সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৫ ফাল্গুন ১৪২৬

মেয়র নির্বাচন : আ জ ম নাছিরের বিকল্প নেই কেন?

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২০, ৯:২৫ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : আসন্ন মেয়র নির্বাচনকে ঘিরে সরগরম চট্টগ্রামসহ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। কে হচ্ছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ষষ্ঠ নগর পিতা। কে বা পাচ্ছেন নৌকার চূড়ান্ত টিকিট। সেটি নিশ্চিত হতে অপেক্ষা করতে হবে আর মাত্র ৪টা দিন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভায় নিশ্চিত হওয়া যাবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর, বন্দর নগর চট্টগ্রামের মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন কে পাচ্ছেন।

জানা গেছে, বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন ছাড়াও মনোনয়ন দৌড়ে আছেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান ও নগর আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক আবদুচ ছালাম। আলোচনা আছে সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর পুত্র শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এমপিকে নিয়েও।

জানা গেছে, ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে মেয়র হতে আগ্রহ পোষণ করেছেন, ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে গিয়ে মেয়র হওয়া এবং পরবর্তীতে ফের আওয়ামী লীগে ফেরা এম মনজুর আলম, বন্দর-পতেঙ্গা আসনের সরকার দলীয় সাংসদ এম এ লতিফ, ব্যবসায়ী নেতা চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুব আলম।

তবে মেয়র হওয়ার প্রস্তাব কিংবা আলোচনায় ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন বলে ইতোমধ্যে কয়েকটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলেও আবার কোনো কোনো গণমাধ্যম সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন, জাতীয় রাজনীতিতেই তার স্বাচ্ছন্দ্য। নেত্রীর কাছ থেকে রাজনীতি শিখে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করতেই তিনি বেশি আগ্রহী। তবে নেত্রী চাইলে অন্যকথা। সেক্ষেত্রে মেয়র নয়, কাউন্সিলর পদেও যদি নেত্রী নির্বাচন করতে বলেন তার আপত্তি নাই। নওফেল বলে যাচ্ছেন কথাগুলো।

চট্টগ্রামের রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, জীবনে কখনো রাজনীতি না করা নওফেল কেবল মহিউদ্দিন চৌধুরীর সন্তান এই পরিচয়ে মাত্র দুই বছরের মধ্যেই পেয়ে গেছেন তাবত জীবনের সবকিছু-  আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, চট্টগ্রামের প্রেস্টিজিয়াস আসন খ্যাত কোতোয়ালী থেকে দলীয় মনোনয়নে এমপি অতঃপর অপেক্ষাকৃত তরুণ বয়সে উপমন্ত্রী হয়ে যান।  যদিও কেন্দ্রীয় রাজনীতি থেকে সদ্যগত সম্মেলনে ছিটকে পড়েন নওফেল। সেই কারণে একটি মহলের প্রচার ছিল, চট্টগ্রামের মেয়র পদে বসানো কিংবা আঞ্চলিক রাজনীতিতে সক্রিয় করার মানসে প্রধানমন্ত্রী নওফেলকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে রাখেননি।

এই প্রচার-প্রচারণাকে রাজনীতির বোদ্ধামহল নাকচ করে দিয়ে এমন প্রশ্ন করছেন যে, চট্টগ্রামের রাজনীতিতে কি নেতৃত্বের এতই আকাল পড়েছে যে, এমপি-মন্ত্রীর আসন থেকে নওফেলকে মেয়র পদেও টেনে নিয়ে আসতে হবে? এতই অপরিহার্য তিনি?

এদিকে, মেয়র পদে নির্বাচন করতে হলে নওফেলকে ছাড়তে হবে সংসদ সদস্য পদ। এছাড়া শূন্য আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের কোটি কোটি টাকার খরচ তো আছেই, আছে বাড়তি ঝক্কি-ঝামেলা, আলোচনা-সমালোচনা।

অভিজ্ঞ মহলের মতে, মহিউদ্দিনপুত্র নওফেল মেধাবী, শিক্ষিত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু রাজনীতির কর্দমাক্ত পথ বেয়ে তিল তিল করে নিজেকে গড়ে তোলার তকমা বা অভিজ্ঞতা তার নেই। বাবার তৈরি করা মাঠে তিনি খেলতে এসেছেন দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ, মন্ত্রী-এমপির তকমা আর রাষ্ট্রযন্ত্রের সেবা-সুশ্রুষা নিয়ে। পদপদবী না থাকলে নিজস্ব প্রজ্ঞা, সাহস, বিচক্ষণতা কিংবা রাজনীতির বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে টিকে থাকা নওফেলের পক্ষে কতটুকু সম্ভব, তাও উঠে আসছে রাজনৈতিক বোদ্ধা মহলের নানা সমীকরণ, বিশ্লেষণে।

বিশ্লেষণ মতে, কাউকে পদ-পদবীতে বসিয়ে দিলে দলের নেতা হওয়া যায়, কিন্তু জনগণের নেতা হওয়া সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। এই বিশ্লেষণগুলো মেয়র ইস্যুতে সামনে আসা নওফেলকে নিয়ে দলীয় হাইকমান্ডও চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে বলে দলের ঘনিষ্ঠ দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি।

এদিকে, মেয়র মনোনয়নের দৌড়ে থাকা আবদুচ ছালাম গত এক দশকে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে আলোচিত চরিত্র। টানা দশ বছর সিডিএ’র চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রমাণ করেছেন তিনি কাজপাগল মানুষ, কর্মবীর। একের পর এক ফ্লাইওভার নির্মাণ, রাস্তাঘাট নির্মাণ ও সংস্কার, জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়ে তিনি আলোচিত যেমন হয়েছেন, তেমনি সমালোচিত হয়েছেন ‘আমিই সক্ষম, আমিই পারঙ্গম’ এমন মনোভাবাপন্ন অভিযোগের তীর বিদ্ধ হয়ে।

এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বায়েজিদ থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার রাস্তা করতে গিয়ে ১৫টি পাহাড় কেটে সাবাড় করার ঘটনায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে আবদুচ ছালামকে। এ কারণে সিডিএকে ১০ কোটি টাকা জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

বিষয়টি নিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসন্তুষ্ট ও নাখোশ বলে জানা গেছে আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্রের আলাপে। নির্ভর করার মতো সেই সূত্রগুলো বলছে, শনিবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজেই কথা তুলেন মন্ত্রী-এমপির দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রামের কয়েকজন নেতা দেখা করতে যাওয়ার পর। যেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী পরিবারের একজন প্রভাবশালী সদস্যও।

প্রধানমন্ত্রী নেতাদের বলেন, কাজটি অত্যন্ত খারাপ হয়েছে। পাহাড় সুরক্ষা করে শহরের মাঝে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিউ রেখে পাহাড়ের উপর দিয়ে রাস্তাটি কি করা যেতো না? নেতাদের কাছে প্রশ্ন রাখেন প্রধানমন্ত্রী। পাহাড় কাটার জন্য সিডিএকে করা জরিমানার ১০ কোটি টাকা আবদুচ ছালামের পকেট থেকে দেওয়া উচিত বলেও এসময় মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। ভূমিমন্ত্রীসহ চট্টগ্রামের নেতারা পাহাড় কেটে রাস্তা বানানোর স্থানটি এখনো পর্যন্ত দেখতে না যাওয়ায় ওই আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী উষ্মা প্রকাশ করেছেন বলেও নিশ্চিত করেছে সূত্রগুলো।

মেয়র মনোনয়নের জন্য আগ্রহ জানানোর মাঝেই ফের সদ্যগত চট্টগ্রাম ৮ সংসদীয় আসনের উপ নির্বাচনে মনোনয়নের জন্য আবদুচ ছালামের দৌড়ঝাঁপের বিষয়টিও শোভা পাচ্ছে নীতিনির্ধারণী আলোচনায়। সামনে যখন যেটা হাজির হয়, সেটাই ছালাম পেতে চান, ধরতে চান-দলীয় ফোরামে এমন নেতিবাচক আলোচনাগুলোও হচ্ছে আবদুচ ছালামকে নিয়ে। এসব কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেয়র ইস্যুতে ছালামকে নিয়ে আপাতত ভাবতে চান না বলে সূত্রগুলো আভাস দিয়েছে।

অন্যদিকে, খোরশেদ আলম সুজন তৃণমূল থেকে উঠে আসা একজন রাজনীতিবিদ। জনশ্রুতি আছে, রাজনীতিতে নব্যরাও অনেকেই অনেককিছু পেয়েছেন, কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর-পতেঙ্গা আসনে বার বার মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হন সুজন। প্রতিবার বর্গী এসে নিয়ে যায় তার রাজনীতির মাঠের ফসল। মনোনয়ন পেয়ে পরক্ষণে মনোনয়ন হাতছাড়া হয়েছে এমন দৃষ্টান্তও আছে। তবুও রাজনীতির মাঠে সুজন সরব কখনো দলীয় কর্মসূচি নিয়ে কখনো বা নাগরিক অধিকার নিয়ে। মেয়র হওয়ার প্রবল ইচ্ছা থেকে সোমবার (১০ ফেব্রুয়ারি) দলের মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন সুজন। বলছেন, আমি সিরিয়াসলি মনোনয়ন চাইছি নেত্রীর কাছে। এবার বঞ্চনার শেষ দেখতে চাই।

সূত্র মতে, রাজনীতিতে সুজনের উঠে আসা, ত্যাগ-তিতিক্ষা হাইকমান্ডের নজরে থাকলেও মেয়র নির্বাচনের জন্য খোরশেদ আলম সুজনকে তেমন করে ভাবতে চাইছে না হাইকমান্ড। অবশ্য কেন চাইছে না সে ব্যাখ্যা নেই কারো কাছে। তবে তার প্রতি তৈরি হওয়া সুনজরের ফল আপাতত না হলেও আগামিতে সুজন পাবেন- এমনই উঠে আসছে দলীয় ফোরামের নানা আলোচনা থেকে। তবুও রণে ভঙ্গ দেবার পাত্র নন সুজন। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মনোনয়ন বাগিয়ে আনতে।

বিএনপি থেকে ২০১০ সালে মেয়র নির্বাচিত হওয়া এম মনজুর আলমের নামও হাইকমান্ডের আলোচনায় আছে। আওয়ামী লীগ থেকে তিনবার কাউন্সিলর এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় প্রায় দুইবছর চট্টগ্রাম সিটির ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন মনজুর আলম। ২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত তৎকালীন বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর হাত ধরে রাতারাতি বিএনপির মনোনয়ন এনে মহিউদ্দিন চৌধুরীকে হারিয়ে মেয়র হন মনজুর আলম। পরবর্তীতে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার পদও পান।

২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ফের বিএনপির টিকিটে মেয়র নির্বাচনে অংশ নিয়ে কারচুপি, কেন্দ্র দখলের অভিযোগে মাঝপথে ভোটবর্জন করা, ওইদিনই আর কখনো কোনো রাজনীতির সঙ্গে না জড়ানো এবং বাকিজীবন সমাজসেবার প্রত্যয়ে একপ্রকার আড়ালে চলে যান মনজুর আলম। দুই বছর নীরব থাকার পর প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরীর হাত ধরে আওয়ামী লীগে ফেরেন এবং জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। বলতে থাকেন ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার আত্মার সম্পর্ক, পারিবারিক সম্পর্ক। এরপর ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে ডবলমুরিং আসনে মনোনয়নের দৌড়ে সামনের কাতারে চলে আসেন মনজুর। কিন্তু শেষপর্যন্ত মনোনয়ন পান দলের ত্যাগী, প্রবীণ নেতা ডা. আফছারুল আমীন। আর পাশের আসন সীতাকুণ্ড থেকে দ্বিতীয়বারের মতো মনোনয়ন পান মনজুর আলমের ব্যবসায়ী ভ্রাতুষ্পুত্র দিদারুল আলম।

হাইকমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ আছে এমন সূত্রগুলো বলছে, মনজুর আলম ব্যক্তিজীবন সজ্জন, অপেক্ষাকৃত সৎ মানুষ। কিন্তু ফের সিটি করপোরেশন পরিচালনার মতো সাহস, দৃঢ়চেতা মনোভাব কিংবা ডায়নামিক ভাবমূর্তি তার নেই। দলের জন্য উৎসর্গীত, নিবেদিত হওয়া ও ঝুঁকি নেওয়ার মতো বলিষ্ঠতাও নেই তার। তদুপরি দলের ত্যাগী, শীর্ষস্থানীয় নেতাদেরও কেউ নন তিনি। রক্তের সাথে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ মিশে আছে ‍মুখে দাবি করলেও বিএনপির ব্যানারে মেয়র হওয়া কিংবা বিএনপির রাজনীতিতে জড়িয়ে তাদের ‘ডোনার’ হওয়ার সময় বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা তিনি বেমালুম ভুলে গেছেন। ফলে মনজুর আলমকে নিয়ে ভাবনা মানেই ত্যাগী, প্রকৃত রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতিকে আরও কঠিন করে দেওয়ার সামিল-এমনটাই মনে করেন আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী মহল।

জানা গেলো, চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুব আলমও দৌড়ছেন মেয়র মনোনয়নের পেছনে। আওয়ামী ঘরানার ব্যবসায়ী, ছয়বারের চেম্বার সভাপতি, দেশ-বিদেশের ব্যবসায়ী সংগঠন এবং চট্টগ্রামের সব পেশার মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠতা, সম্পৃক্ততা আছে দাবি করে মেয়র নির্বাচন করতে চান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের এই সাধারণ সম্পাদক। ঢাকার দক্ষিণে প্রথমে ব্যবসায়ী নেতা প্রয়াত আনিসুল হক ও পরে আতিকুল ইসলাম মেয়র হয়েছেন, সেই যুক্তিতেও মাহবুব আলম চট্টগ্রামের মেয়র মনোনয়ন লাভে আশাবাদি হয়েছেন।

কিন্তু নীতি-নির্ধারক মহলের বিশ্লেষণ, আনিসুল হক আর আতিকুল হকের বিষয় অন্যদের চেয়ে আলাদা। ব্যবসায়িক নেতা, মানুষকে কাছে টানার বলিষ্ঠতার পাশাপাশি উভয় পরিবারের সদস্যদের ঈর্ষণীয় প্রতিষ্ঠাও তাদের মনোনয়ন লাভে কাজ করেছে। আনিসুল হকের ছোটভাই আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক ছিলেন ওইসময় বাংলাদেশের সেনাপ্রধান। অন্যদিকে আতিকুলের ভাই তাফাজ্জাল ইসলাম বাংলাদেশের ১৭তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আরেক ভাই লেফটেন্যান্ট জেনারেল মইনুল ইসলাম বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কাজেই সব বিবেচনায় মাহবুব আলমের ইচ্ছা আর আগ্রহ খুব বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে না হাইকমান্ডের কাছে। এমনটাই তথ্য মিলেছে অনুসন্ধানে। একইভাবে কখনো আওয়ামী লীগের রাজনীতি না করেও আওয়ামী লীগ থেকে পরপর তিনবার এমপি হওয়ার সুযোগ পাওয়া এম এ লতিফের মেয়র হতে চাওয়ার বিষয়টিকে বাড়াবাড়ি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকে।

এবার আসা যাক আ জ ম নাছির উদ্দীন প্রসঙ্গে। তার ব্যাপারে সাধারণ মানুষ, দলের তৃণমূল নেতাকর্মী, রাজনীতি বিশ্লেষক সবারই অভিন্ন মত, ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের মিছিল থেকে আ জ ম নাছির উদ্দীনের সৃষ্টি। দীর্ঘ ৫০ বছর চট্টগ্রামের মাটিতে আওয়ামী লীগের রাজনীতি সুসংহত, সুসংগঠিত করতে বারে বারে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন তিনি। জিয়া-এরশাদ-খালেদা এবং জামায়াত-শিবিরের মৃত্যু উপত্যকা ডিঙ্গিয়ে রাজনীতি করেছেন সমস্ত শক্তি, মেধা, জীবন-যৌবন ঢেলে। ’৭৫ পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে অনেকেই যখন টু-শব্দটিও করার সাহস দেখাননি, চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের তরুণ সভাপতি আ জ ম নাছিরই সেদিন বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে রাজপথে সোচ্চার ছিলেন খন্দকার মোশতাক সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে।

রাজনীতি সচেতনদের মতে, বারে বারে অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ সেই আ জ ম নাছির উদ্দীনকে প্রধানমন্ত্রী প্রায় ৫ বছর আগে চট্টগ্রামে তাঁর সিপাহশালার হিসেবে বেঁচে নিয়েছিলেন। কর্মে, চিন্তায়, আদর্শে, সাহসে, সততায় নাছির প্রমাণ করেছেন তিনিই চট্টগ্রামের রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত ভ্যানগার্ড। ৭০ লক্ষ নগরবাসীকে নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদানের পাশাপাশি হয়ে উঠেছেন চট্টগ্রামে আওয়ামী রাজনীতির অন্যতম প্রতিভু। ধৈর্যে, বিনয়ে, উদারতায়, ‘না’ কিংবা ’পারি না’ শব্দকে বিদায় জানিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন কী দল, কী জনগণ-সবারই আপনজন, প্রকৃত স্বজন-অভিভাবক। দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়ার পর দলীয় কর্মসূচি পালনে ফান্ড নিয়ে কাউকে আর চিন্তা করতে হয়নি। একক অর্থায়নে চালিয়ে নিয়ে গেছেন দলের সমস্ত কর্মসূচি, চাঙ্গা রেখেছেন দলীয় নেতাকর্মীদের। চরম সঙ্কটেও বিন্দুমাত্র বিচলিত না হওয়া, রাগ বা ক্রোধ প্রদর্শন না করা, শত্রুকেও অসম্মান না করা আ জ ম নাছিরের এই গুণগুলো আজ নগরবাসীর মুখে মুখে। সদ্য বিদায়ী চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার (বর্তমানে সচিব) চট্টগ্রাম থেকে যাবার আগে এক আলোচনায় আ জ ম নাছির প্রসঙ্গে তার অভিমত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মানুষটার (আ জ ম নাছির) কাছাকাছি না গেলে কিংবা না মিশলে বোঝা যাবে না তিনি কতটা বঙ্গবন্ধুপ্রেমী, কর্মীঅন্ত:প্রাণ, দলের জন্য নিবেদিত, উদার, সৎ, সাহসী ও জনবান্ধব।

বোদ্ধামহলের মতে, দলের নেতা অনেকেই হতে পারেন। কিন্তু জননেতা সবাই হতে পারেন না। মহিউদ্দিন চৌধুরীর পর আ জ ম নাছিরই প্রকৃতপক্ষে ‘জননেতা’ হতে পেরেছেন। তীক্ষ্ম বুদ্ধি, মেধার কারণে ৭০ লক্ষ নগরবাসীর অনেকের হাড়ির খবর তার জানা। ২০ লক্ষ নগরবাসীর সঙ্গে তার সরাসরি সেতুবন্ধন। বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মিলিয়ে নগরের ১০ লক্ষ মানুষকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে অন্তত ৫ লক্ষ মানুষের নাম তার মুখস্থ। এই বিরল শক্তি, ক্ষমতা বাংলাদেশের খুব কম রাজনীতিকেরই থাকে।

এরপরও আ জ ম নাছিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ৭০ লক্ষ মানুষের অভিভাবক এবং দলের বৃহত্তম ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পরও নির্দিষ্ট কিছু মানুষ, নেতার বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। বিভিন্ন সময় এই অভিযোগ খণ্ডন করেছেন তিনি। বলেছেন, আমার কাছে কেউ আসতে চেয়ে পারেননি, কিংবা এসে খালি হাতে ফিরে গেছেন এমন একটি উদাহরণ দেখান। ব্যক্তিচাহিদা, আরাম-আয়েশ, বিলাসব্যসনকে তুচ্ছজ্ঞান করে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী, সাধারণ মানুষকে সকাল ৮টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত সময় দিয়ে থাকি। সবার চাহিদা পূরণ করতে না পারলেও অন্তত কথায় কমফোর্ট দেয়ার চেষ্টা করি। এরপরও কেউ যদি এমন অভিযোগ করেন তা হবে বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা।

নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, সবকিছু ছাপিয়ে আ জ ম নাছিরের দ্বিতীয়বার মনোনয়ন লাভের সম্ভাবনা যখন উজ্জ্বল, তখনই তার মনোনয়ন ঠেকাতে চট্টগ্রামের কয়েকজন মন্ত্রী-এমপি একাট্টা হয়েছেন। রোববার সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে এ নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেন চট্টগ্রামের তিন নেতা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর অনাগ্রহে সেই যাত্রায় সুবিধা করা যায়নি। পরবর্তীতে অবশ্য অন্যভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে মেয়রের জন্য আ জ ম নাছিরের বিকল্প খোঁজার অনুরোধ করেন তারা। তখনই প্রধানমন্ত্রী বিকল্প কে হতে পারে জানতে চান। নেতাদের পরপর দুজনের প্রস্তাব নাকচ করে দেন প্রধানমন্ত্রী। তৃতীয় পছন্দ জানাতে বললে উত্তরে সদ্য একুশে পদক পাওয়া পিএইচপি গ্রুপের চেয়ারম্যান সুফী মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের নাম আসে চট্টগ্রামের এসব নেতাদের কাছ থেকে। তখন প্রধানমন্ত্রী কিছুটা নীরব হয়ে যান।

সূত্র মতে, গতকাল (সোমবার) থেকে এমন নাটকীয়তায় হাইকমান্ডের সামনে চলে আসে সুফী মিজানের নাম। ধারণা করা হচ্ছে, সর্বজনপ্রিয়, বিদ্বান, দানবীর, নিষ্কলুস সমাজসেবক হিসেবে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর গুডবুকে জায়গা করে নেন সুফী মিজান। বিশেষ করে বছর খানেক আগে ব্যবসায়ীদের একটি বড় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে তাঁকে মা সম্বোধন করে দেওয়া সুফী মিজানের মিনিট দশেকের বক্তৃতার পুরো অংশে ছিল বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আনুগত্য এবং দেশপ্রেম। তার মুখ থেকেই প্রথম আসে সোনার বাংলা শুধু নয়, বঙ্গবন্ধুর এদেশ হীরার বাংলা হতে পারে-এমন সম্ভাবনা, নেতৃত্ব আজ বাংলাদেশে। সেদিন বক্তৃতা শেষে ডায়াসে ফেরার পথে সুফী মিজানকে কাছে টেনে উৎসাহ দেন প্রধানমন্ত্রী। গত ৫ ফেব্রুয়ারি সমাজ সেবায় সুফী মিজানের বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘একুশে পদক’ প্রাপ্তি প্রধানমন্ত্রীর সেই সুদৃষ্টিরই অংশ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

তবে মঙ্গলবার (১১ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে পিএইচপি পরিবারের একটি দায়িত্বশীল সূত্র একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন, সুফী মিজানের এধরনের কোনো আগ্রহ নেই। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি চান মেয়র নয়, অন্য কোনো অলাভজনক পদে যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থেকে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ থাকলে তিনি তা সাদরে গ্রহণ করবেন এবং দেশকে এগিয়ে নেয়ার যে সংগ্রাম, যুদ্ধ প্রধানমন্ত্রী চালিয়ে নিচ্ছেন, সেই সংগ্রামে সামিল হয়ে দেশগঠনে আরো ব্যাপকভাবে অবদান রাখতে চান সুফী মিজানুর রহমান।