শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২০, ২১ চৈত্র ১৪২৬

‘নিজ বাড়িতেই ১০০ ভোট, নিজ কেন্দ্রে পেয়েছি ৮ ভোট!’

‘নগরে নির্বাচন’ অনুষ্ঠানে ডা. শাহাদাতের আক্ষেপ

প্রকাশিতঃ রবিবার, ডিসেম্বর ১, ২০১৯, ১১:০৮ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে কর্ণফুলীর তলদেশে টানেলকে কেন্দ্র করে ওয়ান সিটি টু টাউনের যে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সেই পরিকল্পনা বিএনপির বলে দাবি করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন।

তিনি বলেন, আমরাই প্রথম সে পরিকল্পনা গ্রহণ করি। এছাড়া চীন থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সাথে যে সিল্ক রুট হবে তাও কিন্তু আমাদের পরিকল্পনায় ছিলো। মূলত তখনই আমরা টানেল, মাতারবাড়িতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দরের পরিকল্পনা হাতে নিই।

সম্প্রতি একুশে পত্রিকার নিয়মিত আয়োজন ‘নগরে নাগরিক’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন ডা. শাহাদাত হোসেন।

তিনি বলেন, আমরা যখন ক্ষমতায় তখন চট্টগ্রামের মেয়র ছিলেন এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। সেসময় আমরা তাঁর কাছে বেশকিছু প্রস্তাবনা দিয়েছিলাম। চট্টগ্রাম থেকে আবদুল্লাহ আল নোমান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন মন্ত্রী ছিলেন। পক্ষান্তরে মেয়র মহিউদ্দিন ছিলেন বিরোধী দলের নগর সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু আমরা দলাদলি ও ক্ষুদ্রস্বার্থ পরিত্যাগ করে চট্টগ্রামের উন্নয়নের স্বার্থে মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীকে সহায়তা করেছিলাম। আমরা একসাথে বিভিন্ন আমব্রেলা প্রজেক্টের মাধ্যমে কাজ করেছি। নগর পরিচালনা করতে গেলে মানসিক দৈন্যতা দূর করে বৃহৎ স্বার্থে কাজ করতে হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগের মধ্যে মানসিক দৈন্যতা ও রাজনৈতিক দৈন্যতা খুব বেশি।

যেমন মেয়র নাছির কিন্তু এখনো মন্ত্রীর মর্যাদা পাননি। এবং এটার জন্য আমি কখনো দেখিনি তাঁকে প্রতিবাদ করতে। বাকি সিটি কর্পোরেশনের মেয়ররা মন্ত্রীর পদমার্যাদা পেলেও উনি পাননি। তার মানে উনি নিজেও উনার অধিকার আদায় করতে পারছেন না। জনগণতো এটা বুঝতে পারছে। আর একটা বিষয় হলো চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিস্তর সমন্বয়হীনতা রয়েছে। যা জলাবদ্ধতা ইস্যুতে দৃশ্যমান। আর মেয়র আ জ ম নাছিরের উচিত ছিলো চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গদের নিয়ে চট্টগ্রামের উন্নয়নে কী কী করা যায় সে বিষয়ে পরামর্শ করা। কিন্তু তিনি তা করেননি। যোগ করেন ডা. শাহাদাত।

সিটি নির্বাচন প্রসঙ্গে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, আমি ২০১৫ ও ২০১০ সালে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলাম। আমার নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাকে বলেছিলেন ২০১০ সালের নির্বাচন করতে। যার কারণে আমি ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন করিনি। যাই হোক ২০১০ বা ২০১৫ সালে আমি নির্বাচন করতে পারিনি। তবে বাংলাদেশের এখন যে প্রেক্ষাপট, দেশে নির্বাচনের যে পরিস্থিতি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো নতুনভাবে সাজানো খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ নির্বাচন কতটুকু নিরপেক্ষ থাকতে পারছে সেটা একটা বিশাল প্রশ্ন। গত জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ আওয়ামীযন্ত্রে পরিণত হয়ে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন ২৯ তারিখ রাতেই করে ফেলেছে। আমাদের হাজার হাজার নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়। আমি নিজেই জেলে ছিলাম তিনমাস। ঢাকা থেকে আমাকে বিনাকারণে গ্রেফতার করা হয়। যে কারাগারে ধারণক্ষমতা তিন হাজার সেখানে এগারো হাজার বন্দি ছিলো সেসময় যা অত্যন্ত অমানবিক। তাই এবার যেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো জনগন কি তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছে? নাকি নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন মিলে ৩০ ডিসেম্বরের মতো আরেকটি নাটক মঞ্চস্থ করছে। যদি নির্বাচন কমিশন আওয়ামীযন্ত্র থেকে বের হয়ে সাধারণ জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে পারে তাহলে আমি নিজেকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করবো।

তিনি বলেন, আমি স্পষ্টই বলতে চাই, যদি সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেয়া না যায়, মানুষ যদি নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে আসতে না পারে তাহলে সে নির্বাচনে আমি অংশগ্রহণ করবো না। নির্বাচন এলেই আমাদের নেতাকর্মীদের অত্যাচার করা হবে, বিনাকারণে মামলা দেয়া হবে, তাদের মা-বোনদের নির্যাতন করা হবে। এটাই তো এখন এদেশের নির্বাচনে সংস্কৃতি হয়ে গেছে। মানুষ নির্বাচন করে কেন? নিজের জনপ্রিয়তা যাচাই করার জন্য। কিন্তু জোর করে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত করে যে নির্বাচন হয় সেটা নির্বাচন নয়, সেটা নির্যাতন। এই নির্যাতনের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

গত সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার অভিজ্ঞতা জানিয়ে ডা. শাহাদাত বলেন, নির্বাচনের দিন আমার আসনের ৩০ জন মহিলা এজেন্টকে ধরে থানায় নিয়ে গেছে। রাত নয়টায় তাদের বের করেছে। বাংলাদেশ তথা পৃথিবীর ইতিহাসে এমন নজির প্রথম। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হলো, আমার বাড়ি অর্থাৎ বিএড কলেজ কেন্দ্রে ইভিএম’এ আমি ভোট পেয়েছি মাত্র ৮টি। আর আমার বিরোধী প্রার্থী ভোট পেয়েছে সাড়ে তিন হাজার। অথচ ঐ এলাকায় আমার ৫০ বছর ধরে বসবাস। শুধু আমার বাড়িতেই ভোট আছে ১০০টি। ১০০টি বাদ দিলাম। আমার বাসাতেই তো ভোট আছে ১৮টা। অথচ আমি নাকি পেলাম ৮টা ভোট। আমি নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করি। এটাও বলি যে, আমি যে ৮টা ভোট পেলাম শুধু সেগুলোরই তথ্যউপাত্ত দিন। আমাকে দুই দিন অপেক্ষা করিয়ে রাখার পর তিনদিনের দিন তারা জানালো নির্বাচনের পরপরই ইভিএম-এর সমস্ত ডাটা ধ্বংস করা হয়। তো এই দেশে নিরপেক্ষ নির্বাচন কবে দেখা যাবে তা হচ্ছে সপ্তম আশ্চর্য। আওয়ামী লীগ সরকার এই জায়গায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ।

ডা. শাহাদাত বলেন, যে বিষয়ে আমার বেশি আপত্তি তা হলো ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ। দেখুন ইভিএম-এর জন্য ৪৬টি আসন থেকে ৬টি আসন লটারির মাধ্যমে বাছাই করা হয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো যখন লটারি করা হবে তখন নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট আসনের সকল প্রার্থী বা তার এজেন্টদের উপস্থিত থাকার জন্য জানাবে। কিন্তু আমাদের জানানো হয়নি। এমনকি লটারির দিন সাংবাদিকদেরও সেখানে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। তারপরও ইভিএম পদ্ধতি মেনে নিলাম। কিন্তু ভোটিং মেশিনে ভোটারস ভেরিফিকেশন অডিট রি ট্রায়াল সিস্টেম ছিলো না। যার ফলে আপনি ভোট ধানের শীষে দিলেন নাকি নৌকায় দিলেন সেটাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কিছু নেই। বিশ্বের কোথাও ইভিএম মেশিনে ২৫ শতাংশ ভোট প্রিজাইডিং অফিসার দিতে পারে এমন নিয়ম নেই। কিন্তু আমাদের দেশে তা হয়েছে। আমার চার লাখ ভোটারের মধ্যে এক লাখ ভোটার তো ঐ ২৫ শতাংশ ভোটের মাধ্যমেই চুরি হয়ে গেছে। বলা হয়েছিলো যেখানে ইভিএম মেশিন থাকবে সেখানে তিনজন করে সেনাবাহিনী অফিসার থাকবে। কিন্তু সেখানে ছিলো যুবলীগ ছাত্রলীগের ক্যাডার।

ইভিএম নামক ভোট চুরির মেশিন দিয়ে নির্বাচন কতটুকু সফল হবে! এই মেশিন আমাদের দেশের তৈরী না। এই মেশিন বাইরের তৈরি। যদি এমন হতো এটা আমাদের বুয়েটের প্রকৌশলীরা তৈরী করেছে তাহলে হয়তো ভাবা যেতো। কিন্তু এটা তো বাইরের দেশের একটি ভোট জালিয়াতির মেশিন।

‘নগরে নির্বাচন’ অনুষ্ঠানে এসে নিজের স্বপ্নের কথাও বললেন ডা. শাহাদাত। বললেন মেয়র হলে কী করবেন, কেমন করে সাজাবেন চট্টগ্রাম।

এ প্রসঙ্গে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, দেখুন চট্টগ্রামকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন। আমার শৈশব-কৈশোর এখানেই কেটেছে। আমি বাকলিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মহসিন কলেজ হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাশ করেছি। এই এলাকার প্রতিটি বালুকণা আমি চিনি। এই চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে জলাবদ্ধতা। এই শহরের ভৌগোলিক অবস্থানও এটার একটা কারণ। এটা নিয়ে আমার বেশকিছু পরিকল্পনা আছে। এছাড়া পর্যটনের দিক দিয়েও এই শহরের গুরুত্ব রয়েছে অনেক। কারণ এই শহরের উপর দিয়েই বান্দরবান যেতে হয়, কক্সবাজার যেতে হয়। এছাড়া শহরেই পতেঙ্গা সি-বিচসহ পর্যটনের অনেক স্থান রয়েছে। বলা যায়, পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে এই চট্টগ্রামে। আমি এই পর্যটনকে কেন্দ্র করে সারা বাংলাদেশের পট পরিবর্তন করতে চাই। আর এর জন্য দরকার ডায়নামিক নেতৃত্ব।