বুধবার, ২৭ মে ২০২০, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

বঙ্গবন্ধুর চিঠিতে চাকরি, তারপর দেশসেরা শিল্পপতি

প্রকাশিতঃ শনিবার, নভেম্বর ২৩, ২০১৯, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম : কাজী আকরাম উদ্দীন আহমেদ। দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতিদের একজন। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর সাবেক এ সভাপতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য।

সম্প্রতি নগরের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের বঙ্গবন্ধু কনফারেন্স হলে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য উপ কমিটি আয়োজিত ‘শিল্প ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে উন্নয়নের এক দশক’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি তুলে ধরেন তাঁর উঠে আসার নেপথ্য ঘটনা। বলেন বঙ্গবন্ধুর চিঠিতেই তাঁর প্রথম চাকরি হয়েছিল।

সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে মাস্টার্স পাশ করার পর একদিন বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গেলাম। উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমি কী করি। উত্তরে বললাম, সবেমাত্র মাস্টার্স শেষ করলাম। বর্তমানে একটা বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতা করছি। এরপর বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞেস করলেন কতটাকা বেতন পাই। আমি বললাম,২০০ টাকা। তখন উনি আমাকে বললেন, তুমি চট্টগ্রাম চলে যাও। আরও বেশি উপার্জন করতে পারবে। তোমাকে আমি চট্টগ্রাম পাঠাবো। এই বলে উনি গাড়িতে উঠতে বললেন। গাড়ির নাম্বার ছিলো evd111। উনি আমাকে নিয়ে নিজে গাড়ি চালিয়ে শাহবাগ হোটেলে এলেন। তখন ঢাকায় হোটেল বলতে ঐ শাহবাগ হোটেলই ছিলো। ওখানে ঢুকে ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করলেন মোহাম্মদীয়া গ্রুপের ইব্রাহিম মোহাম্মদ ভাই কি আছেন। ম্যানেজার জানালো, উনি তো একটু আগেই চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে বিমানবন্দর চলে গেছেন। এরপর বঙ্গবন্ধু আমাকে নিয়ে হোটেল থেকে বের হয়ে এয়ারপোর্টের দিকে গাড়ি টান দিলেন। এয়ারপোর্টের কাছাকাছি এম আর খানের একটি বাড়ি ছিলো। সেখানে গাড়ি থামালেন বঙ্গবন্ধু। আমাকে সেখানে নামিয়ে দিয়ে বললেন, আগামীকাল সকালে যেন আমি বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করি। উনি একটা চিঠি লিখে দেবেন। তারপরদিন গেলাম। উনি চিঠি লিখে দিলেন। সেই চিঠি নিয়ে চলে এলাম চট্টগ্রামের নাসিরাবাদের মোহাম্মদীয়া স্টীল গ্রুপে। উনাদের প্রধান প্রকৌশলী ও জেনারেল ম্যানেজার আমার একটা পরীক্ষা নিলো। আমি উত্তীর্ণ হলাম। তো সেদিনের সেই বঙ্গবন্ধুর চিঠিতে আমার চাকরি হয়েছিলো। ভাবা যায়! বঙ্গবন্ধু শুধু দেশ ও জাতির জন্য শুধু দিয়েই গেছেন। উনি একটা দেশ দিয়েছেন, একটা জাতি দিয়েছেন। আর আমাকে দোয়া করে গেছেন। সেই দোয়াই আজকে আমাকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে।

নিজের চট্টগ্রামপ্রীতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেকেই আমাকে বলেছেন, আমি কেন ঢাকা যাই না। আমি বলি, ও আর নিজাম রোডের বাসাটাতে ঘুমাতে পারলেই আমার শান্তি। অনেকেই চট্টগ্রামে কামাই করে ঢাকায় গিয়ে বসতি গড়ে। আমি কিন্তু তা করিনি। আমার দুই মেয়ে এক ছেলে। এদের মধ্যে এক মেয়ে ও একমাত্র ছেলেকে চট্টগ্রামে বিয়ে দিয়েছি। এই কথা বললাম এই কারণে, অন্যদের চেয়ে চট্টগ্রামপ্রীতি আমার একটু বেশি। আজকে আমার নাতি হয়েছে। তার মানে আমার রক্তও এখন চট্টগ্রামের সাথে মিশেছে। আমি অনেককেই দেখেছি, চট্টগ্রামের লোক হয়ে চট্টগ্রামকেই হেয়প্রতিপন্ন করে। এটা দুঃখজনক।

বঙ্গবন্ধুর কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বাধে। অনেকেই বলছিলো এই দেশে যুদ্ধের প্রভাব পড়বে। তখন আমি চট্টগ্রামে ছিলাম। তখন দেখেছি বঙ্গবন্ধু দেশের স্বার্থ রক্ষার্থে চট্টগ্রামে ৬ দফা ঘোষণা করেন। সেদিন স্বচক্ষে দেখেছি চট্টগ্রামকে কী পরিমাণ ভালোবাসেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিয়ের পর প্রথম সংবর্ধণা এই চট্টগ্রামেই দেয়া হয়। তখন ব্যারিস্টার সুলতান সাহেব তাঁর মাজদা গাড়ি দিয়ে নেত্রীকে চড়িয়ে দামপাড়া গিয়ে সংবর্ধণা দেয়। সে এক সোনালী দিন ছিলো।

দেশের উন্নয়নের প্রেক্ষাপট আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, আমি প্রথম ওমরা করতে যাই ১৯৮০ সালে। তখন মক্কা মদিনায় এখনকার মতো এতো স্থাপনা ছিলো না। তারা আমাদের দেশের মানুষদের বলতো ‘কুল্লু মিসকিন’। মানে ভিখারি। অথচ সেই আরবরাই একসময় আমাদের দেশে তসবিহ ,জায়নামাজ, খেজুর এসব বিক্রি করতে আসতো। আর এখন দৃশ্যপট অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের মিসকিন বলা সেই আরবরাই এখন আমাদের দেশে বিনিয়োগ করছে। অনেকের ধারণা সৌদি আরবের সাথে বেগম খালেদা জিয়ার সম্পর্ক খুব ভালো। কিন্তু খালেদার সম্পর্ক আর আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনার সম্পর্ক এক নয়। আমাদের দেশ উন্নয়নে শুধু সৌদি আরব নয়, সারাবিশ্বেই রোল মডেল।

চট্টগ্রামের প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভালোবাসার উপমা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ২০১৪ সালে চীনে গিয়েছিলাম নেত্রীর সাথে। সেখানে টানেল নিয়ে চীনের সাথে বাংলাদেশের চুক্তি হবে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের সচিব খন্দকার নুরুল ইসলাম, চট্টগ্রামের নুরুল ইসলাম বিএসসি সেই সময় সাথে ছিলেন। তখন তিনি মন্ত্রী হননি।

সেদিন খন্দকার নুরুল ইসলাম আমাকে বললেন, আপনাদের চট্টগ্রামের টানেলের চুক্তিতো একটু পরেই স্বাক্ষর হবে। এরপর দুপুরে খাওয়ার আগেই চুক্তিপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বৈঠক থেকে বের হলেন নেত্রী। বের হয়ে নেত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসিকে বললেন, কী ইসলাম সাহেব! চট্টগ্রামকেই তো সব দিয়ে দিলাম। দেখুন চট্টগ্রামকে নেত্রী কতো ভালোবাসেন।

একুশে/এইচআর/এটি