রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তিকারীরা চবির প্রশাসনিক পদে


চট্টগ্রাম ও চবি প্রতিনিধি: রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির অভিযোগে অভিযুক্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষক প্রফেসর ড. রাহমান নাসির উদ্দিনকে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সভাপতি পদে নিয়োগ দিতে যাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য ড. শিরীণ আখতার।

এ সংক্রান্ত নোট উপাচার্য তার বিশেষ ক্ষমতাবলে অনুমোদন করেছেন বলে জানা গেছে। এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকরভাবে কটূক্তির অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন।

এর আগে ড. রাহমান নাসির উদ্দিনকে বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা পরিচালনা ও প্রকাশনা দফতরের পরিচালক পদে নিয়োগ দেয় উপাচার্য ড. শিরীণ আখতার। এ সময় রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কটুক্তি ও আপত্তিকর ভাষায় ড. রাহমান নাসির উদ্দিনের ফেসবুক পোস্ট উপাচার্যের নজরে আনলেও তাকে অব্যাহতি দিতে গড়িমসি করেন ড. শিরীণ আখতার। একপর্যায়ে ড. রাহমান নাসির উদ্দিন নিজেই এ অভিযোগ ওঠায় তিনি ‘বিব্রত’ উল্লেখ করে পদত্যাগ পত্র জমা দেন৷ কিন্তু ড. রাহমান নাসির উদ্দিনের এ পদত্যাগপত্রও গ্রহণ করতে চাননি উপাচার্য ড. শিরীণ। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে নজিরবিহীনভাবে উল্লেখ করা হয়, ‘আমেরিকার বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. রাহমান নাসির লেকচার প্রদান করতে দীর্ঘ দিন অবস্থান করবেন। ফলে গবেষণা পরিচালনা ও প্রকাশনা দপ্তর ও কমিটির কাজ সচল রাখার স্বার্থে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হলো’। অথচ ড. রাহমান নাসির উদ্দিন পদত্যাগপত্রে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে কটুক্তির অভিযোগ ওঠায় বিব্রত হওয়ার কথা উল্লেখ করে পদত্যাগ করেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ও মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে অসম্মানিত করা ও সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে কটুক্তিকারীর প্রতি চবি উপাচার্য ড. শিরীণের অতিরিক্ত মাত্রায় সখ্যতা প্রদর্শনকে রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতি একধরনের ধৃষ্টতা প্রদর্শন বলেই মত দিয়েছেন প্রগতিশীল শিক্ষকরা।

শুধু তাই নয়, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কটূক্তি’ করেন চবি সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক মাইদুল ইসলাম। এ ঘটনায় তিনি গ্রেপ্তার হন। তার মুক্তির দাবিতে ড. হানিফ মিয়া সভা-সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। এ সময় ড. রাহমান নাসির উদ্দিনও প্রধানমন্ত্রীকে ‘কটূক্তির’ মামলায় গ্রেপ্তার মাইদুল ইসলামের মুক্তির দাবিতে টানা আন্দোলন চালিয়ে যান। এসব বিষয়ে অভিযোগ এনে বর্তমান উপাচার্য ড. শিরীণ আখতারকে বেশ কয়েকবার মৌখিক ও লিখিত আকারে জানান চবি ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য ইফতেখার উদ্দিন আয়াজ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেসবুকে কটুক্তি ও আপত্তিকর পোস্ট দিয়ে যে শিক্ষক আইসিটি আইনের মামলায় জেলে গেছে তার বিচার দাবিতে আন্দোলন না করে ড. রাহমান নাসির উদ্দিন ও ড. হানিফ মিয়া এই মামলার আসামীর পক্ষে আন্দোলন করে সমালোচিত হয়েছেন। কারণ তারা চবির আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন হলুদ দলের সদস্য।

ড. শিরীণ আখতার উপাচার্য হয়ে শুধু যে রহমান নাসির উদ্দিনকে প্রতিষ্ঠিত করছেন তা নয়; তিনি ড. হানিফ মিয়াকে নিযুক্ত করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনকারী সহকারী প্রক্টর হিসেবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কটুক্তিকারী শিক্ষক মাইদুল ইসলামের পক্ষে আন্দোলনে নামা সমাজতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মহিউদ্দিন মাহিমকে গত বৃহস্পতিবার ড. শিরীণ আখতার নিয়োগ দেন চাকসু কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক পদে।

এর আগে গতবছরের ১৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির ও সহকারী প্রক্টর হানিফ মিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির অভিযোগ করে অনশন কর্মসূচী পালন করেন চবি ছাত্রলীগ নেতা ইফতেখার উদ্দিন আয়াজ।

এই ঘটনায় ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এ বিষয়ে চবি উপাচার্যসহ অভিযুক্ত শিক্ষকদের চিঠিও দিয়েছে। বিষয়টি একুশে পত্রিকাকে নিশ্চিত করেছেন তদন্ত কমিটির প্রধান ড.দিল আফরোজ।

এদিকে আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আট অনুষদের ডিন নির্বাচনে অংশ নিতে সমাজবিজ্ঞান অনুষদে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পত্র সংগ্রহ করেছিলেন ড.রাহমান নাসির উদ্দীন।

পরে তিনি ডিন নির্বাচন থেকে সরে আসলেও গত তিনদিন আগে ড.রাহমান নাসিরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সভাপতি হিসেবে নিয়োগ করার নোট অনুমোদন দিয়েছেন উপাচার্য ড. শিরীণ আখতার। যদিও তিনি এই পদে এখনও দায়িত্বগ্রহণ করেননি। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পরিচালনা ও প্রকাশনা দপ্তরে পুনরায় ড.রাহমান নাসিরকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও গুঞ্জন উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে। এই নিয়ে উপাচার্য ড.শিরীণ আখতারের সাথে তার বেশ কয়েকবার আলোচনা হয়েছে বলেও সূত্রে জানা যায়।

এদিকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির অভিযোগে অভিযুক্ত নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড.রাহমান নাসিরকে ডেভেলপমেন্ট বিভাগের সভাপতি হিসেবে নিয়োগের বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে চলছে আলোচনা সমালোচনা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক একুশে পত্রিকাকে বলেন, উপাচার্য প্রফেসর ড.শিরীণ আখতার ড.রহমান নাসিরকে বিভিন্ন ভাবে সাহায্য সহযোগীতা করছেন। উপাচার্য কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ড.রহমান নাসিরের সাথে আলোচনা করে থাকেন।

তিনি আরও বলেন, ডিন নির্বাচনে প্রার্থী হয়েও অনুষদের ভোটের হিসেবনিকেশ বুঝতে পেরে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন ড.রহমান নাসির উদ্দীন। ড. রহমান নাসিরকে খুশি রাখতে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সভাপতি পদে পদায়ন করছেন উপাচার্য। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে আপত্তিকর কটুক্তিকারীর প্রতি উপাচার্য শিরীণ আখতারের এত সখ্যতা থাকার নেপথ্যে কি তা নিয়েও গুঞ্জন চলছে ক্যাম্পাস জুড়ে।

তিনি বলেন, ড.রহমান নাসির প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিকে কটূক্তির অভিযোগে অভিযুক্ত। এই নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রনালয় এ ইউজিসি  তদন্ত কমিটিও গঠন করেছেন। এ অবস্থায় তাকে প্রশাসনিক পদে নিয়োগ কী ইঙ্গিত করে?

তিনি বলেন, ড.রহমান নাসির ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের কোন রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। তিনি শিক্ষক হয়ে বামরাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জামায়াতের নীতিনির্ধারক ও গণিত বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নজরুল ইসলামের জামাতা ছিলেন। ড. রহমান নাসির এই শিক্ষকের মেয়েকে প্রথমে বিয়ে করেন। যদিও তাদের ডিভোর্স হয়ে যায়।

এসব বিষয়ে ড. রাহমান নাসির উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমি ডিন নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলাম। সেখানে মনে হয়েছিলো আমার সম্ভাবনা রয়েছে। পরে এক শিক্ষকের অনুরোধে আমি তা প্রত্যাহার করেছি।ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সভাপতি হওয়ার বিষয়ে আমি নিজে কিছু জানি না। তবে অন্যদের থেকে শুনেছি।এটি একটি একাডেমিক বিষয়। যদি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাকে উপযুক্ত মনে করেন তবে নিয়োগ দিতে পারেন।সেক্ষেত্রে দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি পুরোপুরি আমার উপর।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তিমূলক কোন লিখা আমি কখনও লিখিনি। যদি সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক মাইদুল ইসলামকে সমর্থনের ফলে এমন অভিযোগ করা হয় তাহলে তা ভিত্তিহীন।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিকে কটূক্তির অভিযোগে অভিযুক্ত চবির এই শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোন পদে নিয়োগ দেওয়া হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারী দিয়ে শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপু একুশে পত্রিকাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিকে কটূক্তিকারী চবির তিন শিক্ষক মাইদুল ইসলাম, ড.হানিফ মিয়া ও ড.রাহমান নাসিরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেবেন না বলে জানিয়েছিলেন উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতার। এর পরেও ড. হানিফ মিয়াকে সহকারী প্রক্টর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখন যদি ড. নাসির উদ্দিনকে আবার কোন পদে নিয়োগ দেওয়া হয় তাহলে ছাত্রলীগ কঠোর আন্দোলনে যাবে।