মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

দক্ষিণ কোরিয়া-বাংলাদেশের সম্পর্ক ও সম্ভাবনা

প্রকাশিতঃ শনিবার, আগস্ট ১০, ২০১৯, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ

মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী : দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের একটি বন্ধুপ্রতীম দেশ। এ বন্ধুত্বের সূচনা আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই। দক্ষিণ কোরিয়ার কৃষ্টি, আচার-আচরণ, মূল্যবোধ, সংস্কৃতিচর্চা অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের সাথে মিল।

এ দুটো দেশই যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এমনকি ভাষার স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রেও এ দুটো দেশের মিল রয়েছে। বিশ্বের ১১তম এবং এশিয়ার ৪র্থতম অর্থনীতির দেশ কোরিয়ার সাথে বাংলাদেশের দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক যে প্রধান দিকগুলো রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- রাজনৈতিক, ব্যবসা, বিনিয়োগ, বাংলাদেশী শ্রমশক্তির নিয়োগ, সাংস্কৃতিক বিনিময়, উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে সম্পর্ক, কারিগরী ও প্রযুক্তিসহায়তা প্রদান ইত্যাদি।

বাংলাদেশের শ্রমশক্তি রপ্তানি ও ব্যবসা-বিনিয়োগের আজকের যে অবস্থান তার পেছনেও কোরিয়ান সরকার ও জনগণের একটি প্রশংসনীয় ভূমিকা ছিল এবং এখনও রয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান রপ্তানি খাতের মূল স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত গার্মেন্টস খাতের প্রথম দিকে বিদেশী সহায়তা এসেছিল কোরিয়া থেকে এবং এর হাত ধরেই ধীরে ধীরে এ খাত তার বর্তমান সুসংহত অবস্থানে পৌঁছছে। অন্যদিকে ষাট-এর দশকে কোরীয় যুদ্ধের অবসানের পর থেকে কোরিয়ায় উন্নয়ন অভিমুখী যে যাত্রা শুরু হয়েছিল তাতে আমাদের দক্ষ-আধাদক্ষ শ্রমিকরা তাদের ঘামঝড়ানো শ্রম দিয়ে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল এবং যা এখনও অব্যাহত আছে। ‘৭০ দশকের শেষ দিক থেকে শুরু করে এ শতাব্দীর প্রথম শতকের শুরুতেও বিভিন্ন মাধ্যমে বাংলাদেশী শ্রমিকরা কাজ করতে দক্ষিণ কোরিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন।

এ শতাব্দীর শুরুতে ২০০৮ হতে দক্ষিণ কোরিয়া ১৬টি দেশের সাথে Employment Permit System (EPS) কার্যক্রমের আওতায় সরকারিভাবে (জিটুজি) ভিত্তিতে প্রতিবছর কোটা শ্রমিক নিয়োগ করছে। এ পদ্ধতিতে এবং পূর্বের গমনকৃত শ্রমিক মিলে এ সংখ্যা বর্তমানে কমবেশি ১২ হাজারের মতো।

দক্ষিণ কোরিয়ায় EPS কর্মসূচির আওতায় গমনকৃত শ্রমিকদের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় খুবই আকর্ষণীয়। প্রথমটি হচ্ছে, বেতনকাঠামো, যা বর্তমান সময়ে অন্য যেসব দেশে বাংলাদেশী শ্রমিকরা যাচ্ছেন তাদের তুলনায় অনেক বেশী এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে সফল কর্মজীবন শেষে কর্মরত শ্রমিকদের শর্ত সাপেক্ষে কোরিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ।

উপরন্তু কোরিয়ায় কর্মজীবন শেষ করে বাংলাদেশে গমনইচ্ছুক শ্রমিকদের দেশে ফিরে উদ্যোক্তা হিসেবে ভূমিকা রাখার বিশেষ সুযোগও তৈরি হয়েছে। কেননা একদিকে দেশে ফেরত শ্রমিকদের হাতে যেমন বেশ ভাল পরিমাণেরর অর্থ জমা থাকে, পাশাপাশি তাঁর থাকে উন্নত দক্ষিণ কোরিয়ার আধুনিক প্রযুক্তিগত জ্ঞান।

এ দুটোকে একত্র করে ফেরত আসা শ্রমিকদের সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠার ও সফল হবার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। আশার কথা হলো, সংখ্যায় বেশী না হলেও কোরিয়ায় কর্মরত অনেকের মধ্যে এ সম্ভাবনা ইতোমধ্যে আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে এবং অনেকে নতুন নতুন উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসছেন।

কোরিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশীদের অনেকে ইতিমধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোনিবেশ করছেন এবং কোরিয় ব্যবসায়ীদের সাথে নিয়ে আমদানি-রপ্তানি ভিত্তিক কার্যক্রমে জড়িত হয়েছেন।

কোরিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের কর্মজীবন শেষে দেশে ফিরে উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার লক্ষ্যে ধারণা দেয়া, প্রয়োজনীয় তথ্যাদি প্রদানসহ নিয়মিতভাবে সেমিনার আয়োজন করে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে এবং বৈধভাবে রেমিটেন্স প্রেরণের অনুরোধ করে যাচ্ছে।

দীর্ঘদিন প্রবাসে সময় কাটিয়ে বাংলাদেশে ফেরত যাওয়ার ক্ষেত্রে শ্রমিক ভাইদের মনে যে জড়তা, ভীতি, তথ্যের অভাব তা কাটিয়ে উঠতে এ সেমিনার বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

দূতাবাস কর্তৃক কোরিয়ার বিভিন্ন শহর, প্রদেশে চেম্বার্স অব কমার্সগুলোতে সেমিনার আয়োজন করে ব্যবসা-বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশী-বিদেশী ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাংলাদেশে ব্যবসা-বিনিয়োগ ক্ষেত্রে বিরাজমান সুযোগ সুবিধাগুলো উপস্থাপনের যে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে তাও বেশ আগ্রহের জন্ম দিয়েছে।

কোরিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশী কমিউনিটিকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার এসব প্রয়াসের ফলাফলও ইতোমধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে। বিগত দুই অর্থবছরে বাংলাদেশ হতে পণ্যরপ্তানি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশী অর্জিত হয়েছে।

উল্লেখ্য যে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশী পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৫৪ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এসে দাঁড়িয়েছে ৩৭০ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

একই সাথে ২০১৭-১৮ অর্থবছর হতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দক্ষিণ কোরিয়া হতে বৈধ পথে রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাংলাদেশে প্রেরিত রেমিটেন্স পরিমাণ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছিল ৯৬ দশমিক ২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১২১ দশমিক ৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে বিরাজমান দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ককে আরো জোরদার করার ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বাংলাদেশে সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।

তাঁর এ সফরকালে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ক ও সহায়তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে যেসব সমঝোতাস্মারক সাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে এবং এ দুদেশের মধ্যে একটি সরাসরি ফ্লাইট চালুর ব্যবস্থা করা গেলে দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ক একটি নতুন মাত্রা পাবে বলে নিশ্চিতভাবেই ধারণা করা যায়।

মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী : কাউন্সেলর, বাংলাদেশ দূতাবাস, সিউল