শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

বিশ্বকাপ ক্রিকেটের এ টু জেড

প্রকাশিতঃ বুধবার, আগস্ট ১৪, ২০১৯, ৭:৩০ অপরাহ্ণ


বাসস : ওয়ানডে বিশ্বকাপের দ্বাদশ আসর শেষ হয়েছে আজ থেকে ঠিক এক মাস আগে। গত ১৪ জুলাই লর্ডসে অনুষ্ঠিত হলো ২০১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনাল। তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপ শিরোপা জয় কওে ক্রিকেট জন্মদানকারী ইংল্যান্ড।
ইংল্যান্ড এন্ড ওয়েলসে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ ক্রিকেট বিশ্ব্কাপে অংশ নেয়া দশটি দল দেড় মাসব্যপী এ টুর্নামেন্টে মোট ৪৮টি ম্যাচ খেলেছে।
ইংরেজী বর্ণমালার ২৬টি অক্ষর দিয়ে আমরা এবার টুর্নামেন্ট স্মরণ করব। প্রথমে আমরা টুর্নামেন্টের প্রথম, হাই-লো, হিরো থেকে জিরো এবং ২০১৯ বিশ্বকাপের ভাল-মন্দ নিয়ে আলোচনা করব।
এ-এন্টি করাপশন ইউনিট: বিশ্বকাপ চলাকালে যে কোন ধরনের অপতৎপরতা রুখতে আইসিসি প্রথমবার অংশ গ্রহণকারী দলগুলোর সঙ্গে একজন করে দূর্নীতি বিরোধী কর্মকর্তা নিয়োগ করেছে। দুর্নীতি বিরোধী কর্মকর্তা দলগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত থাকতেন। দলগুলোর অনুশীলন ম্যাচ থেকে টুর্নামেন্টের শেষ পর্যন্ত পুরোটা সময় তার দায়িত্বছিল নির্দিষ্ট দলকে অনুসরণ করা। লক্ষ্য ছিল অনৈতিক কিছু ঘটলে তা থেকে বিরত রাখা কিংবা আইসিসিকে জানানো। নির্দিস্ট কম্যকর্তা টিম হোটেলে অবস্থান করেছেন এবং অনুশীলন শেসনে যাওয়ার সমও তিনি দলের সঙ্গে যেতেন।
বি-ব্যানার : বিশ্বকাপ চলাকালে বিভিন্ন স্টেডিয়ামের ওপর দিয়ে বিতর্কিত বার্তা লেখা ব্যানার নিয়ে আকাশে বিমান উড়তে দেখা গেছে। যার প্রেক্ষিতে আইসিসি কর্তৃপক্ষ যুক্তরাজ্য সরকারকে ওল্ড ট্রাফোর্ড স্টেডিয়ামকে ‘নো ফ্লাই জোন’ করতে অনুরোধে বাধ্য হয়েছে।
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের একটি ম্যাচে ‘জাস্টিস ফর বেলুচিস্তান’ লেখা ব্যানার বহনকারী একটি বিমান স্টেডিয়ামের ওপড় দিয়ে কয়েকবার চক্কর দেয়ায় ভুরাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। যে কারণে পাকিস্তান- আফগানিস্তান সমর্থকদের সংঘর্ষ পর্যন্ত হয়েছে।
একই ঘটনা ঘটেছে ভারত ও শ্রীলংকার মধ্যকার ম্যাচে। লীডসের হেডিংলিতে এ দুই দলের ম্যাচ চলাকালে ভিন্ন তিনটি ব্যানারে বিতর্কিত বার্তা লিখে স্টেডিয়ামের ওপর বিমান উড়তে দেখা গেছে। পরক্ষণেই বিসিসিআই আইসিসি’র কাছে একটি অভিযোগ দাখিল করে। পরে এ ঘটনায় আইসিসি দু:খ প্রকাশ করে বলে, ‘এ ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে আমরা অত্যন্ত হতাশ।’
সি-ক্যাচ : বিশ্বকাপে বেশ কিছু অসাধারণ ক্যাচ দেখাগেছে। ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে বেন স্টোকস অসাধারণ একটা ক্যাচ নেন। পরবর্তীতে নাসের হোসেন যেটিকে সর্বকালের সেরা ক্যাচের একটি হিসেবে অভিহিত করেছেন। এরপর ফাইনালে লোকি ফার্গুসনের দর্শনীয় একটি ক্যাচকে ইয়ান স্মিথ ‘স্পেক্টেকুলার’ হিসেবে অভিহিত করেন। এ দুটি ছাড়াও ক্রিস ওকস, কুইন্টন ডি কক, শেলডন কট্রেল, রবীন্দ্র জাদেজা, মার্টিন গাপটিল, সরফরাজ আহমেদ, এমএস ধোনি এবং স্টিভ স্মিথের কিছু দর্শনীয় ক্যাচ দেখাগেছে।
ডি-ডিআরএস: অন ফিল্ড আম্পয়ারদের কিছু ভুলের কারণে ধারাবাহিকভাবেই ডিসিশন রিভিউ সিস্টেমের দেখা মিলেছে। গ্রুপ পর্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার জয় পাওয়া ম্যাচে বাজে আম্পারিংয়ের কারণে এটা ঘেেটছে। দুই সেমি-ফাইনাল ও ফাইনালেও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে ডিআরএস দেখা গেছে। দুর্বল আম্পয়ারিংয়ের কারণে খেলায় ডিআরএস’র গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।
ই-ইংল্যান্ড: ১৯৭৫ সালের ৭ জুন বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ইংল্যান্ড ও ভারতের মধ্যে। ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই ইংল্যান্ড প্রথমবার বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে নেয়। ৪৪ বছর এবং ৮৩ বিশ্বকাপ ম্যাচ শেষে ক্রিকেটের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ট্রফিটির স্বাদ পায় খেলাটির আবিষ্কারকরা। অনেকের মতে ইয়োইন মরগানের ‘আইরিশ সৌভাগ্যে নির্দিস্ট লক্ষ্যে পৌছে ইংল্যান্ড। তবে জো রুট ৫৫৬ রান করার পাশাপাশিনিয়েছেন ১৩ ক্যাচ। জোফরা আর্চার শিকার করেছেন ২০ উইকেট। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ২২টি ছক্কা হাঁকিয়েছেন মরগান।
এফ-ফাইনাল: প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন শিরোপা জয় করেছে ইংল্যান্ড। ২০১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালটি ছিল ৪১৯২ তম ওয়ানডে ম্যাচ। যার মধ্যে শুধুমাত্র ৩৮টি ম্যাচ টাই হয়েছে। টাই হওয়া ওই ম্যাচগুলোর মধ্যে ৫টিই ছিল বিশ্বকাপে। তন্মধ্যে ২০১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালটিই হচ্ছে একমাত্র ম্যাচ যেখানে জয় পরাজয় নির্ধারণের জন্য সুপার ওভারে খেলা হয়েছে। এমনকি সুপার ওভারের খেলাও টাই হয়েছে। ক্রিকেটিং দৃষ্টিকোন থেকে সেখানে যত ধরনের রোমাঞ্চের দরকার তার সবই ঘটেছে এই আসরে। সংখ্যার দিক থেকে হাফ সেঞ্চুরি, উইকেট, ক্যাচ, ইয়র্কার, বাউন্সার, মিসফিল্ডিং, রান-আউট, আম্পায়ারিং, ছক্কা, টাই, সুপার ওভার এবং বাউন্ডারি, সব দিক থেকেই এটি ছাড়িয়ে গেছে অতীতকে।
জি-গুডবাই: বিদায় শোয়েব মালিক, বিদায় ইমরান তাহির, বিদায় জেপি ডুমিনি, বিদায় হামিদ হাসান। এদের মধ্যে মালিক, তাহির, ডুমিনি ও হাসান ইতোমধ্যে ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় গ্রহণ করেছেন। এমএস ধোনি, লাসিথ মালিঙ্গা, মাশরাফি বিন মোর্তাজা, এবং ক্রিসে গেইলের বিদায়ও সময়ের ব্যাপার মাত্র।
এইচ-হ্যাটট্রিক: এবারের বিশ্বকাপে দু’টি হ্যাটট্রিকের ঘটনা ঘটেছে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম হ্যাটট্রিকটি পেয়েছেন ভারতীয় পেসার মোহাম্মদ সামি। দ্বিতীয় কোন ভারতীয় বোলার হিসেবে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে হ্যাটট্রিকের বিরল এই কৃতিত্ব অর্জন করেছেন সামি। এর আগে ১৯৮৭ সালে ভারতের হয়ে প্রথম হ্যাটট্রিক করেছিলেন চেতন শর্মা। এবারের বিশ্বকাপে কয়েকদিন পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক উইকেট লাভ করেন কিউই বোলার ট্রেন্ট বোল্ট। বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের কোন বোলারের এটিই ছিল প্রথম হ্যাটট্রিক।
আই-ইনজুরি: বিশ্বকাপ আসরে ইনজুরি নামক ঘাতকের আক্রমণও কম ছিলনা। দক্ষিন আফ্রিকার হয়ে মাত্র দু’টি ম্যাচে খেলার পরই ইনজুরির কারণে দল ছাড়তে হয় ডেল স্টেইনকে। আধা সুস্থ আন্দ্রে রসেলকে খেলানোর চেষ্টা করেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তবে শেষ পর্যন্ত খেলা চালিয়ে যেতে পারেননি তিনি। বিদায় নিতে হযেছে টুর্ণামেন্ট থেকে।
এই ইনজুরির কারণেই ভারতীয় দলেল শিখর ধাওয়ান ও বিজয় শংকরকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। হাঁটুর ইনজুরিতে পড়ে দেশের পথে উড়াল দিতে হয়েছে আফগান উইকেটরক্ষক মোহাম্মদ শেহজাদকে। গ্রুপ ম্যাচের শেষ ম্যাচে ইনজুরিতে পড়েন অস্ট্রেলিয় ব্যাটসম্যান উসমান খাজা। যে কারণে দলের হয়ে সেমি-ফাইনাল খেলতে পারেননি তিনি। এছাড়া এই টুর্নামেন্ট চলাকালে ছোটখাট ইনজুরিতে ভুগেছেন মার্কাস স্টয়নিস, ভুবনেশ্বর কুমার, ইয়োইন মরগান ও জেসন রয়কে।
জে-জোফরা, জনি, জস, জো, জেসন ও জেমস: নামের বাহার দেখে মনে হয়েছে ইংল্যান্ড ক্রিকেট ‘জে’ অক্ষরটিকেই বেশী পছন্দ করে। ১৫ সদস্যের স্কোয়াডের এক তৃতীয়াংশেরও বেশি খেলোয়াড়ের নামের শুরু জে অক্ষর দিয়ে। শুধু তাই নয়, জে অদ্যাক্ষরের তারকা জোফরা আর্চার, জনি বিয়রস্টো, জস বাটলার, জো রুট, জেসন রয়, জেমস ভিন্স ইংল্যন্ডের প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এমনকি শেষ মুহূর্তে ইংলিশ স্কোয়াড থেকে যে খেলোয়াড়টিকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছিল তার নামও জে দিয়ে শুরু। যার নাম জো ডেনলি।
কে-কেন উইলিয়ামসন: তার দলটিই বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেরা দল হিসেবে ফাইনালে খেলেছে। যদিও তারা ভাল ভাবে ফিনিশিং টানতে পারেনি। অবশ্য নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন জিতে নিয়েছেন ২০১৯ বিশ্বকাপের টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। মুদু ভাষী এই কিউই অধিনায়ক টুর্নামেন্টে দু’টি সেঞ্চুরি ও দু’টি হাফ সেঞ্চুরিতে সংগ্রহ করেছেন ৫৭৮ রান। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে দলকে দারুণভাবে এগিয়ে নিয়েছেন তিনি।
এল-লর্ডস: ১৯৭৫ ও ১৯৭৯ সালের প্রথম দুই বিশ্বকাপে গায়ানায় জন্মগ্রহণ করা ব্রিটিশ অধিনায়কের শিরোপা জয়ের পর ২০১৯ সালে লর্ডসে শিরোপা জয় করল ইংল্যান্ড। এরপর ১৯৮৩ সালে এ ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফাইনালের শিরোপাটি অপ্রত্যাশিতভাবেই জিতে নিয়েছিল কাপিল দেবের নেতৃত্বাধীন ভারত। ক্রিকেটের তীর্থ ভুমি খ্যাত এ ভেন্যু থেকে ১৯৯৯ সালে শিরোপা জয় করেছিলেন স্টিভ ওয়াহ। বলতে গেলে এরপর থেকেই ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয় আধিপত্য শুরু হয়। এরপর টানা আট বছর শিরোপা দখলে রেখেছিল অস্ট্রেলিয়া। আর ২০১৯ বিশ্বকাপের ফাইনাল ‘সর্বকালের সর্বসেরা ওয়ানডে ম্যাচ’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই সঙ্গে একক স্টেডিয়াম হিসেবে সর্বাধিক বিশ্বকাপ আয়োজনের রেকর্ডও লর্ডসের দখলে।
এম-মিচেল স্টার্ক: বল হাতে বিশ্বকাপের আরেক সেরা তারকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মিচেল স্টার্ক। বাঁহাতি এই পেসার শিকার করেছেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ২৭ উইকেট। যার মাধ্যমে স্বদেশী গ্লেন ম্যাকগ্রা’র এক আসরে নেয়া ২৬ উইকেটের অতীত রেকর্ডটিও ভেঙ্গে দেন স্টার্ক।
এন-নেট রান রেট : এ বিষয়ে পাকিস্তানকে প্রশ্ন করা যেতে পারে। সমান পয়েন্ট নিয়েই গ্রুপ পর্ব শেষ করেছিল নিউজিল্যান্ড ও পাকিস্তান। কিন্তু নেট রান রেটে এগিয়ে থেকে সেমি-ফাইনাল নিশ্চিত করে নিউজিল্যান্ড। পাকিস্তানের ০.৪৩০ রান রেটের বিপরীতে নিউজিল্যান্ডের নেট রান রেট ছিল ০.১৭৫। নেট রান রেটে দলকে পরের পর্বে কোয়ালিফাই করার এই নিয়মের সমালোচনায় মেতে উঠেছিলেন ইয়ান বিশপ ও মাইকেল ভন সহ অনেক সাবেক ক্রিকেট তারকা। এর পরিবর্তে হেড টু হেড জয়ের বিষয়টি আমলে নেয়ার জন্য আইসিসির প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন পাকিস্তান দলের কোচ মিকি আর্থার। কারণ লীগ পর্বে দুই ফাইনালিস্ট নিউজিলল্যান্ড ও ইংল্যান্ডকে পরাজিত করেছিল তার শিষ্যরা।
ও-অরেঞ্জ জার্সি : নীল জার্সির ভারত ¯া^গতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে রং পাল্টে হয়ে গিয়েছিল কমলা রংয়ের। তাদের সঙ্গে ইংলিশ জার্সির রং মিলে যওয়াতেই এই বিপত্তি। এই জার্সির বিষয়ে ভারতীয় অধিনায়ক বিরাট কোহলিকে এক থেকে ১০ এর মধ্যে নম্বর দিতে বলা হলে তিনি আট নম্বর দেন। কোহলি বলেন, ‘এটি আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। আমি মনে করি এটি ঠিক আছে। এটিকে আমি আট নম্বর দেব।’
তবে কমলা রং পছন্দ করায় সেটি নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। কারণ ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে রং নিয়ে পাল্টাপাল্টি প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে।
পি-পিচ: সিমীত ওভারের এই ক্রিকেটে এখনো পর্যন্ত ৫০০ রান করতে পারেনি কোন দল। কিন্তু ইংল্যান্ডের উইকেটকে ব্যাটিং সহায়ক বলা হলেও এবারের আসরে কোন দলই পৌঁছতে পারেনি ৪০০ রানে। টুর্নামেন্টের ৪৮টি ম্যাচের মধ্যে চারটিই পরিত্যক্ত হয়েছে বৃষ্টির কারণে। ২৭বার ৩০০ রান ছুয়েছে । আসরে ৩১টি সেঞ্চুরি এবং ১১৪টি হাফ সেঞ্চুরি হয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ র‌্যাংকধারী ভারতীয় বোলার জসপ্রিত বুমরাহ টুর্নামেন্টের পিচগুলোকে ‘সবচেয়ে ফ্ল্যাট উইকেট’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
কিউ- কুইন এলিজাবেথ: এই বিশ্বকাপটি ব্রিটিশ রাজপরিবার রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ-এর স্বীকৃতি লাভ করেছে। কারণ অংশগ্রহণকারী ১০ দলের অধিনায়করা টুর্নামেন্ট শুরুর এক দিন আগে লন্ডনের বাকিংহ্যাম প্যালেসে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচটি দারুণ আগ্রহ সহকারে উপভোগ করেছেন রাণী। ফলাফলকে ইংল্যান্ডের ‘রোমঞ্চকর বিজয়’ বলে অভিহিত করেছেন এবং রাজপরিবারের পক্ষ থেকে দলকে অভিনন্দিত করেছেন।
আর-রোহিত শর্মা: বিশ্বকাপ চলাকালে রোহিত শর্মার ব্যাটিংয়ের দিকে তীব্র নজর রেখেছিল গোটা ক্রিকেট বিশ্ব। বিশ্বকাপে শর্মা যা করে দেখিয়েছেন অন্য কেউ এর ইতিহাসে তা করতে পারেননি। তিনিই একমাত্র ব্যাটসম্যান যিনি এক আসরে ৫টি সেঞ্চুরি হাকিয়েছেন। ৬৪৮ রান করে তিনিই হয়েছেন আসরের সর্বাধিক রান সংগ্রহকারী। যে ভাবে তিনি রান করে যাচ্ছিলেন তাতে ভারতীয় কিংবদন্তী শচিন টেন্ডুলকারের রেকর্ডটিও ভেঙ্গে যাবার উপক্রম হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ২৭ রান দূরেত্ব থেমেছে তার অভিযান। বিশ্বকাপের এক আসরে ৬৭৩ রান করে শচিন এখনো সবার ওপড়ে।
এস-সাকিব আল হাসান: ২০১৯ বিশ্বকাপে সাকিব ছিলেন দুর্দান্ত ফর্মে। টাইগার দলের হয়ে তিনি ব্যাট হাতে টুর্নামেন্টের তৃতীয় সর্বোচ্চ ৬০৬ রান এবং বল হাতে ১১ উইকেট দখল করেন। ক্রিকেট বিশ্বকাপের ইতিহাসে আর কোন ক্রিকেটার এমন অসাধারণ দক্ষতা দেখাতে পারেননি। সাকিবের এই পারফর্মেন্সের বর্ণনা করতে গিয়ে হার্শা বোগলে বলেছেন, বিশ্বকাপে কোন ব্যাটসম্যান এতগুলো উইকেট এবং কোন বোলার এতগুলো রান সংগ্রহ করতে পারেনি।
টি-টুইটার: বিশ্বকাপ চলাকালে অন ফিল্ড সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে দারুণভাবে আলোচনায় ছিল টুইটার। এ সময় সাবেক একজন ক্রিকেটার ভারতীয় দলের যেমন সমালোচনা করেছেন, তেমনি নিগৃহীত হওয়া একজন সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক স্বাগতিক দলের সমালোচনা করে টটুইটারের মাধ্যমে ব্যাপক ভাবে আলোচনায় আসেন। ওই ইংলিশ বোলার টুইটারের মাধ্যমে বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎবাণীও করে ফেলেন। তবে সেটি সত্যি হয়নি।
ইউ-আপসেট: টুর্নামেন্টে শ্রীলংকা স্বাগতিক ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আপসেটের জন্ম দেন। টুর্নামেন্টে একটি সাধারণ দল হিসেবেই অংশ নিয়েছিল লংকানরা। তবে ওই জয়ে স্বগাতিক শিবিরে হতাশা এনে দেয় তারা। একই সঙ্গে ওই জয়টি শ্রীলংকা, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের নকআউট পর্বে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা জাগিয়ে রাখে।
ভি-বিরাট কোহলি: ভারতীয় অধিনায়ক বিরাট কোহলি ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ে বিশ্বের এক নম্বর ব্যাটসম্যান। যাকে বলা হয় আধুনিক সময়ের চেজ মাস্টার। আগেই ব্যাটিংয়ের রেকর্ড গড়া কোহলি বিশ্বের আলোচিত দল ভারতীয় দলের নেতৃত্ব দিলেও ২০১৯ বিশ্বকাপে তার ব্যাট খুব একটা কার্যকর ভুমিকা রাখতে পারেনি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সংকটময় মুহূর্তে যখন তার ভাল একটি ইনিংস খুবই জরুরী ছিল তখন মাত্র এক রান নিয়ে মাঠ ছেড়েছেন কোহলি।
ডব্লিউÑওয়েদার (আবহাওয়া): অন্য সবকিছুকে ছাপিয়ে ২০১৯ বিশ্বকাপটি বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবে আবহাওয়ার কারণে। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের চারটি ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়েছে বৈরী আবহাওয়ার কারণে। টুর্নামেন্টেটি যতই গড়িয়েছে ততই বেড়েছে সুর্য্যের উজ্জলতা। কিন্তু ম্যানচেস্টারে ভারত বনাম নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার প্রথম সেমি-ফাইনালে ঠিকই হানা দিয়ে বসে বৃষ্টি। এ সময় বৃষ্টির চাপ এতটাই ছিল যে খেলার বাকী অংশ পরের দিনে (রিজার্ভ ডে) টেনে নিয়ে যেতে হয় আয়োজকদের। এমনকি ফাইনাল ম্যাচটিও বিঘিœত হয়েছে বৃষ্টির কারণে। আগের রাতের বৃষ্টির কারণে মাঠ ভেজা থাকায় ১৫ মিনিট বিলম্বে টস করতে হয় আয়োজকদের।
এক্স-এক্স ফ্যাক্টর: টুর্নামেন্টের এক্স ফ্যাক্টর হচ্ছে দিন শেষে বিশ্বকাপের এই আসরটির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ‘সৃষ্টিকর্তার হাতে’। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের জন্য শেষ তিন বলে ৯ রানের লক্ষ্য নিয়ে দ্বিতীয় রান করার সময় ব্যাট হাতে সামাপ্তি রেখার সামনে পড়ে যান ইংলিশ অল রাউন্ডার বেন স্টোকস। তখনই উইকেটের দিকে ছুটে আসা বল ওই ব্যাটে লেগে দিক পরিবর্তন করে অতিক্রম করে বাউন্ডারী লাইন। তখন ওই ব্যাটের নাম করণ করা হয় ‘ব্যাট অব গড’। এখানেই শেষ নয় কর্তব্যরত আম্পায়াররা এ সময় ৫ রানের পরিবর্তে ৬ রানের সংকেত দেন। যে কারণে শেষ পর্যন্ত টাই হয় ম্যাচটি। এভাবে ভাগ্যের সহায়তায় শিরোপা নিশ্চিত হয় ইংল্যান্ডের।
ওয়াই-ইয়র্কার: বিশ্বকাপের সেরা ডেলিভারির একটি ছিল ইয়র্কার। যেটি দিয়ে গ্রুপ পর্বে চিরশত্রু অস্ট্রেলিয়া নিয়ন্ত্রণ করেছে ইংল্যান্ডকে। মিচেল স্টার্কের একটি ইয়র্কার বিদায় করে দেয় বেন স্টোকসকে। টুর্নামেন্টে আরো অনেকগুলো ইয়র্কার বোলিং হয়েছে। যেগুলো করেছেন লাসিথ মালিঙ্গা, জসপ্রিত বুমরাহ, মোহাম্ম সামি, শেলডন কট্রেল,ওয়াহাব রিয়াজ ও লোকি ফার্গুসন।
জেড-জিরো থেকে হিরো: ২০১৯ বিশ্বকাপ বেন স্টোকসকে ‘জিরো থেকে হিরোতে’ পরিণত করেছে। ২০১৬ সালের টি-২০ বিশ্বকাপের ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড। এ সময় শেষ ওভারে জয়ের জন্য ১৯ রানের প্রয়োজন ক্যারিবীয়দের। ওই ওভারটি করতে আসেন স্টোকস। অপরপ্রান্তে ব্যাট হাতে কার্লোস ব্রাথহোয়াইট পরপর চারটি বাউন্ডারী হাঁকিয়ে ট্রফিটি কেড়ে নেন ইংল্যান্ডের কাছ থেকে। এরপর ২০১৭ সালে রাস্তায় অপ্রীতিকর ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন স্টোকস। যে কারণে ১১ মাস খেলার বাইরে কাটাতে হয় তাকে। এক বছরেরও কম সময় আগে এক রাত জেলেও কাটাতে হয়েছে স্টোকসকে। ফলে জিরোতে পরিণত হন তিনি। কিন্তু ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ স্টোকসকে জিরো থেকে হিরো বানিয়ে দিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ফেল মারা এই ইংলিশ তারকা ফাইনালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দিয়ে দলকে শিরোপা এনে দিয়েছেন। স্টোকসের মত ‘জিরো থেকে হিরো’ হবার এমন দৃষ্টান্ত খুব কমই আছে।