সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ৬ কার্তিক ১৪২৬

মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর ‘গুজব’ ঠেকিয়েছিলেন ডা. শাহাদাত

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, আগস্ট ৮, ২০১৯, ৮:৩০ অপরাহ্ণ

হিমাদ্রী রাহা : ‘শুধু খালেদা জিয়া নয়, এক-এগারোর সময় দলীয় পরিচয়ের উর্ধ্বে উঠে দুই নেত্রী খালেদা-হাসিনার মুক্তির দাবিতে মুখে কালো কাপড় বেঁধে রাজপথে আন্দোলন করেছি। মানববন্ধন করেছি।’

সম্প্রতি একুশে পত্রিকার কাছে এই দাবি করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন।

তিনি বলেন, অসুস্থ এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে বান্দরবান কারাগার থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ে। বলা হয়, মহিউদ্দিন চৌধুরী বেঁচে নেই। তখন আমিই গুজবের ডালপালা রোধে তাৎক্ষণিক ভূমিকা রাখি। আপনারা জানেন, রাজনীতির বাইরে আমি একজন চিকিৎসক। তখন চিকিৎসকের অ্যাপ্রোন পরে চমেক হাসপাতালের ১২ নং ওয়ার্ডে প্রবেশ করি। সেখানে দেখি মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী হাসিনা মহিউদ্দিন বসে আছেন। মহিউদ্দিন চৌধুরী চোখ মেলে আমার দিকে তাকাচ্ছেন। আমার কুশল জিজ্ঞেস করেন। এরপর দ্রুত বাইরে এসে আওয়ামী লীগের উদ্বিগ্ন নেতাদের মহিউদ্দিন চৌধুরী বেঁচে থাকার সংবাদ দিই।

‘এসময় মেডিকেলের বাইরে অপেক্ষমাণ দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমানকে সাদা অ্যাপ্রোন পরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করাই ও মহিউদ্দিন চৌধুরীর সাথে দেখা করিয়ে দিই। এরপর গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন সেখানেই আমার পিছু নিলে আমি কৌশলে সরে পড়ি। গ্রেফতার-আতঙ্ক ও মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে দলীয় রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে আমি এসব করেছি। আজকের দিনে এসব রাজনৈতিক শিষ্টাচার কোথায়?’ প্রশ্ন তোলেন শাহাদাত।

বিএনপির প্রতি নির্যাতনের প্রসঙ্গ টেনে ডা. শাহাদাত বলেন, বিএনপির বিরুদ্ধে বর্তমানে এক লক্ষ মামলা ও ২৬ লক্ষ আসামী। তারপরও এই দলটি হিমালয়ের মতো এখনো দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে আমাদের নেতাকর্মীরা প্রতিনিয়ত জেলে যাচ্ছে, তাদের প্রতিনিয়ত আদালতে হাজিরা দিতে যেতে হয়। আমি নিজেও ৫০টি মামলার আসামি হয়ে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। এভাবে প্রতিটি নেতাকর্মী কোনো না কোনোভাবে মামলা-হামলার শিকার।

এরমধ্যেও সম্প্রতি (২০ জুলাই) আমরা সাংগঠনিকভাবে বিশাল সমাবেশ করেছি। যেখানে আমাদের কোনো জায়গা দেয়া হচ্ছে না,আমাদের ২৭টি শর্ত দিয়ে সমাবেশ করতে বলা হয়েছে। মঞ্চ কখনো ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে, কখনো কেটে ফেলছে। এইযে এতো প্রতিকূলতা, তার মাঝেও আমরা সমাবেশ সফল করেছি। আমাদের সাংগঠনিক ভিত্তি যদি মজবুত না থাকতো তা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না। শুধু চট্টগ্রামেই নয়, সারা বাংলাদেশেই আমাদের সাংগঠনিক ভিত্তি অনেক শক্তিশালী।

দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাসের কথা উল্লেখ করে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, দেশের রাজনীতি একটা জঘন্যতম সময় পার করছে। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো বিনাবিচারে আমাদের নেত্রীকে কারাবন্দী করে রাখা। আমরা এরশাদ সরকারের স্বৈরাচারী আমল দেখেছি, মঈন উদ্দিন-ফখরুদ্দিনের আমলও দেখেছি। কিন্তু এখন যেভাবে নিষ্পেশন চলছে, বলতে গেলে কোনো স্পেস তো পাওয়াই যাচ্ছে না। আমার নেত্রী তিন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। অথচ উনাকে অন্যায়ভাবে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে কারাবন্দী করে রাখা হয়েছে। এটা তো গণতন্ত্র না। এটা তো অন্যায় শাসনতন্ত্র।

দেশে বাকস্বাধীনতা না থাকার অভিযোগ করে শাহাদাত বলেন, দেখুন দেশে কোনো গণতন্ত্র নেই, বাকস্বাধীনতা নেই। আপনারা যারা সাংবাদিক আছেন তারাই ভেবে দেখুন, এই যে সম্প্রচার নীতিমালা আইন করলো সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে, আবার দেখুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করলো। যেখানে আইসিটি অ্যাক্টের চারটি ধারাকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কাজেই এসব আইন দিয়ে সবার মুখ বন্ধ করে ফেলা হয়েছে। আপনারা আজকে সত্য কথা ঠিকমতো লিখতে পারছেন না।

৩০ ডিসেম্বরের পরিবর্তে যে ২৯ ডিসেম্বর ভোট হয়ে গেলো তা সবাই আমরা জানি। অথচ আমরা কিছুই করতে পারছি না। আমি নির্বাচন করবো,আমাকে গ্রেফতার করে ফেললো কোন কারণ ছাড়াই। কতগুলো গায়েবি মামলায় আমাকে গ্রেফতার দেখানো হলো। নির্বাচনের দুই মাস আগে গ্রেফতার করে নির্বাচনের একমাস পর ছেড়ে দিলো। আর সেসময় আমার এক হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হলো। তাদেরকেও নানাভাবে হয়রানির মধ্য দিয়ে ছাড়া হলো। এই যে একটা দম বন্ধ করা পরিস্থিতি, নির্বাচনের নামে নির্যাতন এই কথাগুলো কিন্তু আমরা ঠিকমতো বলতে পারছি না। এমন অগণতান্ত্রিক পরিবেশ যেখানে প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে, আইনের শাসনের চরম দুরাবস্থা, ন্যায়বিচার ক্রমান্বয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে, সামাজিক নিরাপত্তাই নেই যেখানে সেখানে কীভাবে গণতন্ত্র টিকে থাকবে? প্রশ্ন রাখেন এই বিএনপি নেতা।

রাজনীতিতে উড়ে এসেছেন এমন অপপ্রচারেরও জবাব দেন ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, আমি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি ছিলাম, ড্যাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলাম, ড্যাবের পর বিএমএ’এর সাংগঠনিক সম্পাদক হলাম, সাধারণ সম্পাদক হলাম। এরপর ২০০৭-৮ সালে বিএমএ’এর ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হলাম। এতো গেলো পেশাজীবী রাজনীতির দিক।

রাজনৈতিক জীবনে আমি বাকলিয়া ওয়ার্ড বিএনপির কার্যকরী সদস্য ছিলাম। তারপর বৃহত্তম চান্দগাঁও থানার সাধারণ সম্পাদক হই। পরে ১৯৯৪ সালে মহানগর বিএনপি যে খসড়া কমিটি, সে কমিটির যুগ্ম আহবায়ক করলো। এরপর ২০০১ সালে বাকলিয়া থানার সদস্য সচিব হই। ২০০৩ সালে পূর্ণাঙ্গ কমিটি যখন করা হলো তখন আমি বাকলিয়া ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক হই। এরপর ২০০৫ ৎসালে আমি একই ওয়ার্ডের সভাপতি হই। এরপর নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে সভাপতি। তিন দশকের রাজনৈতিক পথচলা আমার।

রাজনীতির পাশাপাশি চিকিৎসা পেশাকেও সেবার ব্রত হিসেবে নিয়েছেন জানিয়ে ফিজিক্যাল মেডিসিনের নামকরা এ চিকিৎসক বলেন, রাজনীতির মাধ্যমে যেমন দেশের সেবা করা যায়, তেমনি চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে মানুষের সেবা করা যায়। চিকিৎসক হিসেবে যদি দেশের শতকরা দশ শতাংশ মানুষ যদি চিনে থাকে তবে রাজনীতিবিদ হিসেবে শতকরা ৭০-৮০ ভাগ মানুষ আমাকে চিনে। এটাই আমার প্রাপ্তি।

একুশে/এইচআর/এটি