বুধবার, ২৭ মে ২০২০, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

পাকিস্তানি ব্যাংকে টাকা রাখা ‘সেই জাকিরকে’ পদোন্নতি দিচ্ছে চট্টগ্রাম ওয়াসা

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৯, ৭:৫৫ অপরাহ্ণ

শরীফুল রুকন: আর্থিক দুর্নীতি করে পাকিস্তানের হাবিব ব্যাংকে চট্টগ্রাম ওয়াসার টাকা জমা রাখা ও সরকারের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকির হোসেন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া দূরে থাক তাকে পদোন্নতি দিতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম ওয়াসা।

আগামীকাল বুধবার চট্টগ্রাম ওয়াসার উচ্চতর পদোন্নতি বোর্ড (এসএসবি) এর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (পানি সরবরাহ) মো. ইব্রাহিম, ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সচিব ও দুইজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক অংশ নেবেন।

এতে এজেন্ডা রাখা হয়েছে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকির হোসেন ভূঁইয়াকে ভারমুক্ত করে প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদে বসানোর সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গটি।

এর আগে ২০১৬ সালের ১৮ আগস্ট ‘চট্টগ্রাম ওয়াসার টাকা পাকিস্তানের ব্যাংকে’ শিরোনামে একুশে পত্রিকায় একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। একই বছরের ২৬ আগস্ট ‘অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মানছে না চট্টগ্রাম ওয়াসা’ শিরোনামে আরেকটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে একুশে পত্রিকা। একই বিষয় তুলে ধরে পরে আরো বিভিন্ন গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করে।

এসব প্রতিবেদনের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মোহাম্মদ ফারক-উজ-জামান ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বরাবর একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে অভিযোগের বিষয়ে মতামত জানানোর জন্য চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে অনিয়ম খতিয়ে দেখতে চট্টগ্রাম ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে (প্রকৌশল) আহ্বায়ক ও সচিবকে সদস্য করে দুই সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে চট্টগ্রাম ওয়াসা। পরে তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদন জমা দেয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে পাকিস্তানের ব্যাংক থেকে চট্টগ্রাম ওয়াসার টাকা সরিয়ে নেয়ার পাশাপাশি আর্থিক দুর্নীতিতে জড়িত থাকায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকির হোসেন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়। তবে সুপারিশ অনুযায়ী পাকিস্তানের ব্যাংক থেকে টাকা সরিয়ে আনা হলেও জাকিরের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, ১৯৬৮ সালের ওয়াসা রেগুলেশন অনুযায়ী জাকির হোসেনের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদে পদোন্নতির যোগ্যতা নেই। এসএসসি থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত সব পরীক্ষায় তার তৃতীয় শ্রেণী। নিয়ম রয়েছে, এখানে পদোন্নতির ক্ষেত্রে একটি প্রথম শ্রেণী বাকিগুলোতে দ্বিতীয় শ্রেণী থাকতে হবে।

এছাড়া আগামীকাল বুধবার চট্টগ্রাম ওয়াসার উচ্চতর পদোন্নতি বোর্ডের বৈঠকে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে ভারপ্রাপ্ত উপসচিব নাজিম উদ্দিন চৌধুরীকে উপসচিব পদে পদোন্নতি দেয়ার এজেন্ডাও রয়েছে, যিনি নগর জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ একই পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে নাজিম উদ্দিনের চেয়ে ২০ বছরের জ্যেষ্ঠ একজন কর্মকর্তা বঞ্চিত হচ্ছেন।

শুধু তাই নয়, সহকারী পাম্প অপারেটর পদে থাকা ২০-২৫ জনকেও পদোন্নতি দিয়ে পাম্প অপারেটর বানানোর এজেন্ডাও রয়েছে বুধবারের চট্টগ্রাম ওয়াসার উচ্চতর পদোন্নতি বোর্ডের বৈঠকে। একজন সিবিএ নেতার মাধ্যমে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তাদের পাম্প অপারেটর বানানোর আয়োজন চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসময় ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসা পানির চাহিদা মেঠালেও বর্তমানে সেই অবস্থা নেই। ওয়াসা পানি সরবরাহ করছে মদুনাঘাট পানি শোধনাগার ও শেখ হাসিনা পানি শোধনাগারের মাধ্যমে। বর্তমানে ৯০ শতাংশ পানির পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে। এমন অবস্থায় সহকারী পাম্প অপারেটরদের পাম্প অপারেটর বানানোর আয়োজন করেছে ওয়াসা। যে কাজের মানুষ দরকার নেই তাদেরকে পদোন্নতি দেয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে উচ্চতর পদোন্নতি বোর্ডের বৈঠকে প্রধান প্রকৌশলী, তিনজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও ছয়জন নির্বাহী প্রকৌশলীকে পদোন্নতি দেওয়ার এজেন্ডাও থাকছে। এবার ওয়াসায় পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। ৩০ বছর ধরে চাকরি করছেন, এমন কয়েকজনকে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (পানি সরবরাহ) ও চট্টগ্রাম ওয়াসার উচ্চতর পদোন্নতি বোর্ডে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি মো. ইব্রাহিম একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমি আগে মিটিংয়ে যাই, সেখানে এসব বিষয়ে আলোচনা করবো। এরপর আমি যথাযথ মতামত দেব। মিটিংয়ে যাওয়ার আগে এসব বিষয়ে বেশী কিছু বলতে চাই না।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম ফজলুল্লাহ একুশে পত্রিকাকে বলেন, এখন তো মিটিং হয়নি। মিটিংয়ের পরে যদি এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চান, তখন উত্তর দিতে পারবো। কাকে কাকে পদোন্নতি দেওয়া হবে, সে ধরনের এজেন্ডা কিছুই এখনো হয়নি। বলা হয়েছে, একটা প্রমোশন মিটিং হবে। এজেন্ডাগুলো তৈরী করে কালকে দেবে। সেখানে ১০-১৫টা পদোন্নতির ক্যাটাগরি আছে। কালকে মিটিংয়ে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি থাকবেন, আরো অন্যান্য লোক আছেন। সেখানে সুপারিশ আসবে, কাকে কাকে পদোন্নতি দেয়া যাবে।

তিনি আরো বলেন, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে কেউ পদোন্নতি পাবে না। চট্টগ্রাম ওয়াসায় জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে কেউ পদোন্নতি পায়নি এবং হবেও না। ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা জাকিরের আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে- এ বিষয়ে ওয়াসা এমডি বলেন, প্রশ্ন তো সবার বিরুদ্ধেই থাকে। কারো বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে পদোন্নতি দেয়ার ক্ষেত্রে এসব বিষয় নিশ্চয়ই আমাদের বিবেচনায় মধ্যে আসবে। পদোন্নতি তো এমনি এমনি হবে না।

একুশে/এসআর/এটি