বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬

বিসিএস পরীক্ষাই সবকিছু নয়রে পাগলা

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২২, ২০১৯, ১০:২৭ অপরাহ্ণ

শেখ মোহাম্মদ জুলফিকার বিপুল : উপরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে ঝানু আইসিএস অফিসার অন্নদাশংকর রায় বয়সে তরুণ হয়েও মাঝখানে বসে আছেন। আর বয়োজ্যেষ্ঠ হয়েও আইন্সটাইনের সাথে কাজ করা বিখ্যাত সত্যেন বোসের ঠাঁই হয়েছে একেবারে শেষে। কারণটা পরিস্কার, ব্রিটিশদের তৈরি ব্যুরোক্র্যাসির কাঠামোয় যার কাছে ক্ষমতা সেই নমস্য।

পাওয়ার বোঝাতে এই ছবিটা পাঠিয়েছে আমার এক বিসিএস পাগলা ভাতিজা। আউটস্যান্টিন্ডিং ছেলে কয়েক বছর ধরে সে বিসিএস পরীক্ষা নিয়ে পাগলা হয়ে আছে, কিন্তু হচ্ছে না। সে বুঝতে পারছে না এই সেক্টরটা তার জন্য না। অথচ দারুণ স্পোর্টসম্যান ছিল সে, ইংরেজিতে ভালো লিখতে পারে, পত্রিকায় তার লেখার আমি ভক্ত, ড্রামস বাজাতে পারে…সব কিছু ছেড়ে দিয়ে তার মাথায় ঢুকেছে বিসিএস, একটা পাজেরো জিপ, একজন বডিগার্ড। কোথা থেকে সে এই ব্যাড ইনফ্লুয়েন্স আর ভুল জীবনদৃষ্টি গেদার করেছে জানি না।

দারুণ উচ্চাকাঙ্ক্ষায় ভোগা এই ছেলে ওয়েস্ট করছে তার গিফটেড পোটেনশিয়ালকে। শুধু বিসিএসে জীবনের অর্থ খুঁজতে যাওয়া এইসব যুবকেরা ঢুকে পড়ছে একটা একমাত্রিক কানাগলিতে।

যে ব্যাপারটা সে জানে না আইসিএস অফিসার অন্নদাশংকর রায়কে কেউ মনে রাখেনি। সবাই মনে রেখেছেন সাহিত্যিক অন্নদাশংকর রায়কে। তুখোড় সিএসপি আফিসার আবু জাফর ওবায়দুল্লাহকেও কেউ মনে রাখেনি, রেখেছেন সাহিত্যিক আবু জাফর ওবায়দুল্লাহকে, তাঁর লেখা পঙ্তিমালাকে,- ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি…’ কিংবা ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইয়েরা অনেক বড় বড় অফিসার ছিলেন। সবাই তাঁকে বলতো- তুমি কী সব লেখালেখি করো, ফুলিং অ্যারাউন্ড করে বেড়াও, তুমি ভাইদের মতো হতে পারো না?

দেখি আজ বলুনতো মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেইসব ভাইদের আপনি চেনেন কিনা? হ্যাঁ, তাদের চিনবেন তবে ‘মানিকের ভাই’ পরিচয়ে।

আমাদের এই শহরে কত বড় বড় অফিসার এসেছে গেছে, কিন্তু তাদের জন্য কি প্রবর্তক মোড়ে কেউ রূপালি গিটার তৈরি করবে?

ভাতিজাকে আমি বিসিএস নিয়ে নিরুৎসাহিত করছি না। আমি চাই তার চিন্তার দুয়ার মুক্ত হয়ে যাক। আমাদের মেধাবি ছেলেমেয়েরা সরকারি চাকরিতে যাবে এটাই তো চাই। কিন্তু এত বিশাল ওয়ার্কফোর্স শুধু বিসিএস পরীক্ষায় জীবনের অর্থ খুঁজবে এটা হতে পারে না। আরো হাজারো পথের সন্ধান তাকেই খুঁজে নিতে হবে, তারপর একদিন সে অবাক হয়ে দেখবে সেখানে তেমন ভিড় নেই। স্মরণীয় হয়ে থাকতে এই পথই তার জন্য তৈরি।

আইসিএস, সিএসপি অফিসার হওয়ার এই মরীচিকার কথা অন্নদাশংকর রায়, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ জানতেন। এই মোহ সাময়িক, টেবিলের ওপারে চলে গেলে কেউ মনে রাখবে না। অবসরে যাবার পর স্যার ডাকতে ডাকতে মুখে ফেনা তোলা জুনিয়ররাও সময় দেবে না। যে বাংলোতে এতোদিন নিজের মনে করে থেকেছেন সেখানে ঢুকতেও তখন গেইটে দাঁড়িয়ে অনুমতি নিতে হবে…

প্রিয় ভাতিজা, আশা করি জীবনের বিশাল পারস্প্যাকটিভটা দেখতে পাবে। পাবলিকের সম্মান পাবার মোহের মতো বাখোয়াস একটা ব্যাপার থেকে সে বের হয়ে আসবে।