মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬

রোহিঙ্গা নারী প্রথম আলো-বন্ধুসভার সংগঠক!

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ৩, ২০১৯, ৮:৪২ অপরাহ্ণ


কক্সবাজার: বাবা-মাসহ পরিবারের সবার বসতি রোহিঙ্গা-শিবিরে। কিন্তু শিবিরের অবরুদ্ধ পরিবেশে থাকতে চাননি রহিমা আকতার ওরফে রাহী ওরফে খুশি। বেরিয়ে পড়েন বাংলাদেশী পরিচয় অর্জনের মিশনে। কিছু অসাধু এদেশি মানুষের সহযোগিতায় সফল হয় সেই মিশনে। খুশি এখন আর রোহিঙ্গা নয়, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সবকিছু পাল্টে ফেলেছেন। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে এখন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটিতে।

তবে খুশির বাংলাদেশি হওয়ার মিশনে হঠাৎ ঝড় উঠেছে মাত্র দেড় মিনিটের একটি ভিডিও ক্লিপে। ফাঁস হয়ে যায় খুশির আসল পরিচয়। পরিচয় ফাঁস হওয়ার পর সহপাঠিরাও রীতিমতো বিস্মিত খুশী একজন রোহিঙ্গা এবং সরকারী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী।

জার্মানভিত্তিক বার্তা সংস্থা ডয়চে ভেলে’কে দেওয়া একটি ভিডিও সাক্ষাতকারে খুশি নিজেই স্বীকার করেন তিনি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক। ১৯৯২ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ওই ভিডিওটি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে খুশিকে ঘিরে কক্সবাজারসহ সারাদেশে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তাকে যারা প্রশ্রয় দিয়েছিল তাদেরকে ঘিরেও সন্দেহমূলক অভিব্যক্তি দেখা গেছে ফেসবুকে।

খুশির পুরো নাম রহিমা আক্তার খুশি। ভিডিওটিতে উল্লেখ করা হয়, ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গা তরুণী রহিমা আকতার ওরফে রাহী খুশির পরিবার একইভাবে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিলো। সেখানে বলা হয়, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সন্তানরা বৈধভাবে বাংলাদেশের কোনো স্কুলে পড়তে পারে না। তাই রোহিঙ্গা পরিচয় লুকিয়ে এবং ঘুষ দিয়ে কক্সবাজারের একটি স্কুলে ভর্তি হয়েছিল খুশি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রোহিঙ্গা পরিচয় লুকিয়ে এবং ঘুষ দিয়ে ভর্তি হওয়া সেই স্কুলটি হলো কক্সবাজার শহরের বায়তুশ শরফ জব্বারিয়া একাডেমি।

জানা গেছে, খুশি কক্সবাজার বায়তুশ শরফ জব্বারিয়া একাডেমি থেকে এসএসসি ও কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। বর্তমানে তিনি কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। কক্সবাজারের ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে এলএলবি অনার্স পড়ছেন।
রোহিঙ্গা তরুণী খুশি অত্যন্ত ধুরন্ধর প্রকৃতির। নিজের পরিচয় লুকিয়ে দ্রুত হাইলাইটস হওয়ার জন্য কলেজ জীবন থেকে জড়িয়ে পড়েন বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের কার্যক্রমে।

কক্সবাজার সরকারি কলেজে এইচএসসিতে পড়ার সময়ে শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলোর সংগঠন বন্ধুসভার কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বর্তমানে বন্ধুসভা কক্সবাজার জেলা শাখার অর্থ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও ওমেন লার্নিং সেন্টার এবং মার্কি ফাউন্ডেশন, স্কাউটসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত।

জানা গেছে, খুশির পরিবার এখনো রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থান করছে। তার বাবাকে রোহিঙ্গা শিবিরে রোহিঙ্গা ডাকাত হিসেবে চিনে সবাই। ২০১৭ সালে আসা রোহিঙ্গা ঢলেও খুশির অনেক আত্মীয়-স্বজন চলে এসেছে। খুশির হাত ধরে গত কয়েকবছরে রোহিঙ্গা শিবির থেকে তার অনেক আত্মীয়-স্বজন কক্সবাজার শহরে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। অনেকে চট্টগ্রাম শহরেও বসতি গড়ে তুলেছেন। খুশি শহরের বাহারছড়া এবং কালুরদোকান এলাকার দুটি বাসাতে থাকেন। এ বাসা দুটি তার নিকটাত্মীয়দের বলে জানা গেছে।

এদিকে খুশির রোহিঙ্গা পরিচয় ফাঁস হওয়াতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হৈচৈ পড়ে যাওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে প্রথম আলোর বন্ধুসভা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বন্ধুসভা কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি ইব্রাহিম খলিল ও সাধারণ সম্পাদক ফারিয়াল মৌমিতা মোস্তফা পুষ্পি যৌথ বিবৃতি দিয়ে খুশিকে বন্ধুসভা থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেন। খুশি বাংলাদেশী নাগরিক প্রমাণে ব্যর্থ হলে চূড়ান্তভাবে বহিস্কার করা হবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে রহিমা আকতার ওরফে রাহী ওরফে খুশি একুশে পত্রিকাকে বলেন, আপনারা যা বলছেন এসব মিথ্যা। আমি বাংলাদেশের নাগরিক। জন্মনিবন্ধন কিভাবে করা হয়েছে জানতে চাইলে রাহি বলেন, আমার মাথা ব্যাথা করছে। পরে কথা বলবো।

বন্ধুসভার বিবৃতি :
প্রথম আলো বন্ধুসভা কক্সবাজার জেলা কমিটির অর্থ সম্পাদক পদ থেকে রাহিমা আকতার খুশিকে সাময়িক অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে রোহিঙ্গা তরুণী হিসেবে খুশিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে আজ মঙ্গলবার বিকালে বন্ধুসভার এক জরুরী সভা প্রথম আলো আঞ্চলিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে খুশিকে সাময়িক অব্যাহতি দেয়া হয় এবং পরবর্তীতে খুশি বাংলাদেশী প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলে তাকে স্থায়ীভাবে বন্ধুসভা থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

প্রথম আলোর পাঠক সংগঠন বন্ধুসভা। সারাদেশে শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশে গণিত অলিম্পিয়াড, ভাষা উৎসব, ইন্টারনেট উৎসব, বিতর্ক উৎসব, ফিজিক্স অলিম্পিয়াড, বিজ্ঞানমেলাসহ বিভিন্ন কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছে। তাছাড়া এসিড সন্ত্রাস ও মাদকবিরোধী প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তা কক্সবাজারের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ অবগত। কক্সবাজারের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অন্তত ৩০০ শিক্ষার্থী বন্ধুসভার সদস্য। সদস্যরা সকলক্ষেত্রে সৃজনশীল এবং মেধাবী শিক্ষার্থী।

শিক্ষার্থীদের কেউ বন্ধুসভার সদস্য হতে হলে প্রথমে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়নরত শিক্ষাসনদ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র দেখা হয়। তারপর যাচাই-বাছাই শেষে বন্ধুসভার সদস্যপদ দেয়া হয়। খুশির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। কিন্তু পরিচয় গোপন করে খুশি যদি জন্মসনদ কিংবা শিক্ষাসনদ আদায় করে থাকে তার দায় বন্ধুসভার নয়।

বন্ধুসভার সকল সদস্য মেধাবী ও সৃজনশীল মননে গড়ে উঠা শিক্ষার্থী। তারা অন্ধকারকে দূরে ঠেলে বাংলাদেশের জয় দেখতে চায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আলোকিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বন্ধুসভা অঙ্গীকারাবদ্ধ। এনিয়ে কাউকে বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।