শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭

বহু অপকর্মের হোতা শওকত অবশেষে পুলিশের খাঁচায়

প্রকাশিতঃ বুধবার, জানুয়ারি ১৫, ২০২০, ৭:৩৫ অপরাহ্ণ


ঢাকা: শওকত হাসান মিয়া। চাকরিচ্যুত হাবিলদার হয়েও নিজেকে মেজর পরিচয় দিতেন তিনি। জাতীয় বঙ্গলীগের সভাপতি পরিচয়ে করতেন চাঁদাবাজি। মুসা বিন শমশেরের সঙ্গে তোলা ছবি টাঙিয়ে জমি দখলেও যুক্ত ছিলেন। নানা অপকর্মের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া শওকত পিএইচপি পরিবারের চেয়ারম্যান সুফি মিজানুর রহমানের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে দাবি করেন চাঁদা। ২০১৫ সাল থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও র‌্যাব-পুলিশের কাছে তার বিরুদ্ধে জমা হচ্ছিল অভিযোগ।

অবশেষে বুধবার বিকেলে ঢাকার কল্যাণপুর এলাকা থেকে শওকতকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে গুলশান থানা পুলিশ। তার বিরুদ্ধে পিএইচপির মালিকানাধীন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় ইউআইটিএস কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে চাঁদা দাবি ও প্রাণনাশের হুমকির মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ছিল।

জানা গেছে, নিজেকে মেজর পরিচয় দিয়ে নিজ এলাকা জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলায় বহু অপকর্মের সাথে যুক্ত ছিলেন শওকত। নিজেকে মুসা বিন শমশেরের লোক পরিচয় দিয়ে ঘন ঘন দু’জনের ছবি ফেসবুকে প্রকাশ করতেন শওকত। এয়ারপোর্ট এরিয়ায় বনরূপা হাউজিং এর নামে বহু লোকের জমি দখল করে মুসা বিন শমশের-এর সাথে নিজের ছবি টাঙিয়ে দেন তিনি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০০৩ সালে শওকত হাসান মিয়ার মালিকানাধীন ঢাকার বারিধারাস্থ টুইন টাওয়ার বিল্ডিং-২ ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় “ইউআইটিএস” পরিচালনার জন্য ভাড়া নেয়া হয়। সে সময় ইউআইটিএস এর পক্ষে চুক্তি করেন উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সূফি মো. মিজানুর রহমান চৌধুরী।

এরপর ২০১০ সালের ১৫ জানুয়ারি ১০ বছর মেয়াদী বাড়ী ভাড়া চুক্তিতে উপনীত হন এবং উক্ত চুক্তিতে দুই পক্ষসহ প্রত্যেক পক্ষের ৩ জন করে স্বাক্ষী স্বাক্ষর প্রদান করেন। উক্ত চুক্তি স্বাক্ষরের দিন শওকত হাসান মিয়ার ইচ্ছাতে সূফি মিজান ১০ বছরের বাড়ী ভাড়া একসাথে এককালীন পরিশোধ করেন এবং চুক্তির শর্তানুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মিত প্রশ্নাতীতভাবে গত ১০ বছর যাবত সার্ভিস চার্জসহ আনুষঙ্গিক বিল পরিশোধ করে আসছে।

ভাড়াকৃত ভবনের পাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মিত হওয়ায় শওকত হাসান মিয়াকে ২০১৯ সালের ২ মে লিখিত পত্র মারফত অবহিত করে ভাড়ার চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার ৪ মাস আগে বুঝিয়ে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়। এবং এতে শওকত হাসান মিয়া প্রথমে কোন দাবী ছাড়া সম্মতি দিয়ে মালামাল স্থানান্তরে সম্মতি দেন।

কিন্তু পরবর্তীতে লোভের বশবর্তী ও ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে ২০১৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত শওকত হাসান মিয়ার পক্ষে তার প্রতিষ্ঠানের ডিজিএম এস.এম. মাহমুদ হাসান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. সোলায়মান-এর কাছে প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সূফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের স্বাক্ষর জাল করে দলিল দিয়ে অস্পষ্টভাবে কখনও ১০ কোটি, কখনও ২১ কোটি, কখনও ৩৯ কোটি, কখনও ৪৩ কোটি এবং সর্বশেষ ৫৭ কোটি টাকা চুক্তিবহির্ভূত পাওনা দাবী করে চাঁদা চান এবং বারবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মালামাল স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরে অবৈধভাবে বাধা দেন।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যথাসময়ে লিখিত জবাব দিলে শওকত হাসান মিয়া ও তার অনুগত সন্ত্রাসী বাহিনী প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয় এবং বিভিন্নভাবে উপরোক্ত পরিমাণ চাঁদা প্রদানে বাধ্য করার জন্য প্রাণনাশেরও হুমকি দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে গুলশান থানায় ২০১৯ সালের ২ নভেম্বর ও ২০ নভেম্বর এ বিষয়ে দুটি জিডি করে।

তাছাড়া ইউআইটিএসের রেজিস্ট্রার মো. কামরুল হাসান বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে শওকত হাসান মিয়া কর্তৃক সূফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সকল স্বাক্ষর জাল করে সৃজনকৃত জাল দলিলের উপর নির্ভর প্রায় ৫৭ কোটি চাঁদা দাবীর বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৩৮৫, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৫০০ ও ৫০৬ ধারায় ঢাকার সিএমএম আদালতে একটি মামলা করেন। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন আছে।

এছাড়া প্রায় ৫৭ কোটি চাঁদা চাওয়ায় উপাচার্যের পক্ষে তার পিএস মোস্তফা কামাল গত ২ জানুয়ারি ভাটারা থানায় চাঁদাবাজির মামলা করেন। উক্ত মামলায় শওকত হাসান কয়েকদিন পলাতক থেকে পরবর্তীতে ৮ জানুয়ারি হাইকোর্ট থেকে ৬ সপ্তাহের জামিন পান। উক্ত মামলায় শওকত হাসান মিয়ার সহযোগী এস.এম. মাহমুদ হাসানকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে আনা হয়। এবং বর্তমানে মাহমুদ হাসান কারাবন্দি রয়েছে।

এদিকে ইউআইটিএসের পক্ষ থেকে ২০১৯ সালের ২০ নভেম্বর গুলশান থানায় দায়েরকৃত জিডির তদন্তকারী কর্মকর্তা ঘটনার সত্যতা পেয়ে গত ২৩ নভেম্বর ৫০৬ ধারায় অভিযোগপত্র দেন। উক্ত মামলায় ১৩ জানুয়ারি শওকত হাসান মিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত।

উক্ত পরোয়ানা মূলে শওকতকে বুধবার বিকেলে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলম।