বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯, ৬ ভাদ্র ১৪২৬

একুশে পত্রিকা ‘ভীতি’ ও ‘প্রীতি’!

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, আগস্ট ১৫, ২০১৯, ৪:১৯ অপরাহ্ণ


চট্টগ্রাম :
অভিযোগটি তোলেন রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের রুটিন দায়িত্বে থাকা উপ উপাচার্য ড. শিরীণ আখতারকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন না জানতে চান তিনি।

শিরীণ আখতার বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যেতে চাইলে ফজলে করিম বার বার ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন। একপর্যায়ে সেখানে উপস্থিত একুশে পত্রিকা সম্পাদক আজাদ তালুকদারকে ইঙ্গিত করে উপ উপাচার্য বলেন, আমি কিছু করতে চাইলে তো আজাদ তালুকদার একুশে পত্রিকায় তুলে দিবেন।


জবাবে ফজলে করিম চৌধুরী বলেন, আজাদ তালুকদার আমাদের মানুষ, তার দায়িত্ব আমার, আপনি নির্ভয়ে লোকটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নানের সরকারি বাংলোয় ঈদুল আযহা উপলক্ষে সোমবার (১২ আগস্ট) আয়োজিত ঈদের শুভেচ্ছা-বিনিময় অনুষ্ঠানে এমপি-ভিসির কথোপকথন এটি।

এসময় চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার শংকর রঞ্জন সাহা, স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব দীপক চক্রবর্তী, চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুব আলম, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব সভাপতি আলী আব্বাস, সিটি করপোরেশনের প্রাক্তন কাউন্সিলর, নারীনেত্রী অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানুসহ প্রশাসন-ক্যাডারের মাঠপর্যায়ের বেশ কয়েকজন ইউএনও, এসি-ল্যান্ড উপস্থিত ছিলেন।


বিভাগীয় কমিশনার বাংলোতে ঈদের শুভেচ্ছা-বিনিময় উপলক্ষে বিকেল ৪টা থেকে শুরু হয় অতিথি আগমন। শুভেচ্ছা বিনিময় করতে এসে একে একে বিভাগীয় কমিশনারের আতিথ্য গ্রহণ করেন এমপি-মেয়র, সরকারের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা, বিজিবি চট্টগ্রাম প্রধান, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ। আসেন সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ, প্রাক্তন চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামও। বিভাগীয় কমিশনার দম্পতি অতিথিদের স্বাগত জানান।

সন্ধ্যা ৭টার দিকে আসেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির রুটিন দায়িত্বে থাকা প্রফেসর ড. শিরীণ আখতার। শুভেচ্ছা বিনিময়ের একপর্যায়ে একুশে পত্রিকা সম্পাদক আজাদ তালুকদারকে কাছে পেয়ে আবেগ-অভিযোগের ঝাঁপি খুলে দেন তিনি। বলেন, ভাই আপনি আমার পেছনে লাগলেন কেন, আপনার বউ তো আমার অনেক কাছের মানুষ, ছোটবোনের মতো। একসঙ্গে কত প্রোগ্রাম, সভা সমিতি করেছি।

আজাদ তালুকদার জবাব দেন, ব্যাপারটা পেছনে লাগার নয়। আপনার কিছু অজ্ঞতা ও ভুল আছে, যেগুলো প্রতিনিয়ত সংবাদের জন্ম দিচ্ছে। আমরা কেবল সৃষ্ট সংবাদগুলোই তুলে ধরছি। অন্য কিছু নয়। আপনি নিশ্চিত থাকুন, একুশে পত্রিকা ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ সাংবাদিকতা করে না, করবেও না।


এসময় অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানুর দৃষ্টি আকর্ষণ ও সহযোগিতা কামনা করে শিরীণ আখতার বলেন, রানু আপনি তো আমার বোন, আপনি থাকতে আজাদ তালুকদার আমার বিরুদ্ধে একের পর এক নিউজ করেন কীভাবে।

রানু জবাব দেন, আমরা একঘরে বাস করি এটা সত্য। দুজনের কর্মপরিধি ভিন্ন, জগত আলাদা। আমরা কেউ কারো কাজে হস্তক্ষেপ করি না। আমি কাছ থেকে দেখেছি আজাদ তালুকদার আপাদমস্তক সৎ ও সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিক। নিউজের উপাদান তৈরি হলে সে কাউকে যেমন ছাড়ে না, একইভাবে কখনো তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিউজ করতেও দেখি না।

এসময় আপনারা দুজনের মধ্যে মধ্যস্ততা করে দেই বলেই বিভাগীয় কমিশনার ফ্লোর নেন। বললেন, একুশে পত্রিকা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ভিত্তিহীন সাংবাদিকতা করে বলে আমার অন্তত মনে হয় না। এরকম হলে একুশে পত্রিকা এতটা জনপ্রিয় হতো না, আমিও হয়তো পত্রিকাটির ভক্ত হতাম না। একুশে পত্রিকা কতটা পাঠকসমাদৃত তা আমি বুঝেছি আমার একটা নিউজে। সার্কিট হাউজের মিটিংয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানদের গাড়ি-ব্যবহার ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্যবোধ স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলাম এক বক্তৃতায়। আর সেটা নিউজ করে দিলো একুশে পত্রিকা। নিউজটা পড়ে কত মানুষ যে আমাকে ফোন করেছে তার কোনো হিসাব নেই।

এরইমধ্যে আড্ডায় যোগ দেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। তারও আগে এসেছিলেন সিডিএ’র চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ ও প্রাক্তন চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। অবশ্য এই তিনজনের কারো সাথে কারো দেখা হয়নি।


আড্ডায় সিটি মেয়র বিভিন্ন বিষয় অবতারণা করছিলেন। এসময় হাস্যরস ছড়িয়ে বিভাগীয় কমিশনার বললেন, নাছির ভাই, এর বেশি বলতে যাইয়েন না। বেশি বললে আবার একুশে পত্রিকায় শিরোনাম হয়ে যাবে। মৃদু হেসে এ কথায় সমর্থন দেন মেয়র; বলেন, এটা ঠিক, আজাদ আবার পত্রিকায় তুলে দেবে।

এসময় মেয়রকে সামনে রেখে ভিসিকে আজাদ তালুকদার বলেন, মানুষ বলাবলি করছে মেয়র সাহেবই আপনাকে ভিসির রুটিন দায়িত্বে আসার জন্য সহযোগিতা করেছেন। আপনাকে পূর্ণাঙ্গ ভিসি করতেও তিনি আপনার দরখাস্তে সিল-সাইন দিয়েছেন।

তখন ভিসি বলেন, মেয়র সাহেব আমাকে ভিসির দায়িত্ব এনে দিয়েছেন কিনা জানি না, তবে দায়িত্ব পালনে তিনি আমাকে সহযোগিতা করছেন। এসময় মেয়র মৃদু হাসেন এবং ভিসির অন্য একটি কথার সমালোচনা করেন।

শিরীণ আখতার বলছিলেন, যিনি আমার বিরুদ্ধে থাকেন, থাকুক-তার কাছে আমি কখনো যাই না। কথাটির বিরোধিতা করে মেয়র বলেন, আপনার স্ট্যাট্রেজি ভুল। যিনি আপনার বিরুদ্ধের মানুষ, আপনার সমালোচনা করবেন তার কাছেই বরং বেশি যাওয়া উচিত।

এসময় শিরীণ আখতার বিভাগীয় কমিশনারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সিনেট সদস্য হিসেবে বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান সদ্য সমাপ্ত চবির সিনেট অনুষ্ঠানে ভিসির বক্তৃতার অতিরঞ্জন, অপ্রাসঙ্গিক, বাহুল্য অংশবিশেষের সমালোচনা করেছিলেন।

শিরীণ আখতার আড্ডায় সেই বিষয়টির অবতারণা করে বলেন, আপনার (বিভাগীয় কমিশনার) সেদিনের বক্তব্যটা আমার জন্য শিক্ষনীয় ছিল। তাতে আমাদের সংশোধনের অনেক দিক ছিল।

সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষের মাঝেও দেখা গেলো একুশে পত্রিকা ভীতি। তিনিই অবতারণা করলেন, একুশে পত্রিকায় সদ্য প্রকাশিত সিডিএতে ‌‘অভিযোগ’-এর দাম ৬শ’ টাকা, ভ্যাট নিয়েও নয়-ছয়!’ শীর্ষক সংবাদটির।

তিনি বলেন, এই বিষয়টি আগে থেকেই চলে আসছিল, তাই তাৎক্ষণিকভাবে কিছু করতে তিনি অপারগ। অবশ্য অভিযোগকারী থেকে ৫২০ টাকা আদায়ের পর তার কাছ থেকেই আবার ১৫ শতাংশ ভ্যাট কর্তনের বিষয়টির তিনি সমালোচনা করেন।

আবদুচ ছালামও প্রায় ৪৫ মিনিট আড্ডা দেন। তার মুখেও শোভা পায় একুশে পত্রিকার গল্প। তিনি বলেন, যে যাই বলুক, যার বিরুদ্ধেই লিখুক একুশে পত্রিকা কিন্তু ভালো করছে। তারা ইনডেপথ সাংবাদিকতা করছে।

আড্ডার একপর্যায়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেনও একুশে পত্রিকার প্রশংসা করেন। তিনি একুশে পত্রিকা সম্পাদককে পত্রিকাটিকে দৈনিকে রূপান্তরের পরামর্শ দিয়ে বলেন, আপনি দৈনিক করার উদ্যোগ নিলে আমি সর্বাত্মক সহযোগিতা করবো।

এসময় তিনি সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা নেই কিংবা অপসাংবাদিকতা করছে এমন কিছু লোক দৈনিক কিংবা সাপ্তাহিকের রেজিস্ট্রেশনের জন্য তোড়জোড় করছে বলে উল্লেখ করেন।

ডিসি বলেন, সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে এধরনের অসংখ্য পত্রিকা আমার দফতরে চুক্তির অপেক্ষায় আছে। তাদেরকে স্পষ্ট বলে দিয়েছি এমনিতেই অপসাংবাদিকতায় অতীষ্ঠ মানুষ। এ অবস্থায় নতুন করে কাউকে অপসাংবাদিকতার লাইসেন্স আমি তুলে দিতে পারি না। তারা বলেন, স্যার একবছরের মধ্যে চুক্তি না হলে ডিএফপির ডিক্লারেশন বাতিল হয়ে যাবে। আমি বলি যাক বাতিল হয়ে, আমার কিছুই করার নেই। বলেন জেলা প্রশাসক।

আড্ডার একপর্যায়ে বিএসআরএম’র নির্বাহী পরিচালক তপন কুমার সেন বিভাগীয় কমিশনার থেকে বিদায় নিয়ে একুশে পত্রিকা সম্পাদকের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছিলেন। তখন বিভাগীয় কমিশনার বলেন, ‘তপন বাবু একুশে পত্রিকাকে কিন্তু দেখতে হবে, মনে রাখবেন।’

এভাবেই বিভাগীয় কমিশনারের ঈদ-আড্ডা, শুভেচ্ছা বিনিময়ের অনুষ্ঠানটি যেন হয়ে উঠেছিল একুশে পত্রিকারই অনুষ্ঠান; কখনো একুশে পত্রিকা ‘ভীতি’, কখনো ‘প্রীতিতে’ ভরা।