শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২০, ২৭ চৈত্র ১৪২৬

চবিতে যেভাবে শুরু হলো ছাত্রলীগের রাজত্ব

প্রকাশিতঃ শনিবার, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২০, ৯:৪৩ অপরাহ্ণ


ইফতেখার সৈকত, চবি : অনেকটা জোয়ারের স্রোতের মতো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) প্রবেশ করছে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। ক্যাম্পাস এখন ছাত্রলীগের দখলে। বলা চলে ক্যাম্পাসে এখন চলছে ছাত্রলীগের রাজত্ব। আর সেই রাজ্যে আছে হাজার হাজার কর্মী। সর্বত্র ছাত্রলীগ ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জয়গান গাইছে সবাই। প্রথম বর্ষে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়ে যারা রাজনীতি করতে ইচ্ছুক তাদের জন্য ‘অটো চয়েসে’ পরিণত হয়েছে ছাত্রলীগ। অন্য কোন ছাত্র সংগঠন করার চিন্তা-ভাবনা খুবই নগন্য সংখ্যক শিক্ষার্থীর মধ্যে জন্মে। আর যদি কেউ অন্য কোন সংগঠন করতে চায় তবে সেই তালিকা থেকে প্রথমেই বাদ পড়ে ছাত্রশিবিরের নাম।

তবে চবি ছাত্রলীগের এই স্বর্ণালী সময় রাতারাতি আসেনি। তার জন্য ঝরেছে রক্ত। ছিল অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি।
চবি ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের অস্তিত্ব ছিলো ২০১৫ সালের পূর্ব পর্যন্ত। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে অবস্থান নেয়ার পাশাপাশি ক্যাম্পাসের আশেপাশে কটেজ ও বিভিন্ন বাড়িতে গৃহশিক্ষক হিসেবে থেকে শেকড় গাড়ে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। তখন চবি ক্যাম্পাস পরিচিত ছিলো ছাত্রশিবিরের ‘আঁতুড়ঘর’ হিসেবে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসেও চবি ক্যাম্পাস শিবিরমুক্ত করতে সময় লেগেছিলো প্রায় ৬ বছরের লম্বা সময়।

জানা যায়, ১৯৮২ সাল থেকে চবি ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার করে ছাত্রশিবির। ১৯৯০ সালে ভেঙে দেওয়া হয় চাকসু। এরপর থেকে চবিতে একক আধিপত্য বিস্তার করে ছাত্রশিবির। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে শাহজালাল, শাহ আমানত ও আবদুর রব হল দখলে নেয় ছাত্রলীগ। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে জামায়াত-বিএনপি জোট ক্ষমতায় আসলে ফের সবগুলো হল দখল করে শিবির। এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পুণরায় একক আধিপত্য বিস্তার করে তারা।তখন কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল ছাত্রলীগ। এর আগে টানা দুই যুগের বেশি সময় ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস এককভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকা ছাত্রশিবিরের সময় কথায় কথায় প্রতিপক্ষের কর্মী খুন, হল দখল ও অস্ত্রবাজি ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকা তখন ‘মিনি ক্যান্টনমেন্ট’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর থেকে শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে শিবির উৎখাতের প্রক্রিয়া। তবে ছাত্রশিবিরের শক্ত শেকড় ও হলগুলোতে নিজেদের আধিপত্য থাকায় প্রথম দিকে বেশি সুবিধা করতে পারেনি চবি ছাত্রলীগ।

ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জানান, ২০০৯ সালের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন হলে থাকতে পারতো না ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। কেউ হলে উঠলে তাকে বের করে দেওয়া হতো। ২০০৯ সালের দিকে ছাত্রলীগের অবস্থান ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্ট ও কলা অনুষদের ঝুপড়ি পর্যন্ত। একই বছর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে প্রথম দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে আনন্দ মিছিল করে ছাত্রলীগ। যদিও শিবিরের হামলায় পণ্ড হয়ে যায় সেই আনন্দ মিছিল। তখন ছাত্রলীগ চেষ্টা করেও হলে অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়। এরপর ২০০৯ সালের ১৪ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের রব হলে ছাত্রলীগ ও শিবিরের সংঘর্ষ বাধে। সে সময় ছাত্রলীগের কাজী মারুফ হোসেন নামে একজন মারাত্বক আহত হয়। ৬ মাস হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার পর তিনি সুস্থ হন। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহজালাল, শাহ আমানত ও রব হলে কিছুটা অবস্থান নেয় ছাত্রলীগ। কিন্তু এই ঘটনায় সেই অবস্থানও হারায় ছাত্রলীগ।

এ সময় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের মিছিল, মিটিং ছিল প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। পরে ২০১১ সালের দিকে শাখা ছাত্রলীগের কমিটি গঠিত হলে কিছুটা সংঘবদ্ধ হয় দলটি। কমিটি গঠিত হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহজালাল হলে ছাত্রলীগ ও শিবিরের মধ্যে ফের সংঘর্ষ হয়। এসময় পুণরায় শাহজালাল ও শাহ আমানত হলের কিছুটা দখল করে ছাত্রলীগ।

৫ সংঘর্ষে ছয়টি হল দখল, নিহত ৩

২০১২ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চবি ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এর মধ্যে পাঁচবার সংঘর্ষে জড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬টি হল দখল করে ছাত্রলীগ। পৃথক দুই ঘটনায় নিহত হয়েছে ছাত্রশিবিরের ৩ নেতা।

২০১২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগ-শিবিরের মধ্যে ঘটে বড় ধরনের সংঘর্ষ। ওইদিন বেলা ১২টার দিকে বিশ্বিবিদ্যালয়ের কলা ভবনের ৪১৯ নম্বর শ্রেণীকক্ষে ছাত্রশিবিরের কর্মীরা ইসলামের ইতিহাস বিভাগে নবীনবরণের দাওয়াতপত্র বিলি করতে গেলে দুই সহপাঠীর মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। তাঁদের মধ্যে আল আমিন ছিল শিবিরের সমর্থক ও শাহীন ছাত্রলীগের সমর্থক। পরে বেলা আড়াইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের পাশে স্মরণ ভাষ্কর্যের সামনে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে আবার পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। এক পর্যায়ে জিরো পয়েন্টের পাশে পাহাড়ে গুলির শব্দ শোনা যায়। পরে সংঘর্ষ একটু থেমে এলে পাহাড়ের ওপর থেকে আহত দুজনকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দিয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ করে দেয়।

২০১৪ সালের ১১ জানুয়ারি সিলেট নগরে শাখা ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক (তৎকালিন) জালাল আহমেদের ওপর হামলার ঘটনার জেরে পরদিন ১২ জানুয়ারি বেলা একটার দিকে ক্যাম্পাসের রেলস্টেশন চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে ছাত্রলীগ। এ সময় দফায় দফায় শাহ আমানত হলের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে ছাত্রলীগ। প্রতিবারই পুলিশের বাধায় ব্যর্থ হয়। পরে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা হলে ঢোকেন। সেখানে অবস্থানরত শিবিরের কর্মীদের সঙ্গে তাদের মুখোমুখি সংঘর্ষ এবং উভয় পক্ষে গুলিবিনিময় হয়। বেশ কয়েকটি ককটেলও বিস্ফোরণ হয়। এতে কয়েকজন আহত হন। সংঘর্ষে গুরুতর আহত মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আমানত হল শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মামুন হোসেনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য শাহ আমানত হল বন্ধ ঘোষণা করে। প্রায় ৮ মাস পর হলটি চালু হলে ১৪ বছর ধরে চলা শাহ আমানত হলে ছাত্রশিবিরের রাজত্বের অবসান ঘটে। ধীরে ধীরে দখলে নেয় ছাত্রলীগ।

পরে একই বছরের ২৪ আগস্ট ক্যাম্পাসে শিবির-ছাত্রলীগের মধ্যে গুলি বিনিময়ের পর ‘সোহরাওয়ার্দী হলে’ অভিযান চালিয়ে পুলিশ পেট্রোল বোমা ও পাথর উদ্ধার করে। এরপরই শিবিরের নিয়ন্ত্রণে থাকা এ হলটিও বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে হল চালু হবার পর এর দখল নেয় ছাত্রলীগ।

২০১৫ সালের ২২ মে ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী বিকেল ৪টার দিকে আলাওল হলের মাঠে ক্রিকেট খেলতে গেলে শিবিরকর্মীরা মিজানুর রহমান নামে এক ছাত্রলীগ কর্মীকে হুমকি দেয়। এ ঘটনায় পাশাপাশি অবস্থিত আলাওল ও এফ রহমান হলে ‘আধিপত্য’ নিয়ে থাকা শিবিরকর্মীদের সঙ্গে এক পর্যায়ে সংঘর্ষ শুরু হয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের। উভয়পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি পাথর নিক্ষেপ ও ফাঁকা গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে শিবিরকর্মীরা হল ছেড়ে বেরিয়ে এলে ছাত্রলীগ কর্মীরা হল দুটিতে অবস্থান নেয়। এ ঘটনায় উভয়পক্ষের অন্তত আটজন আহত হয়। এ ঘটনার পর হল দুটি দখলে নেয় ছাত্রলীগ।

এদিকে ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ছাত্রশিবিরের নিয়ন্ত্রণে থাকা আব্দুর রব হল দখল নিতে যায় ছাত্রলীগ। ওই সময় দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে ওই হল থেকে বিতাড়িত হয় ছাত্রশিবির। এবং দখলে নেয় ছাত্রলীগ। এভাবে একে একে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও ছাত্রী হলগুলো দখলে নিয়ে একক আধিপত্য বিস্তার করে চবি ছাত্রলীগ।

২০১৫ সালের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে মেলতে শুরু করে ছাত্রলীগের ডালপালা। আর ধীরে ধীরে বিলুপ্তি ঘটে ছাত্রশিবিরের রাজত্বের। এরপর এখনও পর্যন্ত আর এক হতে পারেনি ছাত্রশিবির। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সময় ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের ক্যাম্পাসে দেখা গেলেও ছাত্রলীগের তোপের মুখে তাদের ছাড়তে হয়েছে ক্যাম্পাস। আর বিদ্যুৎ গতিতে ডালপালা মেলে ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে প্রতিষ্ঠা করেছে নিজেদের রাজত্ব।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রশিবিরকে উৎখাত প্রসঙ্গে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজাউল হক রুবেল একুশে পত্রিকাকে বলেন, অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পর আজকের অবস্থানে এসেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ। ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসে লতা-পাতার মতো ছড়িয়ে গিয়েছিল। আমরা সেই দুঃসময় পার করে এসেছি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ছাত্রশিবির এখন ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে নেই। তবে আমরা শুনতে পাই গোপনে তারা মাঝে মাঝে কার্যক্রম চালায়। এই বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপর হওয়া উচিত।

রেজাউল হক রুবেল বলেন, শিবিরের দখলে থাকায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের মধ্যে অনেক জামায়াত ওঁত পেতে আছে। তবে আমরা এসব নিয়ে সব সময় তৎপর আছি। আমরা জানি তাদের কিভাবে প্রতিহত করতে হবে। এসময় তিনি অপশক্তির বিরুদ্ধে সকল ছাত্রলীগকর্মীকে এক হয়ে কাজ করারও আহ্বান জানান।