সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ৬ কার্তিক ১৪২৬

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অর্ধশত অনুমোদনহীন বিদেশি এনজিও

তদারকিতে উদাসীন সংশ্লিষ্ট প্রশাসন

প্রকাশিতঃ রবিবার, সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৯, ১০:১৪ পূর্বাহ্ণ


কক্সবাজার: কমিউনিটি পার্টনার ইন্টারন্যাশনাল (সিপিআই)। সরাসরি মিয়ানমার ভিত্তিক এই এনজিও দীর্ঘদিন কক্সবাজারে অবস্থান করে রোহিঙ্গা শিবিরে কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে শহরে বিশাল ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে অত্যাধুনিক কার্যালয়ও খুলে বসেছে। অথচ রোহিঙ্গা শিবিরে কাজ করার জন্য সরকারি বা সরকারের কোন দপ্তরের অনুমোদন নেই এনজিও’টির। প্রকাশ্যে কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেলেও এই এনজিও’র বিরুদ্ধে প্রশাসনকে কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।

শুধু সিপিআই নয়, এরকম আরও অন্তত অর্ধশত বিদেশি এনজিও কক্সবাজারে অফিস খুলে বসেছে। অনুমোদন ছাড়াই দেদারছে কাজ করে যাচ্ছে রোহিঙ্গা শিবিরে। অনুমোদন না থাকায় রোহিঙ্গা শিবিরে কি নিয়ে কাজ করছে, কোথায় কাজ করছে এসবের কোন হিসাব বা তথ্য নেই প্রশাসনের কাছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় অনুমোদনহীন এনজিও’র বিরুদ্ধে তথ্য পেলেও কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি সরকারের কোন সংস্থাকে। এক্ষেত্রে এনজিও ব্যুরো আরও বেশি উদাসীন। দায়িত্বশীলদের উদাসীন আচরণের কারণে রোহিঙ্গা শিবির ঘিরে দিনদিন সমস্যা বৃদ্ধি করছে এসব এনজিও।

অভিযোগ রয়েছে, বিদেশি অনুমোদনহীন এসব এনজিও রোহিঙ্গা শিবিরে প্রোটেকশন, হেলথ বা ত্রাণ সরবরাহের মত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে কাজ করার চেয়ে বেশি কাজ করে প্রত্যাবাসন বিরোধী অপপ্রচার, শিবিরের তথ্য পাচার এবং উগ্রপন্থাসহ নানা অপরাধমূলক বিষয়ে। রোহিঙ্গা শিবিরে প্রবেশের ক্ষেত্রে তারা স্থানীয় এনজিওগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। স্থানীয় এনজিওগুলোও সঠিকভাবে যাচাই বাছাই না করে অনুমোদনহীন এসব এনজিও’র কাছ থেকে মোটা অংকের ডোনেশান নিয়ে দিনদিন পকেট ভারী করছে। আর এই সুযোগে অসৎ উদ্দেশ্যে হাসিল করছে বিদেশি এনজিওগুলো।

জানা গেছে, সংকটের শুরুর দিকে কিছু কিছু অনুমোদনহীন বিদেশি এনজিও স্থানীয় এনজিওগুলোর সাথে পার্টনারে কাজ করলেও কক্সবাজারে অফিস খুলে বসার সাহস পায়নি। কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর উদাসীনতা চরম পর্যায়ে পৌছে যাওয়ায় এখন কক্সবাজারে অফিস খুলে দেদারছে কাজ করে যাচ্ছে অনুমোদন পাওয়া এনজিও’র মত করে। এছাড়াও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও কিছু কিছু অনুমোদনহীন এনজিওকে রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মকান্ড চালানোর সুযোগ করে দেয়ার অভিযোগ আছে।

সূত্রমতে, সিপিআই সরাসরি মিয়ানমারের এনজিও। এই এনজিও আমেরিকার ঠিকানা ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রবেশ করলেও পরে তাদের পর্দা ফাঁস হয়ে যায়। তারা মূলত শুরু থেকেই প্রত্যাবাসন বিরোধী কাজে জড়িত। একই সাথে রোহিঙ্গাদের নিয়ে সরকারের কর্মকৌশল মিয়ানমারের কাছে পাচার করে তারা।

এদিকে গত ২২ আগষ্ট প্রত্যাবাসনে হোঁচট এবং ২৫ আগষ্ট রোহিঙ্গা শিবিরে বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে নড়েচড়ে বসেছে সরকার। সাম্প্রতিক সময়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিভিন্ন মাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে সরকার রোহিঙ্গাদের নিয়ে এতদিন ধরে চলে আসা নীতি থেকে কিছুটা হলেও সরে এসেছে। একই সাথে শরণার্থী কমিশনে হঠাৎ ব্যাপক পরিবর্তন আনার কারণে মাঠ পর্যায়েও নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। গুঞ্জন উঠেছে কক্সবাজারে প্রশাসনে আরও পরিবর্তন ঘটতে পারে রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে। যা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

হঠাৎ শরণার্থী কমিশনে ব্যাপক পরিবর্তন ও সরকারের নীতি কিছুটা পরিবর্তনের পর থেকেই মূলত কথা উঠছে অনুমোদনহীন বিদেশি এনজিওসহ বিভিন্ন এনজিও’র বিষয়ে। যারা প্রত্যাবাসন বিরোধী কাজে জড়িত। ইতোমধ্যে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করে এরকম অর্ধশত এনজিও’র হদিস পেয়েছে। যারা অনুমোদন ছাড়াই কক্সবাজারে অফিস খুলে কাজ করে যাচ্ছে। এরমধ্যে ৩২ টি এনজিও’র তথ্য হাতে এসেছে।
এনজিওগুলো হল- সিপিআই, মুসলিম হ্যান্ডস, মোয়াস, হিউম্যান টেরা, গিফটিং হিউম্যানিটি, এসিটি, আল ইশান, ডিভাইন ইন্টিগ্রেটেড ডেভলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, আল ইনসাফ, সোস্যাল এইড, ওয়ান নেশন, কো-অর্ডিনেশন হিউম্যানিটেরিয়ান এসিসটেন্স (সিএইচএ), আইটিএম, মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ, লিগ্যাল অ্যাকশন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড (এলএডবিøউ), ইসরাইল ভিত্তিক এনজিও ইশরা এইড, উইকেয়ার, স্মল কাউন্ডনেস বাংলাদেশ (এসকেবি), এসএমটি, হেল্প দুনিয়া, সানিক, এসকেটি ওয়েলফেয়ার, পাকিস্তান ভিত্তিক এনজিও আল খিদমাত ফাউন্ডেশন, এমডিএম, পিপল ইন নিড (পিন), ইসরা ইউকে, ওয়ানহোপ ফাউন্ডেশন, এইচএমবিডি, ওয়েট অ্যান্ড সি, রিভাত, শূরা ও আলখায়ের ফাউন্ডেশন প্রমুখ। এরমধ্যে কিছু এনজিও’র অফিস কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন এলাকায় আর কিছু এনজিও’র অফিস উখিয়ায় অবস্থিত। অফিসের ঠিকানা এ প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত আছে।

কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক তোফায়েল আহমেদ বলেন, কিছু কিছু এনজিও প্রত্যাবাসন চায় না, একথা দিনের আলোর মত সত্য। বিশেষ করে যেসব বিদেশি এনজিও সরকারের অনুমোদন না পাওয়া স্বত্বেও রোহিঙ্গা শিবিরে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে তারা এ কাজ আরও বেশি করছে। অনুমোদনহীন বিদেশি এনজিও’র রোহিঙ্গা শিবিরে কাজ করাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে প্রত্যাবাসন তৎপরতা বা কোন উদ্যোগে সরকার সফল হবে বলে মনে হয় না।

আমরা কক্সবাজারবাসী সংগঠনের সমন্বয়ক এইচএম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের নিয়ে সরকারের যেসব দপ্তর বা সংস্থা কাজ করে আমার হয় তাদের মধ্যে কোন ধরণের সমন্বয় নেই। ডিসি অফিসের কাছ থেকে অনুমোদন নিয়ে এনজিওগুলো রোহিঙ্গা শিবিরে কাজ করার কথা থাকলেও অনেকক্ষেত্রে সেরকম হয় না। এনজিও ব্যুরো বা ডিসি অফিসের অনুমোদন না নিয়েও রোহিঙ্গা শিবিরে অনেক এনজিও কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু রোহিঙ্গা শিবিরে শরণার্থী কমিশনের নিয়োজিত ম্যাজিস্ট্রেট বা অন্যকোন কর্মকর্তা তাদেরকে বাঁধা দেয় না। এর থেকে বুঝা যায় শরণার্থী কমিশনের কেউ না কেউ অনৈতিক সুবিধা নিয়ে অবৈধ এনজিওগুলোকে কাজ করার সুযোগ দিচ্ছে। বা স্থানীয় প্রশাসনও একাজে জড়িত থাকতে পারে।’

যারা অনুমোদনহীন বিদেশি এনজিওগুলোকে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে বা দিচ্ছে এবং যেসব স্থানীয় এনজিও পার্টনারে তাদের কাজ বাস্তবায়ন করছে তাদেরকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবী জানান তিনি।

এনজিও ব্যুরোর কাছ থেকে অনুমোদন ছাড়া বিদেশি কোন এনজিও’র রোহিঙ্গা শিবিরে কাজ করা এবং অফিস করার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘অনুমোদনহীন বিদেশি এনজিও কাজ করার বিষয়টি ইতোমধ্যে জেনেছি। খোঁজখবর নিয়ে তালিকাও পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এনজিও ব্যুরোকে লিখিতভাবে জানানো হবে। কার সহায়তায় বা কিভাবে তারা কাজ করছে সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

কামাল হোসেন বলেন, ‘অনেক বিদেশি ট্যুরিস্ট ভিসায় রোহিঙ্গা শিবিরে কাজ করে বলে খবর জানা গেছে। এরকম যদি হয়ে থাকে তাহলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর মাধ্যমে দ্রæত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে পুরোপুরি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার মো. আব্দুল মান্নান। তিনি বুধবার রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে সেখানে শরণার্থী কমিশন, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসনহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সাথে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি এ তাগাদা দেন।