সোমবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ৪ ভাদ্র ১৪২৬

রক্তঝরা কলম

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, আগস্ট ১৫, ২০১৯, ৯:১৫ পূর্বাহ্ণ


শাহানা ইয়াসমিন : আজ রক্তঝরা কলমে ইতিহাস লিখব। কিন্তু বাতাস থমকে গেল। ফুলেরা রঙহীন ধূসর হচ্ছে ক্রমাগত। পাখিরা বোবা। নদী সাগরে মিশতে ভুলে গেল। ঢেউগুলো মনে হচ্ছে টকটকে লাল। দূরে কুকুরের আর্তচিৎকারে অশনি সংকেত। শ্রাবণের মেঘে ঢাকা কালো চাঁদহীন আকাশ।

দিনটি ছিল শুক্রবার, ১৫ আগষ্ট, ১৯৭৫ সাল। সকাল বেলা নিত্যকার রেডিও শুনছেন বাবা। অফিসে যাবেন। সেভ করছেন। আমি অনেক ছোট। এখনকার যুগের বাচ্চাদের মতন ছিলাম না। ভোরে ওঠার অভ্যাস ছিল। হঠাৎ বাবার আর্তচিৎকার। ছুটে গেলাম। দেখলাম বাবার মুখে অর্ধেক সেভিং ফোম, মাটিতে লুটিয়ে আছেন। ডান হাতে রেজার। অঝোরে কাঁদছেন আমার বাবা। ছোট্ট আমি হতভম্ভ। এতটুকুই মনে আছে। বাবা বলছেন, “হায়রে শেখ মুজিব, মেরে ফেলল, বাঁচতে দিল না।”

বাবার ঐ চিৎকার বুকে চেপে বড় হয়েছি। অবোধ আমি এখনো অবোধ। অংকটা মেলাতে পারি না। কাটাকুটি, কেবলই কাটাকুটিতে ভরে যায় জীবনের ক্যালেন্ডারের পাতা। বছরের পর বছর।

বঙ্গবন্ধুর মতন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালীকে পাকিস্থানীরা দীর্ঘ ন’মাসেও মারতে পারেনি, মেরেছে বাঙ্গালীকে। ধিক্কার জানাবার ভাষা খুঁজে পাই না। দূর থেকে ফজরের নামাজের আযান ভেসে আসছে। রাতের আঁধার ফুরিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। তখনই রচনা হল ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড।

ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী, চোখে কাল চশমা সৌম্য চেহারার চিরচেনা মুজিব উপরের কক্ষ থেকে ছুটে এসে সিঁড়ি দিয়ে এক ধাপ দু’ধাপ নামতে নামতে বলতে লাগলেন, “তোরা আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাস?” অমনি বুলেটে ঝাঁঝরা করে নিথর নিশ্চল করে দিল এদেশের সোনার সন্তান শেখ মুজিবকে।

ছিটকে পরল চশমা, সাদায় রচিত হল লাল। স্নেহধন্য চোখে ছুঁড়ে দেয়া হল একরাশ বন্যতা। সিঁড়ি বেয়ে রক্তের ধারা বয়ে গেল। স্তব্ধ হয়ে গেল কন্ঠ। যে কন্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

বিস্মিত মুজিব কি শেষ মুহূর্তে বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁর শরীরে যারা বুলেট ছুড়েছিল তারা কোন পাকিস্থানি বা বহিঃশত্রু ছিল না। যাদের জন্যে নিজের জীবনের স্বর্ণালী দিনগুলো অর্ধাহারে অনাহারে জেলে সংগ্রামে কাটিয়েছিলেন, এনে দিয়েছিলেন অখণ্ড মানচিত্র, তারাই হিংস্র দানব হয়ে শেষ নিঃশ্বাসটুকু কেড়ে নিয়েছিল তাঁর।

একদল হিংস্র দুষ্কৃতকারী, খুনী, বর্বর, পাষণ্ড রাজধানী ঢাকার ৩২ নম্বর রোডের বঙ্গবন্ধু ভবনে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে নির্মমভাবে খুন করে বঙ্গবন্ধুকে, তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে, তাঁদের বড় ছেলে শেখ কামাল, মেঝো ছেলে শেখ জামাল সহ ছোট্ট কিশোর শেখ রাসেল এবং পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামালকে।

ঐ রাতে তৎকালীন মন্ত্রী কৃষক নেতা আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের মিন্টো রোডের সরকারী বাসভবনেও হানা দেয় দুষ্কৃতকারীরা। সেখানে হত্যা-তাণ্ডবে প্রাণ দেয় বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, তার কিশোর ছেলে আরিফ, কিশোরী মেয়ে বেবি, নাতি ছোট্ট শিশু সুকান্ত আব্দুল্লাহ, ভাইয়ের ছেলে শহীদ সেরনিয়াবাত ও আত্নীয় আবু নঈম রিন্টু। বঙ্গবন্ধুর আদরের বোন মন্ত্রী সেরনিয়াবাতের স্ত্রী মারাত্মকভাবে আহত হয়। বর্বর খুনীদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি (জাতীয় যুবলীগ চেয়ারম্যান) এবং তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বেগম আরজুমান। বঙ্গবন্ধুর এককালীন সচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্ণেল জামিল ফোনের আহবানে বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে গেলে ৩২ নম্বর রোডের মুখে ঘাতকেরা বুলেটের আঘাতে তাকেও স্তব্ধ করে দেয়।

ঘাতকদের মূল উদ্দেশ্য ছিল যে, তারা বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পুরো পরিবার ও আত্নীয়স্বজনসহ সবাইকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলবে। সেই কালরাত্রিতে তারা ২৬ জনকে হত্যা করেছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সে সময়ে পশ্চিম জার্মানিতে ছিলেন বলে তারা প্রাণে বেঁচে যান। তাদের স্বদেশ ফিরে আসার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল।

উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরী হাইস্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ছিল। সবার আদরের ছোট্ট ছেলেটির প্রিয় সঙ্গী ছিল সাইকেল। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ চলাকালীন অদর্শনে শিশু রাসেল সবসময় পিতার কাছাকাছি থাকবার জন্যে জেদ ধরত। ভয়াল রাতে কাজের লোকজন তাকে পেছনের সিঁড়ি দিয়ে লুকিয়ে নিচে নিয়ে যায়। কিন্তু হিংস্র হায়নারা রাসেলকে দেখে ফেলে এবং তাকেও রেহাই দেয়নি।বুলেট বিদ্ধ করবার পূর্বে ওয়ারলেসের মাধ্যমে অনুমতি নেয়া হয়। তারপর ক্রন্দনরত রাসেলকে মায়ের কাছে নিয়ে যাবে বলে উপরের কক্ষে নিয়ে ব্রাশফায়ার করে তার মায়ের লাশের উপর শুইয়ে দেয়। এত নিষ্ঠুরতা! এত নির্মমতা! বিশ্ব মানবতা মুখ লুকালো। এভাবেই কলংকিত এক ইতিহাস রচিত হল স্বাধীন বাংলার মানচিত্রে।

অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল ফারুক রহমান স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেন, খোন্দকার মোশতাকের নির্দেশে তিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে অভিযান পরিচালনা করেন। তিনিই বাসভবনে অভিযানের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন। তখন বঙ্গভবনে অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল রশিদ দায়িত্ব পালন করেছেন। অবসরপ্রাপ্ত মেজর ডালিম ছিলেন বেতারকেন্দ্রে। আর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সামরিক কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বন্টন করেছেন অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল ফারুক নিজেই। (তথ্যসূত্র: Killer Of Bangladesh Sheikh Mujib.)

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনি ব্যবস্থা থেকে অনাক্রম্যতা বা শাস্তি এড়াবার ব্যবস্থা প্রদানের জন্য বাংলাদেশে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তারিখে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ এ ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করেন।

১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশ সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর পর সংশোধিত আইনে এ আইনটি বাংলাদেশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সংবিধানের ৫ম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে বাংলাদেশ হাইকোর্ট। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর দায়মুক্তি আইন বা ইনডেমনিটি আইন বাতিল করে আওয়ামী লীগ সরকার এবং ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী আ ফ ম মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা করেন। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল তৃতীয় বিচারক মোহাম্মদ ফজলুল করিম ২৫ দিন শুনানীর পর অভিযুক্ত ১২ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ নিশ্চিত করেন৷ ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর থেকে ২০০৯ সালের ২৪ আগস্ট পর্যন্ত বাদী-বিবাদীর আপিলের প্রেক্ষিতে চার দফায় রায় প্রকাশ হয়, সর্বশেষ আপিল বিভাগ ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর থেকে টানা ২৯ কর্মদিবস শুনানি করার পর ১৯ নভেম্বর চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে এরই মাধ্যমে ১৩ বছর ধরে চলা বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের আইনি ও বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়। (তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া)।

বঙ্গবন্ধু বলতেন, “আমার সবচেয়ে বড় শক্তি আমার দেশের মানুষকে ভালোবাসি, সবচেয়ে বড় দূর্বলতা আমি তাদেরকে খুব বেশি ভালোবাসি।” তিনি আরো বলতেন, “সাত কোটি মানুষের ভালোবাসার কাঙ্গাল আমি। আমি সব হারাতে পারি, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা হারাতে পারব না।” বংগবন্ধুর উক্তি ছিল, “বিশ্ব দুই শিবিরে বিভক্ত-শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।”

বুলেটের আঘাতে বঙ্গবন্ধু মারা যাননি। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি বেঁচে আছেন আমাদের বুকের মাঝে। তার আদর্শ, স্বপ্নভরা চোখ, বুকভরা ভালোবাসা অনর্গল বয়ে চলা নদীর মতন আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের মাঝে প্রবাহিত হয়ে বার বার বেঁচে উঠবেন তিনি। চিরচেনা সেই শেখ মুজিব আমাদের মাঝে আমাদের মধ্যেই জেগে উঠবেন বার বার, হাজারবার।

লেখক পরিচিতি: প্রভাষক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ওমর গণি এমইএস কলেজ, চট্টগ্রাম।