শনিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩০ ভাদ্র ১৪২৬

রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব : এক অনির্বচনীয় সুখানুভূতি

প্রকাশিতঃ শনিবার, আগস্ট ১৭, ২০১৯, ১১:২৬ পূর্বাহ্ণ

শেখ মুহম্মদ বেলাল : রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন, তা যে কোনো দেশেরই হোক, সকলেই জানেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। সম্মানজনক। কখনো কখনো যথেষ্ট স্পর্শকাতরও বটে। তবে এসবের মাঝেও মাঝে মাঝে কিছু মুহূর্ত আসে ভীষণ সুখকর, অনাবিল আনন্দ আর তৃপ্তির। সে রকম একটি বিষয় আজ আপনাদের সাথে ভাগাভাগি করব।

ড. তিতাস ভান দার স্পেক। দি হেগ ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপলায়েড সায়েন্সেস-এর ব্যবসা ব্যবস্থাপনা ডিপার্টমেন্টের প্রভাষক। মা’র সূত্রে অর্ধেক বাংলাদেশী, অর্ধেক ডাচ। কৈশোরে বেশ কিছুকাল কেটেছে বাংলাদেশে। অল্প-সল্প বাংলাও বলতে পারেন। ২০১৮ সালে ডক্টরেট সম্পন্ন করেছেন যুক্তরাজ্যের এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ড. তিতাস কাজ করছেন সামাজিক উদ্যোক্তাদের (social entrepreneur) নিয়ে এবং নিত্যনতুন উদ্ভাবনা (startup) বিষয়ে SDGs-এর সাথে কীভাবে সমন্বয় করে ভবিষ্যত প্রজন্মকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করা যায়। নেদারল্যান্ডস এবং যুক্তরাজ্যে শিক্ষা ক্ষেত্রেও কাজ করেছেন তিনি।

ড. তিতাস ক’দিন আগে আমার সাথে সাক্ষাতের আগ্রহ ব্যক্ত করে দূতাবাসে একটি ইমেইল করেন। এখানে উল্লেখ্য, তিতাসের বাবা-মা জনাব ফ্রেডেরিখ এবং মিসেস মিনা একসময় আমার সাথে দেখা করেছিলেন এবং বাংলাদেশ শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে আলোচনা করেছিলেন। তিতাসের বাবা-মা যেহেতু বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডস-দু’দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাই দেখেছেন, তাই উনাদের অনুরোধ করেছিলাম নেদারল্যান্ডস থেকে আমাদের শিক্ষনীয় কী আছে তা জানাতে।

খুব সুন্দর একটা লেখা পাঠিয়েছিলেন কীভাবে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানের “Top down” থেকে নেদারল্যান্ডসের মতো “bottom up” করা যায়। সোজা কথা আপনার মেয়ে ডাক্তার না নার্স অথবা ইঞ্জিনিয়ার হবে সেটা তার সক্ষমতা, attitude, aptitude ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে তার শিক্ষকরা ঠিক করবে। সেজন্য নেদারল্যান্ডসে অনেকটা ৭ম/৮ম শ্রেণী থেকেই তাদের সন্তানদের তিনটি ভাগে ভাগ করে দেয় : Vocational, Higher Vocational University

অর্থাৎ এখানে সমন্বয় করা হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রয়োজন ও ব্যক্তির সক্ষমতা। আমি তাদের সেই লেখা আমাদের শিক্ষা সচিব বরাবরে পাঠিয়েও ছিলাম। এখন তিতাসের সাথে কথা বলার পর মনে হলো বিষয়টি আবারও তাগাদা দেয়া দরকার। এখনই সময়।

বাবা-মা’র থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই তিতাস দেখা করতে আগ্রহী। আমার অফিস থেকে তাকে স্বাগত জানানো হলে প্রত্যুত্তরে পরের দিনই যে কোনো সুবিধাজনক সময়ে তিনি আসতে আগ্রহী বলে জানান। তাঁর এতটা আগ্রহে কিছুটা অবাকই হলাম।

পরদিন যথাসময়ে ড. তিতাস এসে হাজির। তাঁর সম্পর্কে, তাঁর কাজ সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরে তিতাস জানালেন কর্মক্ষেত্র থেকে ছুটি নিয়ে তিনি আগামী ডিসেম্বরে সস্ত্রীক এক বছরের জন্য বাংলাদেশে যাবার পরিকল্পনা করছেন। উদ্দেশ্য তাঁর লব্ধ জ্ঞান বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রের উন্নয়নে এবং টেকসই উদ্যোক্তা গঠনে প্রয়োগ। ভাল লাগলে বা তাঁর উদ্দেশ্য সফল হবার সম্ভাবনা দেখলে হয়তো তিনি বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থেকেও যেতে পারেন। পরামর্শ চাইলেন কীভাবে তিনি তাঁর এই মহতী প্রচেষ্টা শুরু করতে পারেন।

আমি অবাক হলাম তিতাসের এই আগ্রহ দেখে, বাংলাদেশের প্রতি তাঁর এই টান দেখে। সুন্দর দেশ, কর্মপরিবেশ ছেড়ে বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কোনোভাবে নিজেকে সম্পৃক্ত করবার তাঁর এই তাড়না আমাকে বিমোহিত করার পাশাপাশি মনটাকে ভরিয়ে তুললো এক অনাবিল আনন্দ-সুখে।

তিতাসকে মনে হল একজন পরিপূর্ণ বাংলাদেশী, একজন গর্বিত বাংলাদেশী। তিতাস আমাদের একটি নদীর নাম। জানিনা তাঁর মা-বাবা সেই নদীর স্মরণে, বাংলাদেশকে স্মরণে রাখবার জন্যই তাঁর নাম তিতাস রেখেছেন কিনা। তবে তিতাস আমাকে যে সুখানুভূতির পরশ দিয়েছে তার জন্য আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ।

আমাদের আগামী প্রজন্মের কাছে আমরা প্রতিটা বাবা-মা যদি তিতাসের বাবা-মা’র উদাহরণ অনুকরণে তাদেরকে বাংলাদেশে চলমান উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় সামিল হতে বলি, বিশেষ করে প্রাচ্য ও পশ্চিমের অথবা উত্তর ও দক্ষিণের যা কিছু সেরা, যা কিছু নেয়া যায়, এ রকম তিতাসরা ছুটে আসে বাংলাদেশ বিনির্মাণে, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা কথায় নয়, কাজে প্রমাণ দেবে সেই দিন।

আশা করি তিতাস যে তাড়নায়, নাড়ীর যে টানে ছুটে যাচ্ছে বাংলাদেশে তা সফল হোক, সুন্দর হোক।

শেখ মুহম্মদ বেলাল : রাষ্ট্রদূত, বাংলাদেশ দূতাবাস, দি হেগ নেদারল্যান্ডস