বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২০, ১ শ্রাবণ ১৪২৭

চট্টগ্রাম থেকে আ. লীগের প্রেসিডিয়াম মেম্বার ও ‘মৃত্যুর টিকিট’!

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, ডিসেম্বর ২৭, ২০১৯, ৯:২০ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : ২০১৩ সালের জানুয়ারির দিকে প্রয়াত নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে জীবদ্দশায় তাঁর চশমা হিলের বাসায় এক অনুসারী বলেছিলেন কথাটি; আপনি এবার প্রেসিডিয়াম মেম্বার হওয়ার আলোচনায় আছেন। মহিউদ্দিন চৌধুরী হাস্যরস করেই বললেন – না না, ওই পদে আমি যেতে চাই না। ওটা মৃত্যুর টিকিট। ওই টিকিট পাওয়া মানে মৃত্যুর হাতছানি! প্রেসিডিয়াম মেম্বার থাকা অবস্থায় পুলিন দা গেলেন। কায়সার ভাই গেলেন। গেলেন বাবু ভাইও। চট্টগ্রাম থেকে যিনিইি এই পদে আসীন হচ্ছেন তিনিই চলে যাচ্ছেন। কাজেই আমি এত তাড়াতাড়ি যেতে চাই না।’

বঙ্গবন্ধুর আমলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে প্রেসিডিয়াম মেম্বার প্রথা চালু ছিল না। মূলত তাঁর কন্যা আজকের প্রধানমন্ত্রী ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে দলের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই  প্রেসিডিয়াম প্রথা চালু হয়।

রাজনৈতিক মহল বিশেষের মতে, মহিউদ্দিন চৌধুরীর হাস্যরস ছড়ানো সেদিনের বিশ্লেষণটা একেবারে অমূলকও নয়। কেননা, ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ১৪ তম অধিবেশনে চট্টগ্রাম থেকে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী ফোরাম প্রেসিডিয়ামের মেম্বার হন চট্টগ্রামের প্রবীণ নেতা, মাস্টারদা সূর্যসেনের সহযোগী অধ্যাপক পুলিন দে। ১৯৯৭ সালে দলের ১৫ তম অধিবেশনে দ্বিতীয়বার প্রেসিডিয়াম সদস্য হন পুলিন দেন। এবং এই পদে থেকেই ২০০০ সালের ১৭ অক্টোবর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

২০০৯ সালের ২৪ জুলাই অনুষ্ঠিত ১৭ তম অধিবেশনে চট্টগ্রামের দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হন আতাউর রহমান খান কায়সার। দায়িত্ব গ্রহণের একবছর আড়াই মাসের মাথায় ২০১০ সালের ৯ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন আতাউর রহমান খান কায়সার।

তাঁর মৃত্যুর পর প্রেসিডিয়ামের শূন্য পদে আসীন হন তৎকালীন পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি, চট্টগ্রামের প্রবীণ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। প্রেসিডিয়াম সদস্যের দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় ২০১২ সালের ৪ নভেম্বর সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু।

এরপর প্রেসিডিয়ামের দায়িত্বে আসেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ২০১৩ সালের ৫ আগস্ট ঈদের তিনদিন আগে তাঁর প্রেসিডিয়াম মেম্বারের দায়িত্বগ্রহণকে চট্টগ্রামবাসীর জন্য প্রধানমন্ত্রীর ঈদ-উপহার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল।

আওয়ামী লীগ নীতিনির্ধারণী ফোরামের দায়িত্বভার গ্রহণের পর স্বাভাবিকভাবেই চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ ছাড়তে হয় তাঁকে। ২০১৬ সালের ২৪ অক্টোবর আওয়ামী লীগের ২০ তম অধিবেশনে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডিয়ামের সদস্য হন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। সর্বশেষ গত ২৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ২১ তম অধিবেশনেও তাকে সেই পদে বহাল রাখা হয়। সবমিলিয়ে টানা সাড়ে ৬ বছর প্রেসিডিয়াম মেম্বারের দায়িত্ব পালন করছেন দলের অন্যতম প্রবীণ এই নেতা।

কাকতালীয়ভাবে তিন নেতাই প্রেসিডিয়ামের দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় মারা যান। এর মধ্যে অধ্যাপক পুলিন দে ৮ বছর, আতাউর রহমান খান কায়সার একবছরের একটু বেশি সময় এবং আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু দুইবছর কিছু বেশি সময় দায়িত্ব পালন করে মারা যান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডিয়ামের দায়িত্ব পাওয়ার পর আতাউর রহমান খান কায়সার ও আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু অপেক্ষাকৃত কম সময়ের ব্যবধানে মারা যাওয়ায় মহিউদ্দিন চৌধুরী হয়তো নিজ প্রসঙ্গে হাস্যরস করে ‘মৃত্যুর টিকিট’র কথা বলেছিলেন। প্রেসিডিয়ামের দায়িত্ব পেলেই যে কেউ মারা যাবেন কিংবা এটি যে চট্টগ্রামের প্রেক্ষিতে ‘মৃত্যুর টিকিট’ তা নয়।

জন্ম, আয়ুষ্কাল-মৃত্যু সব সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা। প্রেসিডিয়ামের মেম্বার না হয়েও অপেক্ষাকৃত কম সময় অর্থাৎ ৭২ বছর বয়সে চলে যান এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। পক্ষান্তরে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন সাড়ে ৬ বছর দাপটের সাথে প্রেসিডিয়ামের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রায় ৭৮ বছর বয়সেও রাজনীতিতে সক্রিয়, সপ্রতিভ। তিনি সুস্থ থাকুন, দীর্ঘজীবি হয়ে দল ও দেশের জন্য আরো বেশি করে অবদান রাখতে সক্ষম হবেন- এই প্রত্যাশা চট্টগ্রামের রাজনৈতিক মহলে।

একুশে/এএ/এটি