শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬

আনোয়ারার রাজনীতিতে এপিএস-বন্দনা!

প্রকাশিতঃ শনিবার, অক্টোবর ৫, ২০১৯, ১১:০২ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : কথায় আছে ‘সূর্যের চেয়ে বালির তাপ বেশি’। এটি যেন হাড়ে হাড়ে প্রযোজ্য চট্টগ্রামের আনোয়ারার আওয়ামী রাজনীতিতে। অভিযোগ, স্থানীয় সাংসদ, ক্লিন ইমেজের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের চেয়েও ক্ষমতাবান তার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) রিদুয়ানুল করিম চৌধুরী সায়েম! মন্ত্রী নন, তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে অনেককিছু!

অভিযোগ রয়েছে, এপিএস সায়েম কোথাও গেলে উপজেলা পর্যায়ের সিনিয়র নেতারাও ছোটেন তার পেছন পেছন। রাজনৈতিক কোনো পদ-পদবী না থাকলেও রাজনৈতিক সভাতেও ৩২ বছর বয়সী সায়েম থাকেন মধ্যমণি। তার চেয়ার থাকে আলাদা, সবার চেয়ে বড়। ভূমিমন্ত্রীর এপিএসের বয়সের সমান যাদের রাজনীতির বয়স তারাও অজানা কারণে চুপচাপ সব মেনে যান। প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকেন।

কখনো ছাত্রলীগ না করা সায়েমের আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতি নিয়ে এমন স্বেচ্ছাচারী ভূমিকা ও আচরণের বিষয়ে ভূমিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইতিমধ্যে উল্টো খেসারতও দিতে হয়েছে সংশ্লিষ্টদের-এমন কথাও এখন মানুষের মুখে মুখে।

শুক্রবার (৪ অক্টোবর) বিকেলে আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের নবগঠিত আহ্বায়ক কমিটির সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। বৈরাগ ইউনিয়ন আওয়ামী পরিবারের উদ্যোগে উপজেলার কাফকো সেন্টারে এটি অনুষ্ঠিত হয়।

বৈরাগ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সোলায়মানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক এম এ মান্নান চৌধুরী প্রধান অতিথি থাকলেও প্রধান চেয়ারটি পান অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তা ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর এপিএস রিদুয়ানুল করিম চৌধুরী সায়েম। তার দুই পাশে ছোট চেয়ারে আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বসতে দেখা গেছে। অথচ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির রাজনীতির বয়স প্রায় ৩ দশক।

এছাড়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি ব্যানারেও দেখা গেছে এপিএস-বন্দনার চেষ্টা। দেখা যায়, প্রধান অতিথির নামের চেয়ে প্রধান বক্তার নামের ফন্ট অপেক্ষাকৃত বড় ও কালারফুল।

ওই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ মালেক, জেলা পরিষদের সদস্য এস এম আলমগীর চৌধুরী। পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে সবার চেহারা ছিলো মলিন। সায়েমের আলিশান আসনটির কাছে অন্যদের আসন ছিল ম্রিয়মাণ।

এভাবে আনোয়ারায় আওয়ামী রাজনীতির অন্দরমহলের ‘নেপথ্য নিয়ন্ত্রক’ রিদুয়ানুল করিম চৌধুরী সায়েম এখন খোলা মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়েছেন। রাজনৈতিক পদপদবী না থাকলেও রাজনৈতিক মঞ্চের বড় চেয়ারটিতে এভাবে তিনি বসে পড়েছেন। এ নিয়ে আনোয়ারায় চলছে তুমুল কানাঘুষা। বলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় নেতারা।

তাদের মতে, শুধু রাজনীতি নয়, সাংবাদিকদের সংগঠনে কে সভাপতি আর সাধারণ সম্পাদক হবেন তা-ও ঠিক করে দেন এপিএস সায়েম। সম্প্রতি স্থানীয়ভাবে বহুধাবিভক্ত সকল পক্ষকে এক কাতারে এনে ঐক্যবদ্ধ প্রেসক্লাব কমিটি গঠনের দাবি উঠে। ঠিক সেসময় একটি অংশকে নিয়ে এপিএস সায়েম রাতারাতি আনোয়ারা প্রেসক্লাবের কমিটি গঠন করে দেন বলে অভিযোগ ওঠে।

নতুন প্রেসক্লাব কমিটির নেতৃবৃন্দকে এজন্য ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও এপিএস রিদুয়ানুল করিম চৌধুরী সায়েমের প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কৃতজ্ঞতা জানাতেও দেখা যায়। এ নিয়ে গত ২ অক্টোবর একুশে পত্রিকায় ‘আনোয়ারা প্রেসক্লাবের রাজনৈতিক কমিটি শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর আনোয়ারার সংবাদকর্মীদের একটি বড় অংশ ফোন করে একুশে পত্রিকাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

এদিকে, গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে আনোয়ারা উপজেলা যুবলীগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণার পরের দিন নতুন আহ্বায়ক কমিটির নাম ঘোষণা হয় কেন্দ্র থেকে। এতে বিলুপ্ত কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শওকত ওসমানকে আহ্বায়ক, অনুপম চক্রবর্তী বাবু ও আবদুল মালেককে যুগ্ম আহ্বায়ক করে ২৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির নাম ঘোষণা দেয় কেন্দ্রীয় যুবলীগ।

অভিযোগ ওঠেছে, ওই কমিটির সবাই রিদুয়ানুল করিম চৌধুরী সায়েমের পছন্দের। আর তার বিরুদ্ধে থাকায় কমিটি থেকে সাধারণ সম্পাদক এএইচএম ওসমান গণি রাসেল বাদ পড়েছেন।

এর আগে ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল আসহাব উদ্দিনকে সভাপতি ও এএইচএম ওসমান গণি রাসেলকে সাধারণ সম্পাদক করে ৯০ সদস্যবিশিষ্ট উপজেলা যুবলীগের কমিটি ঘোষণা করে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা যুবলীগ। কিন্তু আসহাব উদ্দিনের সাথে সায়েমের বনিবনা না হওয়ায় তাকেও সরিয়ে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয় শওকত ওসমানকে। সবমিলিয়ে বর্তমানে পুরো আনোয়ারা যুবলীগই সায়েমের নিয়ন্ত্রণে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আনোয়ারার রাজনীতিতে সায়েমের কথাই প্রথম ও শেষ। তাঁর বিরুদ্ধে গেলেই রাতারাতি শেষ পদ-পদবি। ফলে অনেকেই ভূমিমন্ত্রীর চেয়ে সায়েমকে সমীহ করে চলেন। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ চলছে তার কথায়। ফলে বিভিন্ন সময়ে সায়েম হয়ে যান রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও প্রধান বক্তা।

যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সংবর্ধনায় প্রধান চেয়ারে বসার অভিযোগের বিষয়ে ভূমিমন্ত্রীর এপিএস রিদুয়ানুল করিম চৌধুরী সায়েম একুশে পত্রিকাকে বলেন, প্রধান চেয়ারে সাময়িকভাবে বসে ছিলাম। আমি ছোট চেয়ারে বসেছি এমন ছবিও আছে। আসলে বক্তব্য দেওয়ার সময় একেকজন একেক চেয়ারে বসেছিল।

নিজের পছন্দের নেতাদের যুবলীগের কমিটিতে স্থান পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটার জবাব মন্ত্রী মহোদয় নিজেই দিতে পারবেন। কারণ মন্ত্রী মহোদয়ের সুপারিশে কেন্দ্র থেকে যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটি দেওয়া হয়েছে। আসলে আহ্বায়ক কমিটি হওয়ায় অনেকে পদ-পদবি পাননি, তাদের ক্ষোভ থাকবেই। এ নিয়ে দলের ভেতরে কোন্দল থাকতে পারে বা কেউ হতাশ হতে পারে, এজন্য কথাগুলো আসছে। পূর্ণাঙ্গ কমিটি হলে সবার ক্ষোভ দূর হবে।

উল্লেখ্য, ভূমিমন্ত্রী ও আনোয়ারা এবং কর্ণফুলী আসনের সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হিসাবে দেশের বাইরে অবস্থান করায় এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।