শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭

চবি ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ বিতর্ক : নেপথ্যে ৫০ লাখ টাকার অনুদান?

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২০, ৪:৪৭ অপরাহ্ণ


চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও আদর্শ নিয়ে গঠিত গবেষণা কেন্দ্র ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ পদবি ব্যবহার না করতে চিঠি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গতকাল সোমবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার কে এম নুর আহমদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এই তথ্য জানা যায়।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বরাবর পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু চেয়ার পদের নীতিমালা প্রণয়নে সংক্রান্ত প্রাক্তন উপাচার্য মহোদয় গৃহীত ব্যবস্থা অনুমোদন সংক্রান্ত রিপোর্ট এখনো একাডেমিক কাউন্সিলে অনুমোদন হয়নি। এবং উক্ত পদে নিয়োগ প্রদান সংক্রান্ত গৃহীত ব্যবস্থা অনুমোদন সংক্রান্ত সিন্ডিকেট সিদ্ধান্তটি এখনও কনফার্ম হয়নি। এমতাবস্থায় বর্ণিত বিষয়ে একাডেমিক কাউন্সিল কর্তৃক সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ পদবি ব্যবহার না করার জন্য আদেশক্রমে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।

বিষয়টি নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) কে এম নূর আহমদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, বঙ্গবন্ধু চেয়ার পদবী ব্যবহার না করতে চবির সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দীন চৌধুরিকে অনুরোধ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু চেয়ার পদের নীতিমালা প্রণয়ন সংক্রান্ত প্রাক্তন উপাচার্য মহোদয় গৃহীত ব্যবস্থা অনুমোদন সংক্রান্ত রিপোর্ট এখনো একাডেমিক কাউন্সিল অনুমোদন হয়নি। তাই উক্ত পদে নিয়োগ প্রদান সংক্রান্ত গৃহীত ব্যবস্থা অনুমোদন সংক্রান্ত সিন্ডিকেট সিদ্ধান্তটি এখনও কনফার্ম না হওয়ায় এই অনুরোধ করা হয়েছে।

সাবেক উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ পদবী ব্যবহার না করার বিষয়ে প্রেরিত চিঠিটি আমি পেয়েছি। তিনি বলেন, মুজিববর্ষ আমাদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র, গৌরবের, অহংকারের। আমরা সবাই মুজিববর্ষ সফল করতে যখন ব্যস্ত, তখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে থাকা রাষ্ট্র ও বঙ্গবন্ধুবিরোধী শক্তি বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করতেই এসব করছেন। কোনো আর্থিক সুবিধা ছাড়াই আমি বঙ্গবন্ধু চেয়ার পদে দায়িত্ব পালন করছি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বড় ধরনের গবেষণা করতে ব্যক্তিগত অর্থায়নের পাশাপাশি অনুদান সংগ্রহেরও উদ্যোগ গ্রহণ করেছি আমি। আমি কম্পিউটার, ইন্টারনেট, এসিস্ট্যান্ট কিছু লজিস্টিক সাপোর্ট এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বলেছিলাম। গত আট মাসে তারা আমাকে কিছুই দেয়নি। এবং বঙ্গবন্ধু চেয়ার অফিসের চাবিও আট মাস আগে নিয়ে ফেলেছে।

তিনি বলেন, আমি উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও তার শহীদ পরিবারকে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে শতভাগ প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ নিয়েছি। সে বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নাকি গবেষণা করা যাবে না। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি স্থাপন, মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য, বঙ্গবন্ধু উদ্যান, বঙ্গমাতা হল, শেখ কামাল জিমনেসিয়ামের নামকরণসহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রতিটি সদস্যের নামে স্থাপনা নির্মাণ করেছি। বঙ্গবন্ধু চেয়ার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির থাবায় আক্রান্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি নতুন দিগন্ত আমরা উন্মোচন করেছি।

ড. ইফতেখার উদ্দিন আরো বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে কারো সরলতা ও দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির ভূত চেপে বসেছে কিনা তা সরকারের কাছে তদন্তের দাবি জানাচ্ছি। তিনি প্রশ্ন রাখেন, মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুকে গবেষণায় বাধা সৃষ্টি করা কি বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করা নয়? আমি সরকারের কাছেই এসবের প্রতিকার চাইছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, বঙ্গবন্ধু চেয়ার পদে যোগদানের আগে ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ পদে দায়িত্ব পালনের বিপরীতে কোন ভাতা গ্রহণ করবেন না বলে জানিয়ে দেন। কিন্তু সম্প্রতি ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর প্রচেষ্টায় বঙ্গবন্ধুকে গবেষণায় ৫০ লাখ টাকা অনুদানের ব্যাপারে আলোচনা চলছিল কয়েকটি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে৷ এমন পরিস্থিতিতে এ ধরনের চিঠি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ে গুঞ্জন উঠেছে, ড. শিরীণ আখতার রুটিন দায়িত্ব নিয়েও নিয়মিত উপাচার্যের সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন। তিনি পদোন্নতি, প্রশাসনিক পদবণ্টনসহ সকল কাজই করেছেন রুটিন দায়িত্বে থেকে। আট মাস ধরে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু চেয়ার নিয়ে তিনি কোনো কথা এতদিনে বলেননি। যখন ৫০ লাখ টাকা অনুদানের বিষয়ে আলাপ চলছে তখনই তিনি বঙ্গবন্ধু চেয়ার পদ ব্যবহার না করতে ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীকে চিঠি দিয়েছেন। এছাড়া এই অনুদানের অর্থের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো কোনো শিক্ষকের দৃষ্টি পড়েছে বলেও গুঞ্জন রয়েছে।

বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক দায়িত্বপালনকারী কয়েকজন শিক্ষক জানান, উপাচার্যের গৃহীত ব্যবস্থার রিপোর্ট মানে হচ্ছে, ১৯৭৩ এর অধ্যাদেশের ১৩(সি) ক্ষমতাবলে উপাচার্য যে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন সেগুলো সিন্ডিকেট বা একাডেমিক কাউন্সিলকে অবহিত করা হয়। কিছুতেই এই বিষয়ের উপর কোনো আলোচনার সুযোগ নেই। উপাচার্য তাকে দেয়া ১৯৭৩ এর অ্যাক্ট কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ ক্ষমতাবলে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। এখানে তিনি সিন্ডিকেটের উপর ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। অতএব উপাচার্যের গৃহীত রিপোর্ট একাডেমিক কাউন্সিলে অনুমোদন এবং সিন্ডিকেটে কনফার্ম হয়নি বলে এই চিঠিতে যে উল্লেখ করা হয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে ১৯৭৩ এর অ্যাক্টে উপাচার্যকে দেয়া ক্ষমতাকে খর্ব করার সামিল। এ কারণে চিঠিটা স্ববিরোধীও হয়ে গেল৷ কারণ রিপোর্ট করতে বলা মানেই উপাচার্য সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং সিদ্ধান্তটা চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়ে গেছে। এটি শুধুমাত্র পরবর্তী সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলকে অবহিত করা হবে।

এদিকে চবির একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা বলছেন, ডিন নির্বাচনে উপাচার্যপন্থীদের অবস্থা খুবই দুর্বল। আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের মধ্যে উপাচার্যের কোনো গ্রহণযোগ্য অবস্থান না থাকায় ডিন নির্বাচনে এবারই প্রথম দল থেকে এতো বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়িয়েছেন। এই ব্যর্থতা ঢাকতেই বঙ্গবন্ধু চেয়ারের বিষয়টি তিনি সামনে এনেছেন। চবি বঙ্গবন্ধু চেয়ার নীতিমালা প্রণয়ন কমিটি এবং বঙ্গবন্ধু চেয়ার নির্বাহী কমিটি- দুটি কমিটির সদস্য ছিলেন প্রফেসর ড. শিরীণ আখতার। তিনি নিজেও এই কমিটির সদস্য হিসেবে প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীকে সুপারিশ করেছেন। নির্বাহী কমিটির যে সভায় ড. ইফতেখার উদ্দিনকে এই পদে সুপারিশ করা হয় সে সভায় ড. শিরীণ আখতার উপস্থিত হতে না পারলেও পরবর্তী সভায় তিনি উপস্থিত থেকে উক্ত সভার সিদ্ধান্ত পুনঃঅনুমোদন করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী উপাচার্যের গৃহীত ব্যবস্থা রিপোর্ট আকারে সিন্ডিকেটে উপস্থাপনের দায়িত্ব উপাচার্যের। এটা পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। এবং এটা নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না। ড. ইফতেখার উদ্দিন তার মেয়াদের শেষ তিন মাসে কোনো সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করেননি। নতুন উপাচার্য নিয়োগ হওয়ার পর ড. শিরীণ আখতার বঙ্গবন্ধু চেয়ার সংক্রান্ত রিপোর্ট সিন্ডিকেটে উপস্থাপন না করে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। দুদক আইনে ক্ষমতার অপব্যবহারও প্রমাণিত হলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

চবির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বলেন, রাষ্ট্রপতিকে কটূক্তিকারী এক শিক্ষক ও প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় গ্রেফতার শিক্ষকের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সভা-সমাবেশকারী শিক্ষককে প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব প্রদানের অভিযোগ তদন্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। উপাচার্য এ বিষয়টি নিয়েও চাপে রয়েছেন। তাই তিনি বঙ্গবন্ধু চেয়ারের বিষয়টি সামনে এনে নিজের সমালোচনা কিছুটা ঢাকার চেষ্টা করছেন।

উল্লেখ্য, ঢাকা ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচলিত বঙ্গবন্ধু চেয়ারের নীতিমালা পর্যালোচনা করে ২০১৭ সালের ২৭ অক্টোবর চবির ৫১০তম সিন্ডেকেট সভায় বঙ্গবন্ধু চেয়ারের অনুমোদন দেওয়া হয়। নির্দেশনা মোতাবেক কমিটি ২০১৮ সালের ৭ মে ও ৩ সেপ্টেম্বর এবং ২০১৯ সালের ৩ জানুয়ারি তিন দফা বৈঠক করেন। সভায় নীতিমালা অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়। এ পদের জন্য ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করা করা হয়। কিন্তু সুপারিশকৃত ওই সভায় কমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য উপ-উপাচার্য (বর্তমান উপাচার্য) প্রফেসর ড. শিরিন আখতার উপস্থিত ছিলেন না। যদিও পরবর্তী সভায় তিনি এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেন। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ৭ মার্চ উক্ত চেয়ারের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী।