বুধবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ৮ কার্তিক ১৪২৬

কিশোর গ্যাং : প্রজন্মের অপচয়

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, জুলাই ১২, ২০১৯, ৭:২৪ অপরাহ্ণ

মোস্তফা ইউসুফ : প্রতিদিনকার অভ্যাসের মত কাজীর দেউড়ি রাইফা চত্বরে সহকর্মী দৈনিক সমকালের আবদুল্লাহ আল মামুনসহ চা খাচ্ছি। হঠাৎ একটা হইচই। “ভাই, এইবার মরছে। এইবার মরছে“।

মামুন লক্ষ করল, একদল কিশোর একটি চড়ুইপাখি পাথর ছুড়ে হত্যা করে উল্লাস করছে। আমাকে বলার সাথে সাথে দৌড়ে গেলাম। ছোট্ট চড়ুইটার নিথর দেহটা থেকে মাথা আলাদা করে ফেলেছে এক কিশোর। সেটাই আবার বীরদর্পে দেখাচ্ছে তার প্রতিদ্বন্দীকে।

বললাম, এ কী করছ তোমরা। এভাবে পাখি মেরে ফেলছ কেনো?

‘আমরা তো সব মারি। কুকুর, পাখি যা পাই। নেতা বলছে এসব মেরে প্র্যাকটিস করতে“, ঔদ্ধত্যভরা চাহনিতে জবাব দিল হালকাপাতলা গড়নের এক কিশোর।

বিস্ময়ে হতবাক হলাম এটা ভেবে যে, কিশোরটার এ বয়সে রক্ত দেখলে ভড়কে যাওয়ার কথা, সে কিশোরটা নৃশংসতার তালিম নিচ্ছে। নৃশংস হওয়ার রশদ কে জোগায়? নিশ্চয় আমাদের এ সমাজ-রাজনীতি।

আমাদের রাজনীতির যে হানাহানি, প্রতিহিংসাপরায়ণতা তার প্রভাবে সমাজদেহে প্রবেশ করছে এ নৃশংসতা। রাজনীতির যে স্থানিক বৃত্ত তার মধ্যেই জন্ম নেয় এ কিশোর গ্যাং। সে বৃত্তের টানে কিশোরেরা পথ হারিয়ে হয়ে উঠে বেপরোয়া দুর্বৃত্ত।

এলাকার বড় ভাইয়ের যে প্রভাব-প্রতিপত্তি তার বলে বলিয়ান হযে এ কিশোররা দল বেঁধে ইভটিজিং করছে, কেউ কেউ সাহস করে তো ধর্ষণের মত ঘটনা ঘটাচ্ছে। যে প্রজন্মের হওয়ার কথা এ সমাজের চালিকাশক্তি সে প্রজন্মের কাছেই অনিরাপদ হয়ে পড়ছে সমাজ নিজেই।

আফ্রিকায় গৃহযুদ্ধে যেমন শিশুদের রিক্রুট করা হয় যুদ্ধে, প্রশিক্ষণ দেয়া হয় হত্যার কলাকৌশল, ঠিক একইভাবে আমাদের কিশোররাও ‘বড় ভাইদের‘ কল্যাণে দক্ষতার উন্নয়ন ঘটাচ্ছে এসব কাজে। এ বড় ভাইয়েরা ফাঁদ পেতে টেনে নিচ্ছে এ কিশোরদের। রাষ্ট্র কি আসলেই কোনো সুযোগ রেখেছে এ কিশোরদের স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করতে? উত্তরটা সবারই জানা।

কিশোর অপরাধকে একটা রাষ্ট্রের অন্যান্য বিষয় থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই সে কারণে। গত কয়েক দশকে শহরে-গ্রামে মাঠের সংখ্যা কমেছে, কমেছে বিহঙ্গের মত অবাধ বিচরণের সুযোগ। বদ্ধাবস্থায় যেমন জন্ম নেয় মশা, ঠিক তেমনি বদ্ধসমাজ জন্ম দেয় এ কিশোর গ্যাংয়ের।

সমাজ-পরিবারকে তো অবশ্যই সচেতন হতে হবে। তার পাশাপাশি পরিবর্তন আনতে হবে সে রাজনীতিতে, যা আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। বাড়াতে হবে মাঠের সংখ্যা। পাড়ায়-মহল্লায় বাড়াতে হবে গান, কবিতা, বিতর্কের চর্চা। কৈশোর ও তারুণ্যের যে বাঁধভাঙ্গা শক্তি সেটার স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করতে। অন্যথায় হবে একটি প্রজন্মের নিদারুণ অপচয়।

একুশে/এমইউ/এটি

লেখক : স্টাফ করসপনডেন্ট, ডেইলি স্টার