলী।

ঘটনার বিষয়ে পতেঙ্গা থানার ওসি উৎপল বড়ুয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, আলাউদ্দিন মাদক ব্যবসায়ী। তাকে ইয়াবাসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জব্দ তালিকার সাক্ষীরা প্রভাবিত হয়ে অনেক সময় মিথ্যা তথ্য দেয়। এতে অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যায়। আলাউদ্দিনকে ইয়াবাসহ আটকের ঘটনা সত্য নাকি মিথ্যা সেটা আদালতে প্রমাণ হবে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (বন্দর) মো. হামিদুল আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমি অনেক আগে থেকেই বলে রেখেছি, নিরীহ কাউকে যেন মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা না হয়। এ ধরনের অপরাধ করলে পুলিশ সদস্যদের শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। আলাউদ্দিনের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।