রবিবার, ৩১ মে ২০২০, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

বিশ্বাস বিস্তারে ওঁদের ৫শ’ বছর

প্রকাশিতঃ রবিবার, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৯, ৯:২২ অপরাহ্ণ

 

জাহিদ হাসান : মূল ফটক থেকে ভিতরে ঢুকতেই চোখে গাছগাছালি আর নানা ম্যুরালে মনে প্রশান্তি এনে দেয় । নিস্তব্ধ পরিবেশ, খোলা আকাশ, শীতল বাতাস আর শীতের মিষ্টি রোধ ঠিক মাথার উপরে এমন সময় ঘণ্টা বাজিয়ে মা মারীয়াকে ডেকে সৃষ্টির মঙ্গল কামনায় এভাবে বিশ বছর ধরে প্রার্থনা করে আসছেন তিনি। বলছিলাম আনোয়ারা উপজেলার দিয়াং পাহাড়স্থ মারীয়া আশ্রমের ব্রাদার লরেঞ্চ ডায়েসের কথা।

ইতিহাস, ঐতিহ্যের ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে এ আশ্রম এখন অনেকটাই পরিণত। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, হামলা থেকে অনেকটাই মুক্ত অঞ্চলটির সাথে মরিয়ম আশ্রমটি। এ স্বপ্নকে লালন করে ১৯ জুন ১৯৮১ সালে পরলোক গমন করেন ফ্লেভিয়ান লাপ্লান্ত। তবে রেখে যান স্বপ্নের আশ্রম। এরপর ২০০০ সাল থেকে এটি ব্রাদার লরেঞ্চ ডায়েসের হাত ধরে মানুষের বিশ্বাস বিস্তার করে আসছেন।

জানা যায়, ১৫১৮ সালে চট্টগ্রামের দেয়াং পাহাড় এলাকায় পর্তুগিজ বণিকদের হাত ধরে পূর্ববঙ্গে খ্রিস্ট বিশ্বাসীরা আসেন। ১৫৩৭ সাল থেকে পর্তুগিজ বণিকরা চট্টগ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাদের ধর্মীয় যত্ন নিতে দক্ষিণ ভারতের কোচিন এলাকা থেকে ১৫৯৮ সালে বঙ্গদেশে প্রথম খ্রিস্টান মিশনারীরা আসেন। ১৫৯৯ সালে দেয়াংয়ে এ অঞ্চলের প্রথম গির্জাঘরটি নির্মাণ করেন ফাদার ফ্রান্সেসকো ফার্নান্দেজ। পরের বছর পাথরঘাটা ব্যান্ডেলে ও জামালখান এলাকায় আরও দুইটি গির্জা নির্মাণ করেন।

‘খ্রিস্ট বিশ্বাসের কারণে আরাকান রাজার নির্দেশে তাকে (ফাদার ফ্রান্সেসকো ফার্নান্দেজ) মধ্যযুগীয় কায়দায় হত্যা করা হয়। পূর্ববঙ্গের প্রথম খ্রিস্ট শহীদের সমাধির ওপরই চট্টগ্রামের ক্যাথেড্রাল গির্জা। পূর্ববঙ্গে খ্রিস্ট বিশ্বাসের কারণে দেয়াং এলাকায় প্রাণ দিতে হয়েছিল ৬০০ নারী পুরুষকে। খ্রিস্ট বিশ্বাসের যাত্রার ৫০০ বছরে বিকশিত হলেও সংখ্যায় তেমন বাড়েনি, কিন্তু বিকশিত হয়েছে সেবার গুণগত দিক।

জানতে চাইলে ব্রাদার লরেঞ্চ ডায়েস বলেন, আগে খ্রিস্ট্রান ধর্মাবলম্বীদের ওপর দমন, পীড়ন, নির্যাতন হলেও এখন আর সেটা হয় না। যে যার ধর্মের কাজে ব্যস্ত। সাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে এখন অনেকটাই পরিণত এ অঞ্চলটি। ইশ্বরের সেবক ব্রাদার ফ্লেভিয়ান লাপ্লান্ত সুদূর কানাডা থেকে ১৯ অক্টোবর ১৯৩২ সালে বাংলার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। দীর্ঘ ৪৫ দিনের সমুদ্রযাত্রা শেষে বাংলার মাটিতে পৌঁছান তিনি ৩০ নভেম্বর, সেদিনই চট্টলার মাটিতে পা দেন তিনি। শুরু হয় দেয়াঙে অবহেলিত মানুষের মাঝে উন্নয়নের কাজ।

‘জেলে সমাজের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি চলে সেবাকাজে নানামুখী পদক্ষেপ। এরই মাঝে প্রার্থনা কাটতে থাকে অবসর মহূর্তগুলো। স্বপ্ন ছিল অবসর জীবনে আশ্রমবাসী হবেন। তিলে তিলে গড়ে ওঠে আশ্রম। কালের আবর্তনে সেই আজ মা-মরীয়া আশ্রম, খ্রিস্টান তীর্থযাত্রীদের পূণ্য বিদ্যাপিঠ।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বর্তমানে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী আছে প্রায় ৩৩ হাজার, সারাদেশে এ সংখ্যা তিন লাখ ৮০ হাজার। এ সম্প্রদায়ের লোকজনই গত পাঁচ শতাব্দী ধরে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দরিদ্র্য জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে পাঁচ শতাব্দী ধরে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

একুশে/জেএইচ/এএ/এটি