শনিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩০ ভাদ্র ১৪২৬

কোরিয়ায় বাংলাদেশিদের অপার সম্ভাবনা

প্রকাশিতঃ সোমবার, সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৯, ১০:১২ অপরাহ্ণ

 

মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী : দক্ষিণ কোরিয়া বর্তমানে বিশ্বে উন্নত দেশের তালিকায় উপরের দিকের একটি দেশ। অর্থনৈতিক শক্তির বিবেচনায় ১ দশমিক ৬১৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার জিডিপি আকার নিয়ে এ দেশটির অবস্থান বিশ্বে ১১তম এবং এশিয়া মহাদেশের মধ্যে ৪র্থ তম।

১৯৬০ এ দক্ষিণ কোরিয়ার মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৭৯ মার্কিন ডলার। সেখান থেকে ৫৮ বছরের ব্যবধানে দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজার ২৪৫ মার্কিন ডলার। খুব অবাক হতে হয় মাত্র ৯৯ হাজার বর্গ কিলোমিটার একটি দেশ (যার ৭০ ভাগ হচ্ছে পাহাড়-পর্বত) প্রায় কোনো রকম প্রাকৃতিক সম্পদ ছাড়াই শুধু মানুষকে সম্পদে পরিণত করে আজ এ অবস্থানে পৌঁছেছে।

বিশ্ব উদ্ভাবনী র‌্যাংকিংয়ে (Innovation Index) দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষ অবস্থান দখল করে আছে। একটুখানি খোঁজ নিলেই দেখা যাবে. এ উন্নতির পেছনে লুকায়িত আছে কোরিয়ানদের শিক্ষাক্ষেত্রে প্রচুর বিনিয়োগ তথা মানুষকে সম্পদে পরিণত করার তাড়না। সেই সাথে নিজেদেরকে উদ্যোক্তা হিসাবে গড়ে তোলার মানসিকতা।

“চাকরি করবো না, বরং চাকরি দেবো”- এ মানসিকতায় বেড়ে উঠা দক্ষিণ কোরিয়ায় এখন বিশ্বের প্রায় ১৬টি দেশের দক্ষ/আধাদক্ষ শ্রমিক তাদের শ্রম দিচ্ছে, যা এ দেশটির অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ১৩ হাজারের মতো বাংলাদেশী নারী-পুরুষ কর্মী বিভিন্ন ধরনের কাজে নিয়োজিত আছেন। তাদের বেশির ভাগই ২০০৮ সালে প্রবর্তিত Employment Permit System (EPS) এর আওতায় এ দেশে এসেছেন।

দক্ষিণ কোরিয়ায় যারা EPS এর আওতায় কাজের জন্য এসেছেন তারা অন্যান্য দেশের শ্রমিক ভাইদের কাছে খুবই ইর্ষার পাত্র। কেননা দক্ষিণ কোরিয়া বেতন ভাতা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি এবং মেডিকেল ইন্সুরেন্স, ছুটি, পেনশন সুবিধাসহ অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রেও অন্য দেশের বিবেচনায় খুবই ভাল। সর্বোপরি কোরিয়ার কারখানাগুলোর উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার বাংলাদেশি শ্রমিক ভাইদের দক্ষ মানবশক্তিতে পরিণত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। চাকরি থেকে সঞ্চয়কৃত বেশ ভাল পরিমাণের অর্থ, সাথে চাকরিকালীন সময়ে আয়ত্ত করা দক্ষ প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তির ব্যবহার সংক্রান্ত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে এই কর্মী ভাই-বোনদের বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

বিগত বছর খানেক ধরে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে বাংলাদেশে ফেরত যাওয়া কর্মীদের উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় বিষয়ে ধ্যান-ধারণা প্রদানের উদ্দেশ্যে সেমিনার আয়োজন করা হচ্ছে। উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো হচ্ছে- প্রথমত নিজের মধ্যে সাহস সঞ্চার করা- যা সম্ভব হবে বাংলাদেশের বাজার সম্পর্কে বেশি বেশি তথ্যসংগ্রহ করার মাধ্যমে; দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের ভোক্তাশ্রেণীর পছন্দ-অপছন্দ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি সম্পর্কে ধারণা নিয়ে সম্ভাব্য পণ্যটি নিয়ে তাদের সামনে হাজির করা; তৃতীয়ত উৎপাদিত পণ্য বা সেবা প্রদানের নতুনত্ব আনয়ন করা; চতুর্থত বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে বাংলাদেশের বাজার-উপযোগী লাগসই পণ্য/সেবা উৎপাদন করে বাজারে নিজের অবস্থান দৃঢ় করত হবে।

এ ক্ষেত্রে পুরোনো সফল উদ্যোক্তাদের আজকের এ অবস্থানে আসার পেছনের ইতিহাসগুলো সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে। উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নিজের এবং নিজের দেশ সম্পর্কে পজিটিভ মানসিকতার ধারণা রাখা।

বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের রয়েছে ১৬ কোটি মানুষের একটি বিশাল বাজার। স্বাধীনতার পর থেকে যারা বিভিন্ন দেশে কর্মের প্রয়োজনের পাড়ি জমিয়েছেন তাদের জন্য এখন সুযোগ এসেছে দেশে ফিরে সরকারের দেয়া ব্যবসা-বিনিয়োগবান্ধব সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজের এবং পরিবারের আর্থিক উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের উন্নয়নে শরীক হওয়ার।

খুবই আশার কথা হচ্ছে, সাম্প্রতিক কালে দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাসকারী বাংলাদেশিদের মধ্যে অনেকেই এ উদ্যোগে শামিল হয়েছেন এবং উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। সামনের দিনগুলো আরো অনেকেই এ মিছিলে শরীক হলে ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ-দেশ সবাই উপকৃত হবে। আমরা অপেক্ষায় আছি সেই দিনের।

লেখক : কাউন্সেলর (বাণিজ্য উইং), বাংলাদেশ দূতাবাস, সিউল, দক্ষিণ কোরিয়া